একটি যুগের অবসান- বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট টিমের একদিনের দলের অধিনায়কত্ব থেকে মাশরাফি বিন মুর্তজার অবসরের মুহূর্তকে এভাবেও আখ্যা দেওয়া যেত। আমরা বলতে পারি- সূচনা হলো এক নতুন যুগের। নতুন অধিনায়ক তামিম ইকবালকে আমাদের অভিনন্দন। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ইতিহাস দুই ভাগে বিভক্ত- মাশরাফি বিন মুর্তজার অধিনায়কত্বের আগের ও পরের- বললেও হয়তো অত্যুক্তি হয় না। চোটের কারণে মাঝেমধ্যে মাঠের বাইরে থেকেছেন বটে; একদিনের দলের বাইরে টেস্ট ও টি২০ দলে খুব বেশিদিন নেতৃত্ব দেননি যদিও; বাংলাদেশের ক্রিকেট জগতে 'ক্যাপ্টেন' বলতে গত এক দশকে ওই একজনেরই পরিচিতি গড়ে উঠেছে। বস্তুত বাংলাদেশ দলকে সবচেয়ে বেশিদিন নেতৃত্বদানকারী মাশরাফি বিন মুর্তজা ও ক্রিকেট যেন হয়ে উঠেছিল সমার্থক। প্রায় দুই দশক জাতীয় দলের হয়ে খেলার 'রেকর্ড'ই-বা কয়জন গড়তে পেরেছেন?

কেবল বাংলাদেশের নয়, বৈশ্বিক রেকর্ডও বটে। আমরা গভীর গৌরবের সঙ্গে দেখছি, অধিনায়ক হিসেবে দলকে জিতিয়ে আনার ক্ষেত্রেও তিনি রয়েছেন বিশ্বের প্রথম সারিতে- ৫৬ দশমিক ৮ শতাংশ ম্যাচে বিজয়ী। আমরা মনে করি, মাশরাফি বিন মুর্তজার মূল কৃতিত্ব দলকে প্রেরণা জোগানো। তিনি যেভাবে দলের প্রায় প্রত্যেক খেলোয়াড়ের সঙ্গে একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারতেন, তা নিছক পেশাদারিত্বের মাপকাঠিতে ব্যাখ্যা করা কঠিন। তার নিজের সংগ্রামও কি প্রেরণাদায়ক নয়? বারবার চোট পেয়ে মাঠের বাইরে ছিটকে গেলেও বারবারই সংশপ্তকের মতো ঘুরে দাঁড়িয়েছেন এবং জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আমরা দেখেছি, ক্রিকেট দলের বাইরেও তিনি হয়ে উঠেছেন সাধারণ মানুষের প্রেরণা ও গৌরবের উৎস। রাজনীতিতে তার অভিষেকও ইতিবাচকভাবেই নিয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। তিনি যেভাবে সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে জড়িত করেছেন, যেভাবে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি যেতে পেরেছেন, তা রাজনীতিকদের জন্যও নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণাদায়ক। প্রসঙ্গক্রমে বলতে চাই, তিনি যে সময়ে ও যেভাবে দলের নেতৃত্ব থেকে অবসরের ঘোষণা দিলেন, তাও সময়োচিত ও পরিমিত। অস্বীকার করা যাবে না যে, তার এই সিদ্ধান্তে সর্বস্তরে বেদনার তিরতিরে প্রবাহ বয়ে গেছে। কিন্তু একই সঙ্গে তার এই সিদ্ধান্ত প্রশংসিতও হয়েছে।

খেলা থেকে একসময় সবাইকেই অবসর নিতে হয়; কিন্তু তিনি যেভাবে নেতৃত্ব থেকে সরে গেলেন, তা অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায় না। সতীর্থরা যে সম্মান ও ভালোবাসা দিয়ে তাকে অধিনায়কত্ব থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানিয়েছে, তা বিরল। অধিনায়কত্বের দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য দায়িত্ব থেকে অবসরের এই মুহূর্তে আমরা সমকাল পরিবারের পক্ষ থেকে মাশরাফি বিন মুর্তজাকে অভিনন্দন ও শুভকামনা জানাই। আমরা জানি, তিনি সামনের দিনগুলোতেও জাতীয় দলে খেলবেন। অধিনায়কত্বের গুরুদায়িত্ব তার কাঁধে তখন থাকবে না। খেলোয়াড় হিসেবে নির্ভার ও অভিজ্ঞ মাশরাফির নতুন রূপ দেখার জন্য আমরা নিশ্চয়ই অপেক্ষায় থাকব। কিন্তু তিনি যখন খেলোয়াড় হিসেবেও জাতীয় দলে থাকবেন না, তখনও তিনি আমাদের জাতীয় জীবনে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন।