প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সদ্য সম্পন্ন চার দিনের ইতালি সফর 'নতুন' ইউরোপের জন্য আগামী দিনের কূটনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। চলতি বছরে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের প্রথম দ্বিপক্ষীয় এই সফর নিয়ে যদিও আগে-পরে জনপরিসরে খুব বেশি আলোচনা হয়নি, আমরা মনে করি- এতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পথরেখা তৈরি হয়েছে। মনে রাখতে হবে, ইউরোপ যখন ব্রেক্সিট-পরবর্তী যুগে প্রবেশ করেছে, তখন আমাদের দিক থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইতালি একটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ। অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ যুক্তরাজ্যের পর ইতালিতে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি অভিবাসী রয়েছে। বস্তুত ১ লাখ ৪০ হাজার বৈধ অভিবাসীর বাইরে নানাভাবে অবস্থানরত অন্য বাংলাদেশি নাগরিকদের ইউরোপে অভিবাসন প্রক্রিয়ায় দেশটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আশা করব, খোদ ইতালি আরও বাংলাদেশি অভিবাসী গ্রহণ করবে। বিশেষত কৃষি খাতে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির যে প্রক্রিয়া এখন বন্ধ রয়েছে, তা যত দ্রুত পুনর্বহাল হয়, ততই মঙ্গল। যে দেশের সঙ্গে আমাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ইতোমধ্যে দুই বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়েছে, তার বাণিজ্যিক গুরুত্বও নতুন করে বলার নেই। বিশেষত শিল্পোন্নত দেশগুলোর প্রভাবশালী জোট 'জি-সেভেন' সদস্য হিসেবেও ইতালি বৈদেশিক বাণিজ্যে যে ভূমিকা রেখে থাকে, বাংলাদেশ সেখান থেকে আরও সুবিধা পেতে পারে। আমরা দেখছি, দেশটির প্রধানমন্ত্রী জিউসেপ কোঁতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তৈরি পোশাক খাত, ওষুধ শিল্পসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যের শুল্ক্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিয়ে কথা হয়েছে। অচিরেই যখন স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটবে, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়নে ওই সুবিধা আমরা নাও পেতে পারি। এ ক্ষেত্রে ইতালি যদি জোরালো ভূমিকা গ্রহণ করে, তাহলে শুল্ক্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের সুবিধা অব্যাহত থাকতে পারে। আমরা দেখতে চাইব, সামনের দিনগুলোতে এ ব্যাপারে দুই দেশ আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। একই প্রত্যাশা রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও। আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত মিয়ানমারকে যে অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনা দিয়েছে, তা প্রতিপালনে চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে রোম অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সহায়তায়ও একক বা যৌথভাবে এগিয়ে আসতে পারে দেশটি। আমরা মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর ইতালি সফরের মধ্য দিয়ে সম্ভাবনার যেসব দ্বার খুলে গেছে, তা কাজে লাগতে হলে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরালো ও অব্যাহত রাখার বিকল্প নেই। একই সুপারিশ আমরা করতে চাই ইউরোপের অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও। নতুন বাস্তবতায় নতুনতর মাত্রা ও নিশানা নিয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিকল্প নেই। ক্ষুদ্র কিন্তু প্রভাবশালী রাষ্ট্র ভ্যাটিকানপ্রধান পোপের সঙ্গে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎ এবং রোমের বাংলাদেশ দূতাবাসে নতুন চ্যান্সেরি ভবন উদ্বোধন ইউরোপে আমাদের সম্প্রসারিত ও দৃঢ়তর উপস্থিতিরই স্মারক।