ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪

অন্যদৃষ্টি

আর্সেনিকাক্রান্ত শিশুর নতুন ঝুঁকি

আর্সেনিকাক্রান্ত শিশুর নতুন ঝুঁকি

মাহফুজুর রহমান মানিক

প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০০



দুটি সমস্যা- একটি আর্সেনিক, অন্যটি অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা। উভয় সমস্যাই মারাত্মক। একটির প্রভাবে আরেকটি আরও সাংঘাতিক হয়ে উঠতে পারে। শুক্রবারের সমকালসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে সেটিই খবর হিসেবে প্রকাশ হয়েছে। শিশুদের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতার অন্যতম কারণ আর্সেনিক। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র-আইসিডিডিআর,বির গবেষণায় বিষয়টি দেখা গেছে। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বেশি, এমন এলাকায় শিশুদের মল এবং পানিতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ইকোলাইয়ের উচ্চ প্রাদুর্ভাব তারা পেয়েছে। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, কম আর্সেনিকযুক্ত অঞ্চলের তুলনায় খাবার পানিতে আর্সেনিক দূষণের মাত্রা বেশি, এমন এলাকায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের মাত্রাও বেশি।
সাধারণভাবে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বা অকার্যকারিতার কারণ অ্যান্টিবায়োটিকের অত্যধিক ব্যবহার এবং অপব্যবহার। অনেকে শিশুকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই এটি খাওয়ানো শুরু করেন। আবার কোনো কোনো চিকিৎসক শিশুর কিছু হলেই অ্যান্টিবায়োটিক ধরিয়ে দেন। এটি জীবন রক্ষাকারী ওষুধটির অত্যধিক ব্যবহারের একটি দিক। আর অপব্যবহারের দিকটি হলো, অ্যান্টিবায়োটিক নির্দিষ্ট ডোজ মেনে খেতে হয়। চিকিৎসক যদি সাত দিন তিন বেলা খাওয়াতে বলেন, সেখানে ২১ বারের একবারও অনিয়ম করা যাবে না। একবার না খেলেও সেটি কার্যকারিতা হারাতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক যখন কেউ খায়, তখন ব্যাকটেরিয়া সঙ্গে সঙ্গে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। ফলে সঠিক নিয়ম অনুসারে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ না করলে তখন ব্যাকটেরিয়া দুর্বল হয় বটে; কিন্তু মরে না।
আমাদের মনে আছে, দুই যুগ আগে আর্সেনিকের বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে এবং সে সময় থেকেই গভীর নলকূপ স্থাপনের আয়োজন শুরু হয়। আর্সেনিক এক ধরনের রাসায়নিক উপাদান, যেটি স্বল্প মাত্রায় পানিতে থাকতে পারে। কিন্তু অস্বাভাবিক মাত্রায় এটি মানুষের শরীরে নানা রোগের উপসর্গ তৈরি করতে পারে। এটি যে শিশুর শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর করে দিতে পারে, সেটিও আইসিডিডিআর,বির গবেষণায় দেখা যাচ্ছে। শঙ্কার বিষয় হলো, দেশ থেকে এখনও আর্সেনিক নির্মূল হয়নি। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সমীক্ষায় বেরিয়েছে, দেশের ১৪ শতাংশ নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গোপালগঞ্জ জেলায়; ৫২ দশমিক ৫৭ শতাংশ নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক রয়েছে। এর পর চাঁদপুরে ৫১ শতাংশ, কুমিল্লায় প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং উপকূলীয় সাতক্ষীরায় প্রায় ৪১ শতাংশ। অন্যদিকে আর্সেনিকযুক্ত নলকূপ রয়েছে দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, নওগাঁ, নাটোর, রংপুর ও গাজীপুর জেলায়।
অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে আইসিডিডিআর,বির গবষেণাটিও করা হয় সবচেয়ে বেশি আর্সেনিক রয়েছে এমন একটি জেলা; চাঁদপুরে। গবেষকরা চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ ও মতলব উপজেলার ১০০টি পরিবারের মা ও শিশুদের মল এবং খাবার পানির নমুনা সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে হাজীগঞ্জে বসবাসকারী পরিবারগুলো অগভীর নলকূপের পানি পান করে এবং এখানকার পানিতে আর্সেনিকের উচ্চ মাত্রা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে মতলবের পরিবারের সদস্যরা আর্সেনিকমুক্ত গভীর নলকূপ থেকে তাঁদের খাবার পানি সংগ্রহ করেন। তবে সমস্যা জটিল হলেও সমাধান অবশ্য কঠিন নয়। গভীর নলকূপের পানি খেতে হবে। গভীর নলকূপ এখন প্রায় সব বাড়িতে রয়েছে। এমনকি কোনো বাড়িতে একাধিক পরিবারেও গভীর নলকূপ রয়েছে। গভীর নলকূপের পানি পান না করলে আর্সেনিকোসিস হওয়ার আশঙ্কা যেমন রয়েছে, একই সঙ্গে তার প্রভাবে শিশুদের ওপর অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হতে পারে।
দেশে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের আয়ু ফুরিয়ে যাচ্ছে বলে এ বছরের ৫ ফেব্র্রুয়ারি সমকালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। প্রতিবেদন অনুসারে, চিকিৎসক ও রোগী উভয়ের অসচেতনতা, অবহেলা ও অজ্ঞতার কারণে বাংলাদেশে ক্রমেই অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা হারাচ্ছে। দুটি আলাদা গবেষণায় পাওয়া গেছে, শতকরা ৯ ভাগ শিশুর মধ্যে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। বিদ্যমান এই সংকটের সঙ্গে আর্সেনিকের বিষয়টি নতুন করে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে উদ্বেগ আরও বাড়াচ্ছে। ফলে অ্যান্টিবায়োটিক যেমন যেনতেনভাবে খাওয়া যাবে না, তেমনি আর্সেনিক থেকেও দূরে থাকতে হবে। শিশুদের সুস্থতায় এ ব্যাপারে সামষ্টিক সচেতনতা জরুরি।
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক, সমকাল
mahfuz.manik@gmail.com

আরও পড়ুন

×