বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় আনুষ্ঠানিক লড়াই শুরুর দিন তথা মহান স্বাধীনতা দিবস আমরা এ বছর এমন সময় পালন করছি যখন গোটা দেশ করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও বিস্তার রোধে লড়াই করছে। কেবল বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বই এখন এই সর্বব্যাপ্ত ভাইরাস সংক্রমণের শিকার। গোটা বিশ্বেই সৃষ্টি হয়েছে এক নজিরবিহীন যুদ্ধাবস্থা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথার্থই বলেছেন- '১৯৭১ সালে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা শত্রুর মোকাবিলা করে বিজয়ী হয়েছি। করোনাভাইরাস মোকাবিলাও একটা যুদ্ধ।'

আমরা জানি, করোনাভাইরাস মোকাবিলার স্বার্থেই এ বছর স্বাধীনতা দিবস ভিন্নভাবে উদযাপিত হচ্ছে। সব ধরনের জনসমাগম পরিহার করা হয়েছে, তেমনি পরিবর্তন আনা হয়েছে আনুষ্ঠানিকতায়। সমকালের পক্ষেও আমরা করোনাভাইরাসবিরোধী যুদ্ধে সাড়া দিয়ে বিশেষ সংখ্যা ও প্রকাশনাগুলোতে খানিকটা পরিবর্তন এনেছি। সমকালের পাঠক সংগঠন সুহৃদ সমাবেশের পক্ষে স্বাধীনতা দিবসের আনুষ্ঠানিকতার বদলে জনসাধারণের মধ্যে সুরক্ষা মুখোশ, জীবাণুনাশক ও পরিচ্ছন্নতা উপকরণ বিতরণ এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, মহান স্বাধীনতা দিবসের আনুষ্ঠানিকতার মর্মার্থ আসলে বাংলাদেশকে সুরক্ষিত ও সমৃদ্ধ রাখার প্রত্যয় শানিত করা। এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সমকাল তার পাঠক, সমাজ, দেশ ও জাতির প্রতি সেই প্রত্যয়ই পুনর্ব্যক্ত করছে।

মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভের মাধ্যমে আমরা সমকালের সব পাঠক, লেখক, শুভানুধ্যায়ীসহ বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষকে রক্তিম শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি আজকের এই যুদ্ধে সাধ্যমতো শামিল হওয়ার আহ্বান জানাই। একাত্তরের এই দিনের পর গোটা জাতি ঘর ছেড়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য। আজকের এই লড়াইয়ে আমাদের ঘরে ঘরে থাকতে হবে, অন্তত দুই সপ্তাহের জন্য। একাত্তরের মতোই বজ্রকঠিন শপথ নিয়ে যদি আমরা ঘরে আবদ্ধ থাকতে পারি, তাহলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মতোই ক্ষতিকর এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসকে আমরা নিশ্চয়ই পরাজিত করতে পারব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন- 'এ যুদ্ধে আপনার দায়িত্ব ঘরে থাকা। আমরা সকলের প্রচেষ্টায় এ যুদ্ধে জয়ী হবো।'

স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ঘোষণার এই দিনে আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে নাম জানা-না জানা শহীদদের আত্মত্যাগের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। আমরা মহান স্বাধীনতা দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যার নেতৃত্বে ও নির্দেশনায় বাঙালি জাতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল দেশ মাতৃকার মুক্তির জন্য। আমরা স্মরণ করি বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য সহকর্মী জাতীয় নেতাদের। একই সঙ্গে গত কয়েক সপ্তাহে যারা করোনাভাইরাসে প্রাণ হারিয়েছেন, আমরা তাদের স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানাই। যারা আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতেও সবাইকে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সবচেয়ে বড় অবদান আমরা রাখতে পারি ব্যক্তি, পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও বিস্তার রোধে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে। আমরা মনে করি, সেটাই হবে স্বাধীনতা যুদ্ধে লাখো শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সর্বোত্তম উপায়।

আমরা আত্মশ্নাঘার সঙ্গে স্বীকার করি- স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক দূর এগিয়েছে। একদা তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে যে দেশকে কেউ কেউ কটাক্ষ করত, সেই দেশই এখন বিশ্বের অনেককে পথ দেখাচ্ছে। আমরা ইতোমধ্যে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি, ঝেড়ে ফেলতে যাচ্ছি 'স্বল্পোন্নত' দেশের তকমা। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রমত্ত পদ্মার বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সক্ষমতার জয়গান গাইছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুপেয় পানি, স্যানিটেশন প্রভৃতি ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশ থেকে এগিয়ে রয়েছি আমরা। গোটা বিশ্বই যখন জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের সংকটে জেরবার, বাংলাদেশ তখন এই দুই প্রপঞ্চকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সফল হয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সামনে রেখে আমরা শিক্ষার হারে এগিয়েছি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি, স্বাস্থ্যসেবার সর্বোচ্চ সম্প্রসারণ করেছি, দারিদ্র্য হ্রাসে সাফল্য পেয়েছি, বেকারত্বের হার কমিয়ে এনেছি। করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবিলার মাধ্যমেও রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের সক্ষমতা প্রদর্শন ও প্রমাণ করতে পারি আমরা। সব পক্ষ আন্তরিক হলে, সবাই নিয়ম মেনে চললে তা কঠিন হবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস। আমরা এও বিশ্বাস করি- যে জাতি বুকের তাজা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য ছিনিয়ে আনতে পারে, সে জাতি ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা চালিয়ে করোনাভাইরাসমুক্ত বাংলাদেশও নিশ্চিত করতে পারবে।