ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

বিশ্ববিদ্যালয়

নারীর পোশাক বিতর্কে সীমা লঙ্ঘন করছে কারা

নারীর পোশাক বিতর্কে সীমা লঙ্ঘন করছে কারা

উম্মে রায়হানা

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০

প্রযুক্তির কাঁধে ভর করে তথ্যের অবাধ প্রচার বিভিন্ন সময়েই তৈরি করে নানা বিভ্রান্তি। যেমন হঠাৎ সামাজিক মাধ্যমে দেখা গেল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. ওয়াহিদুজ্জামান বলেছেন, যারা পর্দায় থাকতে চায়, তাদের উচিত বাড়িতে বসে পড়াশোনা করা। ব্যস, তিনি এক কথায় ইসলামবিদ্বেষী, অগণতান্ত্রিক, আধিপত্যবাদী ট্যাগ পেয়ে গেলেন। কোন পরিস্থিতিতে, কোন প্রসঙ্গে তিনি এ কথা বলেছেন, তা খতিয়ে না দেখেই শুরু হয়ে গেল ফেসবুকে ট্রল করা।

নারী শিক্ষার্থীদের পর্দা করার অধিকার নিয়ে আলাপ এখন আর নতুন নয়। এর আগে ২০২২ সালে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে এবং এ বছর রাজু ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান, সমাবেশ ইত্যাদি করেছেন বেশ কিছু নারী-পুরুষ শিক্ষার্থী। জন্মগতভাবে মুসলিম হওয়ার কারণে আমার সাধারণ বুদ্ধি বলে, অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে বা রাজু ভাস্কর্যের সামনে সমাবেশ করা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা নয়। শহীদ মিনার বরং শ্রেয়, কেননা সেখানে মানুষের অবয়ব নেই। কিন্তু সেটা অন্য প্রসঙ্গ। মূল প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পর্দা করার অধিকার নিয়ে আন্দোলন করতে হবে কেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের তো কোন ড্রেস কোড নেই। কোনো নারী শিক্ষার্থী বোরকা পরে ক্লাস করলে বা হিজাব দিয়ে মাথা ঢেকে রাখলে কেউ তো কিছু বলে না! সমস্যা তখনই সৃষ্টি হচ্ছে, যখন কোনো নারী শিক্ষার্থী নিকাব দিয়ে নিজের মুখমণ্ডল ঢেকে রাখতে চাইছেন; পুরুষ শিক্ষক বা পরীক্ষকরা তাদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারছেন না। পরিচয় নিশ্চিত হতে না পারলে কী কী সমস্যা হতে পারে তার উদাহরণ ভূরি ভূরি। কিছুদিন আগে এইচএসসি পরীক্ষায় এমন দেখা গেছে। নিকাবের আড়ালে একজনের পরীক্ষা আরেকজন দিয়ে দিচ্ছে। গ্রামগঞ্জে পুরুষ মানুষ বোরকা পরে এসে নারী শিক্ষার্থীর প্রক্সি পরীক্ষা দিয়েছে, এমনও শোনা গেছে। জগতে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা তো আর নিউজে আসে না সবসময়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ফরমে পাসপোর্ট সাইজ ছবি থাকতে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশে সব উচ্চতর বিদ্যাপীঠে যারা ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন তারা সবাই সাধারণ শিক্ষার্থী। ছবিসহ ফরম জমা দিয়েই তারা এ পর্যন্ত এসেছেন। তাহলে এখন তারা কেন পুরুষ শিক্ষকের সামনে মুখ দেখাতে পারছেন না। সবচেয়ে বড় কথা, যা বাধ্যতামূলক নয় তা নিয়ে কেন এত প্রহসন!
ইসলাম নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে বিদ্যাশিক্ষা করতে প্রয়োজনে সুদূর চীনে যেতে পর্যন্ত যেতে বলেছে। একজন মাইক্রোবায়োলজি বা চিকিৎসাবিদ্যার শিক্ষার্থীকে ল্যাবে অবশ্যই অ্যাপ্রন পরতে হবে। সেখানে তো আলখাল্লার মতো বোরকা পরে যাওয়াটা নিরাপদ হবে না। আমাদের দেশে অনেক শিক্ষক, চিকিৎসক ও আরও নানা পেশাজীবী নারী আছেন, যারা ফুলহাতা, পেটঢাকা ব্লাউজের সঙ্গে ম্যাচিং করে হিজাব পরেন। তারা সব রকম ও সব রঙের শাড়ি পরে পর্দার মধ্যে থেকেই মানুষের পেট কেটে বাচ্চা বের করা থেকে শুরু করে সংসদে জনপ্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য রাখা পর্যন্ত সব কাজই করছেন।

ড. ওয়াহিদুজ্জামান বলেছিলেন, যারা পর্দায় থাকতে চায়, তাদের উচিত বাড়িতে বসে পড়াশোনা করা। খেয়াল করে দেখলে তিনি ভুল কিছুই বলেননি। আরব দেশেও কেবল সম্ভ্রান্ত বা রাষ্ট্রীয় সম্মানে সম্মানিত নারীরই মুখ ঢেকে রাখতে হতো। ইসলামের প্রসারের পর সেই নিয়ম আরোপিত হয় মহানবী (সা.)-এর স্ত্রীদের ওপর। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে তাঁরাই সবচেয়ে সম্মানিত; তাঁরা মুসলিম জাতির মা বা উম্মুল মুমিনিন। কেউ যদি কালিমা পড়ে মুসলিম হয়েই নিজেকে উম্মুল মুমিনিনের সমকক্ষ সম্ভ্রান্ত মনে করেন, তাঁর/তাদের পক্ষে বাড়িতে থাকাই শ্রেয়। ড. ওয়াহিদুজ্জামান নারীর পড়াশোনার দরকার নেই– এমন কথাও বলেননি। কভিড-পরবর্তী পৃথিবীতে অনলাইনে পড়াশোনার সুব্যবস্থা হয়েছে। এখন সুদূর চীনে না গিয়েও বাংলাদেশে বসে একটা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নামকরা চীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছ থেকে চায়নিজ ভাষা শিখে ফেলা এবং তাঁর সার্টিফিকেট পেয়ে যাওয়াও সম্ভব।

ট্রল করতে গিয়ে বলা হয়েছে, যারা নারীকে বেপর্দা দেখতে চায়, তাদের উচিত পতিতালয়ের দালালি করা। পতিতাবৃত্তি এমন এক পেশা, যা এই পুরুষাধিপত্যবাদী সমাজই যুগে যুগে, দেশে দেশে টিকিয়ে রেখেছে এবং যে কোনো খারাপ কিছুকেই পতিতাবৃত্তির সঙ্গে তুলনা করে যাচ্ছে এ ব্যবস্থা নিজেই। যেমন ভিক্ষাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করার জন্য বলা হয়, ভিক্ষাবৃত্তি পতিতাবৃত্তির চেয়েও খারাপ। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রাজনীতিবিদদের অসততার তুলনা করেন পতিতাদের সততার সঙ্গে; ‘বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে’– এই কথা বলে। পতিতাবৃত্তি যদি এতই খারাপ, তাহলে সেটার দালালি আরও বহুলাংশে খারাপ হওয়ার কথা। যে পতিতা সে না হয় অভাবের তাড়নায় বাধ্য হয়ে নিজের যৌনতা বিক্রি করছে। পুরুষ দালাল কোনো পরিশ্রম না করে অন্য একজনের যৌনসেবা থেকে উপার্জন করছে। এর চেয়ে ভয়াবহ পতিত তো আর কিছু হতেই পারে না। একজন শিক্ষককে এই কথা বলা নিতান্তই অন্যায় ও অসমীচীন। এই সময় কোথায় থাকে শালীনতার প্রশ্ন!      
পর্দা এবং বেপর্দা– এই রকম সহজ-সরল বিভাজন দিয়ে নারী জাতিকে ডিভাইড অ্যান্ড রুলের ফাঁদে ফেলে বোকা বানানোর সময় সম্ভবত পেরিয়ে গেছে। সতী-বেশ্যা বিভাজনের জুজুর ভয় যদিও অনেক ক্রিয়াশীল, কিন্তু একজন শিক্ষককে পতিতালয়ের দালাল বলে গাল দিলেও খুব ইতরবিশেষ হয় না। এই গালাগাল এবং প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ সমাবেশের প্ল্যাকার্ডে বড় বড় করে লেখা ‘ঘৃণা’ শব্দের ব্যবহারই প্রমাণ করে– কে ইতর আর কে বিশেষ! মুসলিমদের পবিত্র গ্রন্থ কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে– নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না। হজরত আলী (রা.) বলেছেন, খারাপ লোকের অস্ত্র হচ্ছে অশ্লীল বাক্য। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নিকাব থেকে শুরু করে শিক্ষককে অশালীন ভাষায় গালাগাল করা পর্যন্ত সব বিষয়ে বাড়াবাড়ি ও সীমা লঙ্ঘনকারীদের আল্লাহ ক্ষমা করবেন কি?

উম্মে রায়হানা: সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×