ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪

রাজনীতি

আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আশা ও নিরাশা

আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আশা ও নিরাশা

মইনুল ইসলাম

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০

২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনের আগের রাত নিয়ে বিতর্কে দেশের বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি বিশ্বের অনেক দেশের কূটনীতিকরাও জড়িত হয়েছেন। সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করত বলে সাধারণ ধারণা থাকলেও, ভোটাররা সেই সুযোগ পাননি। জনগণের অনেকের মধ্যে সেই নির্বাচন নিয়ে দৃঢ় সংশয় গেড়ে বসেছে। এই ব্যাপারটা আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় চিড় ধরিয়েছে; ভাবমূর্তিতে ধস নামিয়েছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনেও পুরোনো নজির ফিরে আসবে। কিন্তু আর কি কোনো পথ নেই?

ঠিক যে, এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘ সজাগ দৃষ্টি নিয়ে আছে। নির্বাচনে অনিয়মের আলামত দেখলে তাদের পক্ষ থেকে নির্বাচনের আগেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানা নিষেধাজ্ঞা চাপানোর আলামত রয়েছে। আর তা হবে আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ উভয়ের জন্যই বিপর্যয়কর। অথচ আওয়ামী লীগের গত পৌনে ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অত্যন্ত প্রশংসনীয় গতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনী অনিয়ম, দুর্নীতি, পুঁজি লুণ্ঠন ও পুঁজি পাচারের অভিযোগ সেসব অর্জনকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে।

জনগণ কি বিবেচনায় নেবে?

তাহলে কি গত পৌনে ১৫ বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যে বিশ্বের কাছে উন্নয়নের ‘রোল মডেল’ হয়ে উঠেছে, সেটা কি জনগণ বিবেচনায় নেবে না? নিচের বিষয়গুলো কি গুরুত্ব দাবি করে না?

নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণ

২০১৫ সালে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের ‘নিম্ন আয়ের দেশ’-এর তালিকা থেকে ‘নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ’-এ উন্নীত হয়েছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কাউন্সিল (ইউএনইকোসক) কর্তৃক নির্ধারিত ‘লিস্ট ডেভেলপড কান্ট্রি’ (এলডিসি) থেকে ‘ডেভেলপিং কান্ট্রি’তে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে। ২০২১ সালে ব্যাপারটি জাতিসংঘের সম্মতি পেয়ে গেছে। এর ফলে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ‘ডেভেলপিং কান্ট্রি’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার কথা। কিন্তু করোনা মহামারির শিকার হওয়ায় বাংলাদেশের অনুরোধে সাড়া দিয়ে জাতিসংঘ এ উত্তরণকে দুই বছর পিছিয়ে দিতে রাজি হয়েছে। ২০২৬ সাল পর্যন্ত এলডিসির সুবিধাগুলো বজায় রাখার জন্যই বাংলাদেশ এ অনুরোধ করে।

মেগা প্রকল্পের সাফল্য

বাংলাদেশে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত যেসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে কিংবা বাস্তবায়নাধীন, তার তালিকা বিপুল। যেমন– পদ্মা বহুমুখী সেতু, ঢাকা মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, মাতারবাড়ী ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রকল্প, পায়রা বন্দর, পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রকল্প, রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প, বাঁশখালী বিদ্যুৎ প্রকল্প, ঢাকা বিআরটি প্রকল্প, ঢাকা-আশুলিয়া উড়াল সড়ক, ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনের মহাসড়ক, মিরসরাই- ফেনীতে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরী, কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা-পায়রা-যশোর রেলপথ, যমুনা রেল সেতু, পতেঙ্গা নিউমুরিং টার্মিনাল, আখাউড়া-লাকসাম ডাবল লাইন রেলপথ এবং চট্টগ্রাম-দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ। বাংলাদেশের স্বাধীনতাউত্তর ১৯৭২-২০০৮ সালের ৩৭ বছরে এর তিন ভাগের এক ভাগ মেগা প্রকল্পও কি বাস্তবায়িত হয়েছে?

নিজস্ব অর্থায়নের গর্ব

বাংলাদেশে পদ্মা সেতু হচ্ছে একমাত্র মেগা প্রকল্প, যেটা সম্পূর্ণভাবে নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে। প্রায় পৌনে ৪ বিলিয়ন ডলারের এ প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশ দেখিয়ে দিয়েছে– ‘স্বল্পোন্নত দেশ’ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের ‘ব্ল্যাকমেইলিং’ রুখে দাঁড়ানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতির ইমেজ অর্জন করেছে। যে দেশটিকে ১৯৭২ সালে ‘আন্তর্জাতিক বাস্কেট কেস’ অভিহিত করা হয়েছিল, সে দেশটি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অবস্থানে পৌঁছে গেছে– এ বার্তাটি বিশ্বকে পৌঁছে দিয়েছে পদ্মা সেতু।

বিদ্যুতে সক্ষমতা

বাংলাদেশের শতভাগ জনগণ ২০২১ সালে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসে গেছে। ২০০১-০৬ মেয়াদের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ৪ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতাকে তাদের পাঁচ বছরের শাসনামল শেষে আর এক মেগাওয়াটও বাড়াতে পারেনি। বরং স্বাভাবিকভাবে বিভিন্ন প্লান্টের উৎপাদন ক্ষমতা কমে গিয়েছিল। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে যখন মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল, তখন জনগণের মাত্র ৪৩ শতাংশ ছিল বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায়। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের ১৪ বছরে প্রধান অগ্রাধিকার দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনেক প্লান্ট স্থাপন এবং সঞ্চালন লাইন প্রসারের মাধ্যমে বর্তমান সরকার এই বৈপ্লবিক সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে।


চলমান কৃষিবিপ্লব

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর কৃষি খাতে চমকপ্রদ সাফল্যের ধারা সূচিত হয়। ২০১১ সালে বাংলাদেশ মোটা ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। ১৯৭২ সালে দেড় কোটি টন ধান লাগত আমাদের, অথচ উৎপাদন করতে পারতাম মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ টন। ২০২২ সালে এ দেশে ৩ কোটি ৯০ লাখ টন ধান উৎপাদিত হয়েছে। ১৭ কোটির বেশি মানুষের খাদ্যশস্য জোগান দিয়েও এখন প্রায় প্রতি বছর মোটা ধান উদ্বৃত্ত হচ্ছে আমাদের। ধান, গম ও ভুট্টা মিলে ২০২২ সালে খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল ৪ কোটি ৬০ লাখ টন (অবশ্য প্রতি বছর আমরা ৬০/৬৫ লাখ টন গম আমদানি করি)। আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে দ্বিতীয়; তরিতরকারি উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ। হাঁস-মুরগির ডিম ও মাংস উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। দুধ উৎপাদনে দেশে এখনও ঘাটতি রয়ে গেলেও গরু-মহিষের মাংস উৎপাদনে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণতার দোরগোড়ায়। বলা চলে, বাংলাদেশে একটি কৃষিবিপ্লব চলমান।

কিন্তু মুখ কালো হয়ে যায় যেখানে

উল্লিখিত সফলতাগুলোর বিপরীতে দুঃখজনকভাবে ২০১৪ সাল থেকে ৯ বছর ধরে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তানের পর সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তকমা অর্জন করে চলেছে। সর্বশেষ বিশ্ব র‍্যাংকিং অনুযায়ী বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ১২ নম্বর দেশ হিসেবেই চিহ্নিত। জনগণের মনে বিশ্বাস গেড়ে বসেছে– দুর্নীতির ব্যাপকতায় বর্তমান সরকারের আমল বিএনপি ও জাতীয় পার্টির আমলকে ছাড়িয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী অধিকাংশের গত পৌনে ১৫ বছরে ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হওয়ার ব্যাপারটা তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের কাছে পুরোপুরি দৃশ্যমান। আওয়ামী লীগ নেতাদের আত্মীয়স্বজন এবং উদার পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী ও আমলাদের একাংশ যেন ‘ক্ষমতার আলাদিনের চেরাগ’ পেয়ে গেছেন। এ রকম অনেকের কোটিপতির কাতারে উত্তীর্ণ হওয়ার ব্যাপারটা লুকানোর কোনো উপায় আছে কি? দুর্নীতির অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে বিদেশে পুঁজি পাচার এখন দেশের অর্থনীতির এক নম্বর সমস্যায় পরিণত হয়েছে। টরন্টোর বেগমপাড়া কিংবা মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোম এখন দেশে আলোচনার কেন্দ্রে অবস্থান করছে।


এর বিপরীতে বিএনপি-জামায়াত জোটের ২০০১-০৬ মেয়াদের জঙ্গিবাদী ও দুর্নীতিবাজ অপশাসনের দুষ্কৃতিগুলোকে জনগণ হয়তো অনেকখানি ভুলে গেছে। কিন্তু জামাআ’তুল মুজাহিদীনের বাংলা ভাই, ভারতের আসামের জঙ্গি সংগঠন উলফার জন্য আনীত ২০০৪ সালের ৪ এপ্রিলে ধরা পড়া ১০ ট্রাক অস্ত্র, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের বর্বর গ্রেনেড হামলা, ২০০৫ সালের আগস্টে দেশের ৬৩টি স্থানে ৫০০ বোমা বিস্ফোরণ, কিবরিয়া হত্যা, আহ্সানউল্লাহ্ মাস্টার হত্যা– এগুলো ভোলা যায়? ‘হাওয়া ভবন’-এর সমান্তরাল সরকারের দৌরাত্ম্য ও দুর্নীতির তাণ্ডবকে জনগণ কি আবার ফিরিয়ে আনতে চায়?

সে জন্যই আমার মনে হয়, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অর্জিত অর্থনৈতিক অগ্রগতি, মাথাপিছু জিডিপির প্রসার এবং মেগা প্রকল্পগুলোর সুফল বৃথা যাবে না। এর সুফল আগামী নির্বাচনে ঘরে তুলতে পারার সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। ড. মইনুল ইসলাম: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি; অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×