ঢাকা সোমবার, ২০ মে ২০২৪

পাকিস্তান

ইমরান খানের আলো ও মরীচিকা

ইমরান খানের আলো ও মরীচিকা

লুবনা জেরার নাকবি

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দণ্ড স্থগিত নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ নেই। পাকিস্তানের রাজনীতি সবসময়ই এমন চমকপ্রদ খবর দিয়ে থাকে।
রাষ্ট্রীয় উপহার অবৈধভাবে বিক্রির জন্য অর্থাৎ তোশাখানা মামলায় ২৯ আগস্ট ইসলামাবাদ হাইকোর্ট ইমরান খানের দণ্ড স্থগিত করেছিলেন। সমর্থকরা ভেবেছিল, ইমরান খানের বিরুদ্ধে করা প্রায় ১৫০টি মামলা থেকেই তাঁকে খালাস দেওয়া হবে। দুর্ভাগ্যজনক, তাঁর সমর্থকদের আনন্দ স্বল্পস্থায়ী হয়েছিল। কারণ তাদের নেতা মুক্তি পাননি। কারণ তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের গোপন নথি ফাঁসের মামলাসহ অন্যান্য মামলা চলমান। আপাতত ইমরান খানকে জেলেই কাটাতে হবে। অন্তত আরও দুই সপ্তাহ তাঁকে কারাগারে থাকতে হবে, পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত।

গত ৫ আগস্ট গ্রেপ্তার হওয়ার পর ইসলামাবাদের জেলা ও দায়রা আদালতের বিচারক ইমরান খানকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। রাষ্ট্রীয় উপহার বিক্রির দায়ে তোশাখানা মামলায় আদালত তাঁকে তিন বছরের কারাদণ্ড ও ১ লাখ রুপি জরিমানার নির্দেশ দেন। এই দণ্ড সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে নির্বাচনে প্রতিযোগিতার অযোগ্য ঘোষণা করে। সেই থেকে তিনি জেলে। এর আগেও তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এ বছরের ৯ মে। ওই সময় তিনি শুধু দুই দিন জেলে ছিলেন। এবার ইতোমধ্যে প্রায় এক মাস কেটে গেছে।
পাকিস্তানের রাজনীতিতে কখনোই নিরানন্দ ছিল না। কিন্তু ইমরান খানের বেলায় যা ঘটেছে তা আরও চমকপ্রদ। নওয়াজ শরিফ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁকে রাজনীতির ময়দানে দেখা যায়। ইমরানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) ছিল মূলত তারুণ্যনির্ভর। তারা পিটিআইকে আলোচনায় আনার জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে। এতে সফলও হয়।

সন্দেহ নেই, এ মুহূর্তে ইমরান খান পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অন্যতম। তাঁর নিবেদিত সমর্থক রয়েছে। গ্রেপ্তারের পর তাঁর কর্মীরা সে জন্যই সহিংসতা চালায়; পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে তারা আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এসব ঘটনায় প্রধানত তরুণরা গ্রেপ্তার হয়েছিল। তাদের অনেকেই এখন জেলে এবং তারা তাদের নেতাকে ভালোবেসে নিজেদের ভবিষ্যৎ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।
ইমরান খান রাজধানী ইসলামাবাদের মাঝখানে রেকর্ড গড়া ১২৬ দিন প্রতিবাদী অবস্থান নিয়েছিলেন। রাজনীতিতে চলমান অচলাবস্থায় তাঁকে পরিবর্তনের প্রবক্তা মনে করে অনেকে সেই আন্দোলনে যুক্ত হন। তারা বিশ্বাস করেছিলেন, দশকের পর দশক ধরে বংশপরম্পরায় দেশ শাসনকারীদের কবল থেকে ইমরান খান তাদের উদ্ধার করবেন। ইমরান খানের রাজনৈতিক যে এজেন্ডা তার আন্দোলনকে জনপ্রিয় করে তা হলো, এসব রাজনৈতিক পরিবারের দুর্নীতি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তাদের জন্য একমাত্র ভালো বিকল্প তাঁর দল পিটিআই। মানুষকে আকৃষ্ট করতে তিনি কেবল তাঁর মনোহারী শক্তি ও দক্ষতাই ব্যবহার করেননি; একই সঙ্গে তাদের স্মরণ করিয়ে দেন– তিনি ছিলেন ক্রিকেটের ক্যাপ্টেন এবং বিশ্বকাপ তিনি জয় করেছিলেন। তাঁর সমর্থকরা বিশ্বাস করেন, তিনি রাজনীতির ত্রাণকর্তা। 

ইমরান খানের ক্যারিশমা এমনকি তাঁর সমালোচকদেরও বিস্মিত করেছিল। তাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে, অতীতে জুলফিকার আলি ভুট্টো (পিপিপি) ও আলতাফ হুসাইনের (এমকিউএম) সমর্থকদের ওপরেও এমন সম্মোহনী প্রভাব ছিল। যা হোক, আন্দোলনের চার বছর পর ইমরান খান ২০১৮ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।
ইমরানের পূর্বসূরি তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ দুর্নীতির দায়ে প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে অপসারিত হন। তাঁকে সাত বছরের কারাদণ্ড এবং আড়াই কোটি ডলার জরিমানা করা হয়। আত্মবিশ্বাসী ইমরান খান মনে করেছিলেন, তিনি দেশে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবেন। ইমরান এ বিষয়ে কথা বলেই গেছেন; কিন্তু কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। বেশির ভাগ প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। তিনি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেগুলো পূরণ করা প্রয়োজন ছিল। তাঁর অনুসারীদের একটি অংশ অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করেছিলেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন, ইমরান খান উল্লেখযোগ্য কিছু করছেন না এবং আশঙ্কা করেছিলেন, তারা প্রতারিত হতে যাচ্ছেন।

দুর্ভাগ্যবশত ইমরান এ ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, তিনি ভালো কাজ করছেন। এ কারণে তিনি তাঁর মেয়াদ পূর্ণ করতে পারবেন এবং পুনরায় নির্বাচিত হবেন। অনেকে বলেন, তিনি আজীবন শাসনের চিন্তা করছিলেন। পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোট আয়োজনে বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাঁকে যথেষ্ট স্বচ্ছন্দ দেখাচ্ছিল। ফলে তাঁর অবস্থানে তিনি নিরাপদ বোধ করেন এবং বিরোধীদের অনাস্থা ভোটের আগ পর্যন্ত ভয় পাননি।

অবস্থার আলোকে মনে হয়েছিল, ইমরান খান পার্লামেন্ট ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতির শক্তি সম্পর্কে তেমন সচেতন ছিলেন না। তিনি জাতীয় পরিষদের নিম্নকক্ষে অনুপস্থিত থাকতেন। সম্ভবত নিশ্চিত ছিলেন, অনাস্থা ভোট ভেস্তে যাবে এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখতে সক্ষম হবেন। কিন্তু তেমনটা ঘটেনি। ২০২২ সালের এপ্রিলে তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে অপসারিত হন। এ বছর প্রথমে ৯ মে এবং এর পর ৫ আগস্ট গ্রেপ্তার হন।
এখনও ইমরানের আইনজীবীরা মনে করেন, তাঁকে অন্যায়ভাবে জেলে দেওয়া হয়েছে। দাপ্তরিক গোপনীয়তার আইনে তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলা অবৈধ এবং রাজনৈতিক উদ্দশ্যপ্রণোদিত। আপাতত পাকিস্তানের রাজনীতি উত্তপ্ত হচ্ছে। কারণ পিটিআইর ক্যারিশমাটিক নেতা তাঁর সেলে ফিরে যাবেন। সমর্থকদের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ থাকবে না। তবে এর অর্থ এই নয়– সব শেষ হয়ে যাবে। ইমরান খান হলেন পাকিস্তানের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, যিনি সবসময় কোনো না কোনো উপায় বের করেন।   
 
লুবনা জেরার নাকবি: পাকিস্তানি সাংবাদিক; দ্য কুইন্ট থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর
মাহফুজুর রহমান মানিক

আরও পড়ুন

×