ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

রাজনীতি

খালেদা জিয়ার নতুন 'অগ্নিপরীক্ষা'

খালেদা জিয়ার নতুন 'অগ্নিপরীক্ষা'

ফারুক ওয়াসিফ

প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ২২:৪১

শত্রুর মুখে বন্ধুর মতো কথা কূটনীতিতে চলে, রাজনীতিতেও চলতে পারে। সবই কৌশলী খেলা। সবই আপন পক্ষের জয় নিশ্চিত করার আয়োজন। এটি বোঝা যায় যখন সরকারের অন্তত দু'জন মন্ত্রী অনেকটা আগ বাড়িয়েই খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে ফেরানোর কথা তুলেছেন। আবার সরকারেরই অন্য দুই মন্ত্রীর কথার সুর একেবারে উল্টা। একপক্ষ রাজনীতির সুযোগের কথা তুলছেন, আবার অন্যপক্ষ তা বাতিলও করে দিচ্ছেন। যেমন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন- খালেদা জিয়া অসুস্থ না হলে কারাগারে থাকতেন, তাঁর রাজনীতি করার সুযোগ নেই। তাঁর কথার প্রতিধ্বনি করেছেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। অন্যদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, খালেদা জিয়া রাজনীতি করতে পারবেন না, এ কথা তাঁর মুক্তির শর্তে বা কোথাও বলা নেই। কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুর রাজ্জাকও একই মত ব্যক্ত করেছেন।

তার মানে খালেদা জিয়া প্রশ্নে বাদীও আওয়ামী লীগ, বিবাদীও তারা। বিষয়টি ভারি মজার। নিজেরাই পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য দেওয়ার অর্থ কী? আইনমন্ত্রীর বলা 'রাজনৈতিক মুক্তি'র হাতছানি দেখে কেউ আশাবাদী হলেও, যাতে আবার ওবায়দুল কাদের সাহেবের কথা শুনে দ্বিধায় পড়ে যায়; এটাই কি চাওয়া হচ্ছে? যাতে ভয় পেয়ে আপসের কথা চিন্তা করে? আওয়ামী লীগ কি চাইছে মানুষ এসব নিয়ে কথা চালাচালি করুক, অভাব-অনটন, বিদ্যুতের ভোগান্তি ইত্যাদির কথা ভুলে যাক? আওয়ামী লীগ হয়তো চাইছে রাজনীতির ময়দানে এ নিয়ে যে আলোচনা জমে উঠছে তা আওয়ামী লীগের দেখানো পথেই চলুক। এজন্যই একইসঙ্গে সাপ ও ওঝার ভূমিকা নেওয়া?

খালেদা জিয়াকে এখন রাজনীতির মাঠে কেন দরকার সরকারের? তাঁর রাজনীতি করা এক বিষয়, আর তাঁকে দিয়ে রাজনীতি করিয়ে নেওয়া একেবারেই আলাদা বিষয়। বিএনপির মূল দুটি দাবি হলো- নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং খালেদা জিয়াকে মামলা ও সাজা থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি। সরকারের কৌশল হলো- মামলা চলবে, দরকারে আরও মামলা আসবে এবং কারাদণ্ডের খাঁড়ার তলে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়া রাজনীতি করবেন! সেটি কেমন রাজনীতি হবে? সেটি হবে নিয়ন্ত্রিত রাজনীতি। তিনি মুক্ত থাকলে যা করতেন না সেটি করিয়ে নেওয়ার রাজনীতি।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং রুমিন ফারহানাসহ বিএনপি নেতাদের কথায় মনে হচ্ছে, তাঁরা সরকারের চালটা ধরতে পেরেছেন। খালেদা জিয়ার রাজনীতি করার বাতচিৎকে তাঁরা টোপ বা ফাঁদ হিসেবেই দেখছেন। তা হলেও, আওয়ামী লীগ যে 'গুগলি বল' করেছে, সেটির সামনে বিএনপিকে হতে হচ্ছে রক্ষণাত্মক। কথাটিকে উড়িয়ে দিয়ে মাঠের বাইরে পাঠানো যাচ্ছে না। এটি এক ধরনের উভয় সংকট। বিএনপি না পারবে খালেদা জিয়ার সম্পূর্ণ দায়মুক্তির দাবি থেকে সরতে, না পারবে রাজনীতি করার সম্ভাব্য সুযোগকে একেবারে ফিরিয়ে দিতে।

যদি ফিরিয়ে দেয়, তখন সরকার বলতে পারবে, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সরকারের দেওয়া ছাড় বিএনপি নিচ্ছে না। কারণ, তারা অশান্তি চায়, সুষ্ঠু নির্বাচন চায় না। যেসব বিদেশি শক্তি বিএনপিকে নির্বাচনে দেখতে চায়, তারাও বেজার হতে পারে। জনমতের একটা অংশও ভাবতে পারে যে, বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছায় সাড়া না দিয়ে ভালো করল না। বিএনপির ওপর এইসব মনস্তাত্ত্বিক চাপ কিন্তু সরকার তৈরি করে দিয়েছে।


দক্ষ শাসক কেবল ক্ষমতা দেখিয়ে কাজ করেন না, প্রতিপক্ষকে মনস্তাত্ত্বিকভাবেও কাবু করে রাখতে চান। শুধু বিরোধী দল না, নাগরিকদের যাঁরা রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামান, তাঁরাও যেন শাসকের ছকেই চিন্তাভাবনা করেন-রাষ্ট্রনেতারা সেদিকেও খেয়াল রাখেন। এসব থেকে মনে করাই যায়, সরকারবিরোধী আন্দোলন বেগবান করার মাঝপথে বিএনপির নেতৃত্ব যেন খালেদা জিয়ার রাজনীতি করা না-করা নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েন; তাঁদের কর্মঘণ্টা যাতে এই ব্যাপারেও খরচ হয়। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে চিন্তিত আন্তর্জাতিক মহলও এর মাধ্যমে এই বার্তা পেল যে, বিএনপি চেয়ারপারসনের ব্যাপারে সরকারের অবস্থান নমনীয় এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সরকার খুবই আন্তরিক।

তবে মুশকিলে পড়ে গেল বিএনপি। খালেদা জিয়া গৃহবন্দিত্ব ও কারাবাসের মাঝখানে ঝুলে আছেন। রাজনীতি করতে গিয়ে যদি দেখা যায় আদালত বলছেন, খালেদা জিয়া যদি রাজনীতি করবার মতো সুস্থই হন, তাহলে তো গুরুতর অসুস্থতার কারণে তাঁর সাজা স্থগিত রাখার আর যুক্তি থাকে না। অর্থাৎ রাজনীতিতে ফেরা মানে কাশিমপুর কারাগারের ফটকের দিকেই এগিয়ে যাওয়া। অসুস্থ ও বয়োভারাক্রান্ত একজন মানুষকে নিশ্চিত কারাবাসের হুমকির মুখে রেখে সরকার তার পছন্দমাফিক 'রাজনীতি' করিয়ে নিতে চাইতে পারে। সেটি হলো- তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াই বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন করিয়ে নেওয়া। এ ব্যাপারে সরকার এখন পর্যন্ত মরিয়া।

কেননা, যদি বিএনপি বড় গণআন্দোলন জাগাতে পারে, অন্য বিরোধীদের নির্বাচনী প্রলোভন থেকে সরিয়ে সরকারকে একতরফা নির্বাচনের দিকে ঠেলে দিতে পারে, তাহলে জাতীয় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, টানা তেরো বছরের শাসনজাত অসন্তোষ এবং আন্তর্জাতিক চাপ মিলিয়ে অঘটনের আশঙ্কা বাড়ে বৈ কমে না।

সরকারের পক্ষে ২০১৪ কিংবা ২০১৮ সালের কায়দায় নির্বাচন করিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। এটি তাদের নিরুপায়তা। যখন শাসকেরা আর আগের কায়দায় শাসন চালাতে পারে না পরিবর্তন তখন জরুরি হয়ে পড়ে। তবে এটিই যথেষ্ট নয়। যারা শাসিত, তাদের পক্ষেও যখন আগের মত মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে ওঠে, তখন কিছু ঘটতে পারে। এসব শর্তের যোগফল হলো একটি শব্দ 'নিরুপায়তা'। বিরোধীদের হাজারো সমস্যা, কিন্তু আওয়ামী লীগের চাইতে তারা কম নিরুপায়। বিরোধীদের হারার উপায় আছে, ক্ষমতাসীনদের সব আছে কিন্তু হারবার উপায়টাই নাই। মঞ্চের হাঁকডাক যা-ই হোক, সেটি আমাদের রাজনীতির নাটুকে ঐতিহ্য। কিন্তু নাটকের বাইরে বাস্তবে সমঝোতার প্রয়োজন আওয়ামী লীগেরই বেশি। হারানোর ভয়টা তাদেরই বেশি, যেহেতু তারাই ক্ষমতাসীন। খালেদা জিয়ার 'রাজনীতি করা'র আলোচনা তাই শেষপর্যন্ত একটি মাইন্ডগেম। খালেদা জিয়াকে আটকে রেখে বিএনপিকে নির্বাচনে আনা যে যাবে না, সেটি সরকার ভালো করেই বোঝে। যেটি তাদের বাধ্য হয়েই করতে হবে, সেটিকে উদারতা হিসেবে দেখানোটা তাই একটি কৌশলমাত্র।

বাংলাদেশে দ্বিদলীয় একচেটিয়া শাসনের মূল ভরকেন্দ্র দু'জন ব্যক্তি। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী আরেকজন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। তাঁদের অতীতেও রাজনীতি থেকে মাইনাস করার অপচেষ্টা হয়েছে। এই সরকারের আমলে খালেদা জিয়াকেও মাইনাস করার কম চেষ্টা হয়নি। খালেদা জিয়া সম্ভাব্য সরকারি সুযোগ নিয়ে 'রাজনীতি' করায় যদি রাজি না হন- সেটিই হওয়ার কথা, আপসহীন নেত্রী বলে তাঁর যে পরিচিতি সেটি একেবারে মিথ্যা তো না- তাহলে সরকার কঠোর হবেই হবে। বিএনপিকে নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় যেতে হলে কঠিন পথকেই ভালোবাসতে হবে বলে মনে হয়। কবি তো বলেই গেছেন- কঠিনেরে ভালবাসিলাম, সে কখনো করে না বঞ্চনা। বিএনপি ও খালেদা জিয়ার সামনে সেই অগ্নিপরীক্ষাই হাজির করেছে সরকার।

ফারুক ওয়াসিফ: লেখক ও সমকালের প্ল্যানিং এডিটর
farukwasif0@gmail.com

আরও পড়ুন

×