একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির চেতনায় কেবল সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহারিক পরিধি বিস্তৃত করার আহ্বান নিয়ে ফিরে আসে না-আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদায় উন্নীত এ দিনটি ফিরে আসে দেশের সব ভাষাভাষী মানুষের মাতৃভাষা বিকাশের অঙ্গীকারকে মনে করিয়ে দিতে; ফিরে আসে সাম্প্রদায়িকতা ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রত্যয় তুলে ধরতে।
এমন দিনে বিনম্রচিত্তে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি ভাষাশহীদদের। ভাষার অধিকার রক্ষায় তাদের যে সংগ্রাম, তা প্রশস্ত করেছে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথকে। মাথা নত না করার যে শিক্ষা তারা বাঙালি জাতিগোষ্ঠীকে দিয়ে গেছেন, তা ছড়িয়ে পড়েছে সারাবিশ্বের জাতিগোষ্ঠী, আদিবাসী, নৃগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে। যদিও এ কথা বলতেই হয়, ভাষা নিয়ে আমাদের যত গর্বই থাক, এখনও এর সর্বাত্মক চর্চা এ দেশে সম্ভব হয়নি। তাই এ দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, নবপ্রত্যয়ে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের শপথ নেওয়ার অবশ্যম্ভাবিতা।
এটি ঠিক, বাংলা ভাষা আজ বিশ্বের অনেক দেশেরই দাপ্তরিক ভাষা। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার পর বাঙালি জাতি ও বাংলা ভাষার ভাবমূর্তিই শুধু উজ্জ্বল হয়নি, বিশ্বের সব মাতৃভাষাই বিশেষ মর্যাদা ও মনোযোগ লাভ করেছে। আমরা নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি, বাংলা ভাষা একদিন জাতিসংঘের অন্যতম দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা পাবে। আমরা এই স্বপ্ন দেখি যে, সবার মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে পূর্ণাঙ্গভাবে। আমাদের দেশেও অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে। রয়েছে তাদের নিজস্ব ভাষা। তাদের সেই ভাষা রক্ষার যে কার্যক্রম রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে নেওয়া হয়েছে, তা অব্যাহত রাখতে হবে এবং আরও বিকশিত করতে হবে। আমরা যেন ভুলে না যাই, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের চেতনাই হচ্ছে সব জনগোষ্ঠীর ভাষা রক্ষা করা।
একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু আমাদের গৌরবোজ্জ্বল আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় না- আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখিও করে। এই আত্মজিজ্ঞাসা হলো- মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার মধ্য দিয়ে আমাদের স্বাধিকার ও আত্মপরিচয়ের যে প্রত্যয় প্রকাশিত হয়েছিল, এর কি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ঘটাতে পেরেছি? আমরা বলব না, এ লক্ষ্যে কাজ হয়নি; কিন্তু একই সঙ্গে এও লক্ষণীয়, করণীয় রয়ে গেছে আরও অনেক কিছু। কারণ, আমাদের বৃহত্তর পেশাগত জীবন ও জগতে মাতৃভাষাকে আমরা এখনও ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারিনি। এ ক্ষেত্রে যেমন আরও সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন, তেমনি দরকার তার দ্রুত বাস্তবায়ন। বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র, প্রকৌশলবিদ্যাসহ বহু বিষয়েই এখনও মাতৃভাষাকে আমরা শিক্ষার বাহন করতে পারিনি। অথচ বিশ্বের অগ্রসরমান সব দেশই মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষার দরজা উন্মুক্ত করেই পেরেছে সক্ষম হতে, এগিয়ে যেতে। আমরা এ থেকে শিক্ষা নিতে পারি।
বিশ্বায়নের এ যুগে সবকিছুর অবাধ প্রবাহের মধ্যে আমরা কোনটি গ্রহণ করব কিংবা কোনটি বর্জন করব, তা নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি-সমাজের বিকাশের নিরিখেই নির্ণয় করতে হবে। মাতৃভাষার প্রতি আমাদের আবেগ-ভালোবাসা নির্দিষ্ট মাসে যেন থেমে না থাকে। আনুষ্ঠানিকতায় যেন গণ্ডিবদ্ধ না থাকে। একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের আত্মপরিচয় ও স্বকীয়তাবোধের চেতনা থেকে জাগ্রত ও উৎসারিত দিন। এই গর্বের জায়গা থেকেই ভাষা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও কৃষ্টি এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে হবে। তাহলেই ভাষাশহীদদের প্রতি যথার্থ সম্মান দেখানো হবে।