বিশ্বব্যাংকের ঋণ

সুদমুক্ত হোক, সুদ মওকুফ হোক

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

--

করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের জন্য কমবেশি সাড়ে আটশ' কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করেছে- বৈশ্বিক অর্থকরী সংস্থার পক্ষে শনিবার প্রকাশিত এ সংক্রান্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিটি উৎসাহব্যাঞ্জক সন্দেহ নেই। বস্তুত এই দুঃসময়ে উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াবে, সেটাই প্রত্যাশিত। আমরা দেখেছি, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইতোমধ্যে জাতিসংঘসহ বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীরা এগিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। বিশ্বব্যাংকের পক্ষে এমন উদ্যোগ আরও জরুরি। আমরা জানি, চলতি অর্থবছরেই সংস্থাটির পক্ষে বাংলাদেশকে দুই বিলিয়ন সহজ শর্তের ঋণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে যা ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অঙ্ক।

আমাদের মনে আছে, চলতি মাসের প্রথম দিনও বিশ্বব্যাংক একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে যে, কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণ এবং মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও জীবনমান উন্নয়নে বাংলাদেশকে তিন হাজার কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হবে। বস্তুত স্বাধীনতার পর থেকেই বিশ্বব্যাংকের সম্পর্ক যেমন বহুমাত্রিক, তেমনই বৃহৎ অংশীদারিত্বের। সেই প্রেক্ষাপটে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সাড়ে আটশ' কোটি টাকা 'সামান্য' বিবেচিত হতে পারে। আমরা দেখেছি, রোববারই করোনাভাইরাসের অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলায় সরকার প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকার 'প্যাকেজ' ঘোষণা করেছে। আমাদের অর্থনীতির আকার, প্রবৃদ্ধির হার বিবেচনায় এই 'বৃহৎ' অঙ্ক অস্বাভাবিক নয়। আমরা এও জানি, করোনাভাইরাস পরিস্থিতি পার হয়ে গেলে সরকারের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনীতির গতি পুনরুদ্ধার। তখন আরও নানা খাতে আরও বড় অঙ্কে সহায়তা প্রয়োজন হবে। এদিকে, বিভিন্ন বৈদেশিক ঋণের সুদহারও জমবে। সেক্ষেত্রে এখন করোনা সহায়তা হিসেবে আমরা যদি প্রথাগত ঋণের পথে হাঁটি, তার ভার বহন সহজ হবে না।

বিশ্বব্যাংকের মতো উন্নয়ন সহযোগীদেরও বুঝতে হবে, ঋণ ও প্রদেয় সুদ করোনা-পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গতি শ্নথ করে দিতে পারে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা মনে করি, ঋণের বদলে বরং আর্থিক ও কারিগরি অনুদানের প্রতি জোর দিতে হবে। বিশ্বের আর্থিক বাস্তবতাও আমরা নিশ্চয়ই বুঝি। সেক্ষেত্রে ঋণ হলেও যদি সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া যায়, তাও কম বড় সহযোগিতা হবে না। অঙ্ক যাই হোক না কেন, সরকারের উচিত হবে অনুদান বা নিদেনপক্ষে সুদমুক্ত ঋণের ব্যাপারে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। একই সঙ্গে ইতোমধ্যে গৃহীত ঋণের সুদ মওকুফের ব্যাপারেও আলোচনা শুরু করা দরকার এখনই। গত এক দশকের টানা প্রবৃদ্ধির সুফল হিসেবে আমরা এখন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারছি, সন্দেহ নেই। নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণ কেবল নয়, স্বল্পোন্নত তালিকা থেকেও 'স্নাতক' হতে যাচ্ছি, অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু আমরা যদি ঋণ ও সুদের চক্রে আটকে যাই, করোনা-পরবর্তী অর্থনীতিতে তার প্রভাব নিঃসন্দেহে নেতিবাচক হবে। এই বাস্তবতা বিশ্বব্যাংক ছাড়াও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের বুঝতেই হবে।