ঢাকা শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪

পুনর্মূষিকোভব

পুনর্মূষিকোভব

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ২২:৪৩

প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য হিতোপদেশের গল্প আমরা জ্ঞাত রহিয়াছি- আশ্রমে প্রতিপালিত মূষিক কীভাবে মুনির আশীর্বাদে প্রথমে মার্জার, তৎপর যথাক্রমে সারমেয় ও ব্যাঘ্রে পরিণত হইবার পর স্বভাবদোষে পুনরায় মূষিকজীবনে প্রত্যাবর্তন করিয়া ছিল। ঢাকার 'লোকাল' বাসসমূহে 'ই-টিকিট' ব্যবস্থা চালু হইবার কয়েক মাসের মধ্যেই উবাইয়া যাইবার খবর আমাদিগকে সেই গল্পই মনে করাইয়া দিয়াছে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে কে মুনি আর কে মূষিক, উহা নির্ধারণ করা সম্ভব হইতেছে না।

কিন্তু ইহা স্পষ্ট যে, মূষিকেরই প্রজাতি 'গিনিপিগ' লইয়া গবেষণাগারে যেইরূপ পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে উহার জীবন সংশয় ঘটিয়া থাকে, সাধারণ যাত্রীর পরিস্থিতি হইতেছে সেইরূপ। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও আয় হ্রাসে ইতিমধ্যে জেরবার মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত নাগরিক তাহা হইলে পরিত্রাণ পাইবে কীভাবে?

শনিবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাইতেছে, মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় হইতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কপথে চলাচলকারী ২০টি বাসের মধ্যে ১৯টিতেই মালিক সমিতি প্রদত্ত ই-টিকিট যন্ত্র আর ব্যবহূত হইতেছে না। একটি মাত্র পরিবহনে যদিও কন্ডাক্টরের পকেটে যন্ত্রটি দেখা গিয়াছে, উহার ব্যবহার কদাচ নহে। বরং ফিরিয়া আসিয়াছে 'ওয়েবিল পদ্ধতি' তথা যাত্রীগণ যেইখানেই বাস হইতে অবতরণ করুন না কেন, নির্দিষ্ট দূরত্বে মালিক পক্ষের নিযুক্ত 'চেকার' বসিয়া থাকিবার স্থান পর্যন্ত ভাড়া দিতে হইবে। ইহার ফলে বাড়তি ভাড়া গুনিতে হইতেছে যাত্রীগণকে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পর বিভিন্ন মহলের আপত্তি সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ যদিও সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা নির্ধারণ করিয়া দিয়াছে, ওয়েবিল ব্যবস্থার ফাঁদে পড়িয়া উহাও প্রতিপালিত হইতেছে না। আমাদের প্রশ্ন, সড়কপথে ভাড়া লাইয়া এই নৈরাজ্যের কি অবসান ঘটিবে না?

স্বীকার করিতে হইবে, বাস তথা সড়ক পরিবহন ভাড়া লইয়া নৈরাজ্য দীর্ঘদিনের। নির্ধারিত সর্বনিম্ন ভাড়া লইয়া অনেক আলোচনা ও সমালোচনা, মামলা ও জরিমানা সত্ত্বেও পরিস্থিতির যখন উন্নতি হইতেছিল না, তখন মালিক সমিতিই আগাইয়া আসিয়াছিল 'ই-টিকিট' পদ্ধতি লইয়া। ইহাতে চালক-শ্রমিকগণের পক্ষে ফাঁকি দিবার সুযোগ কমিয়া যাইবার কারণে একদিকে যেইরূপ মালিকপক্ষ যথাযথ আয় পাইতেছিল, অপরদিকে যাত্রীদেরও বাড়তি ভাড়া গুনিতে হইতেছিল না।

উভয় পক্ষ বিশেষত যাত্রীগণের স্বস্তির সংবাদ আমরা সমকালেই প্রকাশ করিয়া ছিলাম। আমরা প্রত্যাশা করিয়া ছিলাম, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, গাবতলী ও আজিমপুর সড়কপথের পর পর্যায়ক্রমে রাজধানীর অন্যান্য সড়কপথেও এইরূপ ব্যবস্থার প্রচলন ঘটিবে। কিন্তু এখন দেখা যাইতেছে, সকলই গরল ভেল! আধুনিক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাটির সম্প্রসারণ দূরে থাকুক, সূচনাবিন্দুই মুছিয়া যাইতেছে।

এই ক্ষেত্রে চালক, শ্রমিক ও কন্ডাক্টরের পক্ষে ই-টিকিট যন্ত্র নষ্ট হইবার যেই অজুহাত দেখানো হইতেছে, উহা যে খোঁড়া যুক্তি মাত্র, বিষয়টি লইয়া মালিক সমিতির বিস্ময় প্রকাশের মধ্য দিয়া প্রমাণিত। কিন্তু তাই বলিয়া দ্বিতীয় পক্ষকে সাধুবাদ জানাইবার অবকাশ নাই। ব্যবস্থাটি চালু করিবার সময় সমিতি ঘোষণা করিয়া ছিল যে, উহা কার্যকরে কঠোর নজরদারি থাকিবে এবং নিয়ম না মানা পরিবহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা লওয়া হইবে। কোথায় গিয়াছে সেই নজরদারি? বস্তুত ভাড়া লইয়া নৈরাজ্যের দায় বাস মালিকগণ কোনোভাবেই এড়াইতে পারেন না। প্রকাশ্য দিবালোকে ব্যবস্থাটির ব্যত্যয় ঘটিবার নেপথ্যে যে তাহাদেরও যোগসাজশ কিংবা নির্লিপ্ততা রহিয়াছে, উহা বুঝিবার জন্য বিশেষজ্ঞ হইবার প্রয়োজন নাই।

বলা বাহুল্য, কর্তৃপক্ষও দায় এড়াইতে পারে না। ই-টিকিট লইয়া চালক ও শ্রমিকগণের নিরুৎসাহের কারণ হইল তাহাতে উপরি আয় কমিয়া যাওয়া। মাসিক ৮ হইতে ১২ হাজার টাকার আয়ে দুর্মূল্যের বাজারে তাহারা কীভাবে চলিবে, সেই চিন্তা কর্তৃপক্ষ করিলে পরিস্থিতির সম্ভবত এতটা অবনতি হইত না। এই ক্ষেত্রে পরিবহন শ্রমিকগণের নূ্যনতম মজুরি ও নিয়োগপত্র নিশ্চিত করিবার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কেবল আইন করিয়া বসিয়া থাকিলে উহা সম্ভবপর হইবে না। তবে সর্বাগ্রে ইহা নিশ্চিত করিতে হইবে যে, যাত্রীগণ যাহাতে বাড়তি ভাড়া গুনিতে বাধ্য না হয়। শিল ও পাটার ঘর্ষণকালে মরিচের জীবন যাইবে কেন?

আরও পড়ুন

×