ঢাকা সোমবার, ২০ মে ২০২৪

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

বিএনপি এখন আগুনে পুড়ে খাঁটি সোনা

বিএনপি এখন আগুনে পুড়ে খাঁটি সোনা

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০

দেশের এক ক্রান্তিকালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির জন্ম হয়েছিল। গণতন্ত্র, আইনের শাসন, ভোটাধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি, সাম্য, মানবিক মর্যাদাসহ যেসব লক্ষ্য নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, সেগুলো পূরণে তৎকালীন শাসকদের ব্যর্থতা মানুষকে চরম হতাশ করেছিল। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চরম আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল। এমনকি শান্তিপূর্ণ ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক শূন্যতা পূরণে বিএনপির জন্ম হয় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সামরিক বাহিনীর লোক ছিলেন, এটা ঠিক। এ নিয়ে অনেক সমালোচনাও করা হয়। কিন্তু এটাও স্বীকার করতে হবে, তিনি কিন্তু সামরিক আইন জারির মাধ্যমে বা জোর করে ক্ষমতা দখল করেননি। এগুলো করেছিল তাঁর পূর্ববর্তী সরকার; ক্ষমতার পটপরিবর্তনও তারাই ঘটিয়েছিল। তারাও যখন ব্যর্থ হয় তখন সিপাহি-জনতার মাঝে জিয়াউর রহমানকে ঘিরে বিরাট এক প্রত্যাশা জাগে। সেই প্রত্যাশা পূরণেই তিনি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেন। এটাও মনে রাখতে হবে, দুনিয়ায় এমন উদাহরণ কম নেই, যেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুপস্থিতি বা ব্যর্থতায় সামরিক বাহিনীর নেতারাই জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে নেতৃত্ব দেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান নেতা, যাঁকে তাদের জাতির পিতাও বলা হয়– জর্জ ওয়াশিংটন তো সামরিক বাহিনীর লোক ছিলেন। মিসরের জাতীয়তাবাদী নেতা, আরব জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা জামাল আবদুল নাসেরের মতো অনেকেই আছেন, যারা একটা সংকট মুহূর্তে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে আজও বিশ্বে নন্দিত হয়ে চলেছেন।

জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে তো ক্ষমতা কুক্ষিগত করেননি; বরং একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার জায়গায় বহুদলীয় ব্যবস্থার প্রচলন করেন। চারটি সংবাদপত্র থেকে তিনি বহু সংবাদপত্রের দ্বার খুলে দেন; সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনেন; সর্বজনীন ভোটাধিকারের মাধ্যমে বহুদলীয় গণতন্ত্র চর্চার পথ উন্মোচন করেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সবকিছু রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাওয়ায় এর আগে দেশের অর্থনীতিতে যে ভয়াবহ সংকোচন ঘটেছিল, যার কারণে দেশে একটা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ পর্যন্ত হয়েছিল; সেখানে তিনি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেন। মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রচলন ঘটিয়ে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখার সুযোগ করে দেন। এর ফলও আমরা দেখি তাঁর সময়ে দেশে সতেজ অর্থনৈতিক ক্রিয়াকর্মে। একদিকে খাদ্য উৎপাদন বেড়ে যায়, এমনকি রপ্তানিও হয়। অন্যদিকে শিল্প প্রতিষ্ঠায় বেসরকারি উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসেন। আজকের তৈরি পোশাকশিল্পের সূচনা হয় তাঁরই উদ্যোগে। জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ তিনিই দেখিয়ে দেন।

আমরা জানি, যে দেশে জাতীয় ঐক্য থাকে না, সে দেশের অগ্রগতি অসম্ভব। স্বাধীনতার পরপর তৎকালীন সরকারের ভুল নীতির কারণে বাংলাদেশে কিন্তু জাতীয় ঐক্য ছিল না; বাঙালি জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে জনগণের একটা উল্লেখযোগ্য অংশকে ঐক্যের বাইরে রাখা হয়েছিল। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ চালু করে দেশের সব মানুষকে একটা ছাতার নিচে এনে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেন।
তিনি একদিকে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন, আরেকদিকে মুসলিম বিশ্বে সবার সঙ্গে সমান সম্পর্ক রাখার দিকে মনোযোগ দেন। সার্ক গঠনের মাধ্যমে দক্ষিণ এশীয় ভ্রাতৃত্ববোধ চর্চার জায়গা তিনিই করে দেন।

মোট কথা, বাংলাদেশের যে স্বাধীনতার ভাবনা, আইডিয়া অব বাংলাদেশ– তা বাস্তবায়নে জিয়াউর রহমান মনোনিবেশ করেন। তারই অংশ হিসেবে তিনি বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। বিএনপির মূলনীতির মধ্যে তিনি এসব বিষয় ঢুকিয়েছিলেন, যে কারণে আজও আমরা সেগুলো মেনে চলি।

যারা সামরিক বাহিনীর লোক বলে জিয়াউর রহমানের সমালোচনা করেন, তারা আসলে হীনম্মন্যতা থেকে এটা করেন। আমরা মনে করি, আপনি কোন প্রেক্ষাপট থেকে এসেছেন, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনার নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা আছে কিনা; জাতির স্বপ্ন পূরণে আপনার সক্ষমতা আছে কিনা। এগুলোর অধিকারী ছিলেন বলেই জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের জনগণের মাঝে এতটা জনপ্রিয় এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপিও সবচেয়ে জনপ্রিয় দল।
বিএনপি এত জনপ্রিয় বলেই বারবার তাঁর ওপর আঘাত এসেছে এবং বিএনপি আবার সে আঘাত উতরেও যেতে পেরেছে। আমরা মনে করি, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দেওয়া এবং সে মামলায় সাজা প্রদানের মাধ্যমে তাঁকে কারাবন্দি রাখার ঘটনা এ জন্যই ঘটছে। টাকা তিনি ছুঁয়ে না দেখার পরও এবং তা ব্যাংকে সুদাসলে তিন গুণ হওয়ার পরও খালেদা জিয়াকে আজকে অর্থ আত্মসাতের বায়বীয় অভিযোগে কারাভোগ করতে হচ্ছে। এসব মানুষ বোঝে। আর বোঝে বলেই শত-সহস্র অপপ্রচার সত্ত্বেও বিএনপিকে দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না। হাজারো বাধা তৈরির পরও মানুষ দলে দলে বিএনপির সভা-সমাবেশে যোগ দিচ্ছে। সরকার বহু চেষ্টা করেও বিএনপিকে ভাঙতে পারছে না।
সরকারের প্রতিহিংসার কারণে দলের মূল নেতত্বের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও আজকে যেভাবে বিএনপি আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, তা এর শক্তিমত্তারই বহিঃপ্রকাশ।


একটা কথা আমি আজকাল প্রায়ই বলি, বর্তমান সরকারের কল্যাণে একদিকে বহু ঐতিহ্য সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক চরিত্র হারিয়েছে; অন্যদিকে বিএনপি একটা খাঁটি রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এখন ব্যস্ত ক্ষমতার হালুয়া-রুটি ভোগ, টেন্ডারবাজি, ব্যাংকের টাকা লোপাট করে অর্থনীতিকে ফোকলা করে দিতে, মানুষের জমি দখলে। দলটি এভাবে জনগণ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। অন্যদিকে বিএনপি নেতাকর্মী মামলা-মোকদ্দমা, হামলা, দমন-পীড়ন মোকাবিলা করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের গুলিতে এবং ক্ষমতাসীন দলের হামলার কারণে বিএনপির ২০ জন নেতাকর্মী শহীদ হয়েছে। ৪৫ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও গায়েবি মামলা আছে। গুম-খুনও চলছে। তবুও তাদের দমানো যাচ্ছে না। নেতাদের আহ্বান পেলেই হলো, তারা ২০০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে, নৌকায় করে, এমনকি নদী সাঁতরে, চিড়া-মুড়ি খেয়ে জনসভায় হাজির হচ্ছে। স্বর্ণ যেমন আগুনে পুড়ে খাঁটি হয়, বিএনপি নেতাকর্মীও এভাবে দলের সঙ্গে, দেশের মানুষের সঙ্গে গভীর থেকে গভীরতরভাবে একাত্ম হচ্ছে।
এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, বর্তমান আন্দোলন কিন্তু কোনো রাজনৈতিক সরকারের বিরুদ্ধে হচ্ছে না; এটা হচ্ছে একটা অপশাসনের বিরুদ্ধে। সরকারটা চালাচ্ছে কিছু দুর্বৃত্ত রাজনীতিবিদ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, দুর্নীতিবাজ আমলা আর লুটেরা ব্যবসায়ী চক্র। ক্ষমতা কিন্তু কোনো রাজনীতিবিদের হাতে নেই; কতিপয় লুটেরা ব্যবসায়ীর হাতে। এ সরকার একটা স্বাভাবিক রাজনৈতিক সরকার নয়। ইতোমধ্যে তা একটা স্রেফ নিপীড়ক, নির্যাতক যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। ভাবা যায়, যুক্তরাষ্ট্র সরকার তার ভিসা নীতির আওতায় বিচার বিভাগকেও যুক্ত করেছে! এর কারণ সবাইকে এ সরকার তাদের ভোট চুরির প্রকল্পে শামিল করেছে। ফলে চলমান আন্দোলন সহজ কোনো আন্দোলন নয়। কৌশলেও ভুল করার কোনো সুযোগ এখানে নেই।

সরকার কিন্তু বারবার চাচ্ছে আমাদের সহিংসতার দিকে ঠেলে দিতে। কিন্তু একটা শান্তিপ্রিয় গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপি সে ফাঁদে পা দেবে না। আমরা অহিংস ধারায় আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি এবং যাব। এতে হয়তো সাফল্য পেতে একটু সময় বেশি লাগবে। কিন্তু জনগণ অধিক হারে ও মাত্রায় আমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে।
সবার মনে থাকার কথা, ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের সময় সরকার বলেছিল, এটা একটা নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। দ্রুত সবাইকে নিয়ে একটা ভালো নির্বাচন তারা করবে। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি সরকার রাখেনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে আবার একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি তারা দেয়, যেখানে বিএনপি অংশগ্রহণ করে। কিন্তু তারা বিএনপিকে এতটাই ভয় পায় যে, স্বাভাবিক সময়েও ভোট করার সাহস তারা পায়নি। এ দুটো নির্বাচনের নামে চূড়ান্ত প্রহসনের পর এ সরকারের কাছে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পর্কিত ন্যূনতম প্রত্যাশা শুধু আমরা নই, জনগণও হারিয়ে ফেলেছে। তাই বর্তমান আন্দোলন আর বিএনপির আন্দোলন নেই। এটা জনগণের সার্বিক মুক্তির আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী, এ দেশের জনগণ কোনো বিষয়ে একবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর যে কোনো মূল্যে তা বাস্তবায়ন করে ছাড়ে। শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয়; নিকট অতীতের স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও তা প্রমাণ হয়েছে। অতএব, বর্তমান আন্দোলন সফল হবেই। এমনও হতে পারে, রাজনৈতিক চরিত্র হারিয়ে এ সরকার ফোকলা হওয়ার কারণে নিজে থেকেই ভেঙে পড়তে পারে।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: বিএনপির  স্থায়ী কমিটির সদস্য

আরও পড়ুন

×