ঢাকা শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

অন্যদৃষ্টি

প্রতিবন্ধীদের ঈদযাত্রা

প্রতিবন্ধীদের ঈদযাত্রা

তালুকদার রিফাত পাশা

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০২৩ | ০৪:৩২

প্রতিবন্ধীর ঈদযাত্রা স্বাচ্ছন্দ্যময় ও নিরাপদ করতে হবে। প্রতি বছর ঈদ আসে খুশির বার্তা নিয়ে এবং আমাদের দেশের রীতি হলো, যেখানেই থাকুক না কেন, সবাই একসঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে চায়। তাই দেখা যায় ঈদের সময় গণপরিবহনে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ।

ঈদযাত্রায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের ভোগান্তির বিষয় সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে থাকে। কিন্তু ঈদে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা স্বচ্ছন্দে ও নিরাপদে যাত্রা করতে পারছেন কিনা, সে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন; প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, সেসব সংস্থা এবং মিডিয়ায়ও খুব একটা আলোচনা হয় না।

প্রতিনিয়ত একজন প্রতিবন্ধীকে সংগ্রাম করে যাতায়াত করতে হয়। এ কষ্ট কয়েক গুণ দাঁড়ায় ঈদযাত্রায়। প্রতিবন্ধীরা এখন আর ঘরে বসে নেই। তাঁরা চাকরি করছেন, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। তাঁদের দেশের বিভিন্ন স্থানে যেতে হয়। অন্যদের মতো তাঁরাও পরিবারের সঙ্গে বিভিন্ন উৎসব উদযাপন করতে চান। ঈদযাত্রায় প্রথম ভোগান্তি শুরু হয় টিকিট কাটা থেকে। অন্য সময় বাস বা লঞ্চের টিকিট কাটা খুব একটা সমস্যা নয়। স্টেশনে গিয়ে টিকিট কাটা যায়। কিন্তু ঈদের দিনগুলোতে অতিরিক্ত চাহিদা থাকায় আগে থেকে টিকিট বুকিং দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে বাস বা লঞ্চের কাউন্টার খুঁজে পাওয়া কঠিন। কারণ কাউন্টারগুলো সুবিন্যস্ত থাকে না। অতিরিক্ত ভিড় হওয়ায় দৃষ্টি, শারীরিক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নির্দিষ্ট কাউন্টার পেতে অনেক কষ্ট করতে হয়। রেলের টিকিট কাটা আরও জটিল। প্রথমে সমাজসেবা প্রদত্ত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি পরিচয়পত্রের অনুলিপিতে সংশ্লিষ্ট স্টেশনমাস্টারের কাছ থেকে সত্যায়িত করিয়ে নিতে হয়। তারপর টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়াতে পারবেন। এত কষ্টের পরও প্রায়ই অর্ধেক ভাড়ার সেই বিশেষ টিকিট প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা পান না।

টিকিট কাটার কঠিন পর্ব পেরিয়ে গন্তব্যে যাওয়ার পালা। সেখানেও প্রতিবন্ধীদের অপরিসীম দুর্ভোগ ও কষ্টই সঙ্গী। ঢাকা থেকে বাসে ওঠার বিষয়টি বেশ কষ্টসাধ্য। প্রথমে একটি ছোট বাসে যাত্রী তোলা হয়। এর পর সেই বাসটিকে মূল বাস স্টপেজের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর যাত্রীরা বাস কর্তৃপক্ষের দেওয়া নম্বর অনুযায়ী তাঁদের মূল বাসটি খুঁজে নেন। ঈদের দিনগুলোয় নম্বর অনুযায়ী বাস খুঁজে বের করতে অপ্রতিবন্ধীরাই হিমশিম খান। রেলের নিচু প্ল্যাটফর্ম, লঞ্চের সরু সিঁড়ি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বহু পুরোনো সমস্যা। যদিও রেল কর্তৃপক্ষ ঢাকা ও চট্টগ্রামের স্টেশনে র‍্যাম্পের ব্যবস্থা করেছে, কিন্তু সেই র‍্যাম্পের শেষ মাথায় গিয়ে একটি সিঁড়ি পার হতে হয়।

প্রতিবন্ধী যাত্রীর টিকিটপ্রাপ্তি, ওঠানামা এবং স্টেশন থেকে বাড়ির জন্য বাহন পাওয়া পর্যন্ত কর্মকর্তা দায়িত্বপ্রাপ্ত থাকবেন। পুরো বিষয়টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইনের ২৩ ধারা অনুযায়ী গঠিত জেলা কমিটি তত্ত্বাবধান করবে। তারা প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা, অর্থ প্রদান এবং উপকরণ নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দেখলে যেন সহায়তা করতে এগিয়ে আসেন, সে বিষয়টি নিয়ে সচেতনতামূলক পোস্টারিং, মাইকিং ও প্রচারপত্র বিলি করতে হবে।

ঈদের দিনগুলোতে টিকিট কালোবাজারি, বাস-ট্রেন-লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী তোলা, গণপরিবহনের ছাদে উঠে যাওয়া অথবা টিকিট কেনার জন্য দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়ানোর মতো বিষয় নিয়ে অভিযোগ করতে শোনা যায় এবং তা সমাধানের জন্য প্রশাসনও তৎপর থাকে। কিন্তু প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা নিরাপদে যাত্রা করতে পারছেন কিনা, সে বিষয়টি নিয়ে খুব একটা ভাবা হয় না। ছোট কিছু পদক্ষেপ যেমন টিকিট কাটার প্রক্রিয়াটি সহজ ও বাহনে ওঠানামায় সহায়তা, আসন খুঁজে দেওয়া, শৌচাগারে নিয়ে যাওয়া, স্টেশনে নামার পর একটা বাহনের ব্যবস্থা করে দিলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যাত্রা নিরাপদ হয়ে উঠবে। এটি করতে অর্থের চেয়ে সদিচ্ছা বেশি প্রয়োজন। আশা করি, এবারের ঈদ থেকেই কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবে। আমাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা হাসি ও আনন্দ নিয়ে ঈদযাত্রা করবেন; আতঙ্ক ও কষ্ট তাঁদের সঙ্গী হবে না।

তালুকদার রিফাত পাশা: পলিসি কর্মকর্তা, ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবিং বাংলাদেশ

আরও পড়ুন

×