করোনা মোকাবিলা

গুজবের গুবরে পোকা দূর করুন

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

--

গুজব কীভাবে সমাজের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে পারে কিংবা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটিয়ে থাকে, তার নজির এই বাংলাদেশেই নিকট অতীতে একাধিকবার দেখেছি আমরা। গুজব ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, রাজনৈতিক হট্টগোল সৃষ্টি সুদূর অতীত থেকেই ছিল। কিন্তু ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আপামর জনসাধারণের হাতে হাতে পৌঁছে যাওয়ায় তা যেন আক্ষরিক অর্থেই 'হাতের মোয়া' হয়েছে। আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছি, গোটা দেশ যখন করোনাভাইরাস মোকাবিলায় প্রাণান্ত পরিশ্রম করছে, তখন কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী এই পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে গুজবের গুবরে পোকা ছেড়ে দিচ্ছে যত্রতত্র। এ যেন বাংলা প্রবাদের সেই গুদামে আগুন লাগার সুযোগ নিয়ে আলু পোড়া খাওয়ার কিংবদন্তির মতো।

আমরা জানি, করোনাভাইরাস তার শক্তির চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে যদি মানুষের মনোবল ভেঙে যায়, যদি সমাজ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। দুর্ভাগ্যবশত, সাম্প্রতিক বিভিন্ন গুজবের মাধ্যমে সেটাই করা হচ্ছে। শনিবার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, এই ভাইরাসে আক্রান্ত ও তার জের ধরে মৃত মানুষের আজগুবি সংখ্যা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে দেওয়া রাষ্ট্রীয় নির্দেশনাও করা হচ্ছে বিকৃত। বাড়ি ভাড়া মওকুফ, সাধারণ ছুটি ও আগাম বেতন নিয়েও দেওয়া হচ্ছে মনগড়া 'তথ্য'। এই দুঃসময়ে যেখানে সবারই সঠিক তথ্য পাওয়া উচিত, সেখানে এসব গুজব পরিস্থিতির অবনতিই ঘটাচ্ছে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার এই ভাষ্য যথার্থ যে, গুজব করোনা মোকাবিলার লড়াইয়ে বাড়তি ময়দান তৈরি করেছে। আলোচ্য প্রতিবেদনেই দেখা যাচ্ছে, ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে এবং নজরদারিতে রয়েছে আরও অনেকে। আমরা মনে করি, যে কোনো মূল্যেই 'গুজবের ভাইরাস' নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। অস্বীকার করা যাবে না যে, অসচেতন নাগরিকরা অনেক ক্ষেত্রে অজান্তেই গুজবের ফাঁদে পা দেয় এবং বিনা বিবেচনায় ছড়িয়ে দেয়। এ ক্ষেত্রে পুলিশের পক্ষে গুজব ছড়ানো নাগরিকদের ধরে 'কাউন্সেলিং' করার ধারণা আমাদের কাছে যথার্থ মনে হয়েছে। যদি গুজবের নাটের গুরু না হয়, তাহলে তাদের জেল-জরিমানার চেয়ে বোঝাপড়ার ব্যবস্থা বেশি কার্যকর হতে পারে।

সংবাদমাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক কর্মসূচিও হতে পারে আরেকটি কার্যকর উপায়। এ ক্ষেত্রে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যদি যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়, তা হবে সোনায় সোহাগা। আমরা আশা করি, নাগরিকরা সচেতন হবেন। গুজব প্রতিরোধে প্রশাসনের পাশাপাশি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও এগিয়ে আসতে পারে। পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যেও ব্যক্তিগত উদ্যোগে গুজববিরোধী আলোচনা করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, এ ধরনের কার্যক্রম পরোক্ষভাবে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়েই অবদান রাখবে। এ প্রসঙ্গে আমরা আরেকবার মনে করিয়ে দিতে চাই, মূলধারার সংবাদমাধ্যমই গুজব প্রতিরোধে উত্তম হাতিয়ার। করোনাভাইরাসের কালে কিছু কিছু ভুঁইফোঁড় অনলাইনও যখন গুজবের স্রোতে গা ভাসাচ্ছে, তখন মুদ্রিত সংবাদপত্রের প্রয়োজনীয়তা আরেকবার প্রমাণ হয়। আমরা আশা করি, সরকার সংবাদপত্রের পাশে থাকবে এবং গুজবের গুবরে পোকা প্রতিরোধে সফল হবে।