ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

ভারতের রাজনীতিতে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের প্রভাব

আন্তর্জাতিক

ভারতের রাজনীতিতে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের প্রভাব

শোয়াইব দানিয়েল

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৩ | ০৬:৩৩

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের সঙ্গে ভারতের যুক্ত হওয়ার অন্যতম মাধ্যম হলো মিডিয়া। এর শুরু হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যেখানে হিন্দুত্ববাদের সমর্থকরা দলে দলে ইসরায়েলের সমর্থনে বার্তা পোস্ট করে। ইয়েল ইউনিভার্সিটির একজন শিক্ষাবিদ মন্তব্য করেছেন, ‘এটি বিশ্বায়নের সবচেয়ে অর্থহীন ফলগুলোর মধ্যে একটি যে প্রতিবার নেতানিয়াহু যখন টুইট করেন, বেশির ভাগ হিব্রু ভাষার মন্তব্যে থাকে তাঁর পদত্যাগের আহ্বান, কিন্তু তাঁর সমর্থনে দেওয়া মন্তব্যের বেশির ভাগের ভাষা হিন্দি।’

এক পর্যায়ে ইসরায়েলের সমর্থনে বার্তা পাঠানোর প্রক্রিয়াটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। কারণ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভারতীয় হিন্দি ও ইংরেজি নিউজ চ্যানেল সংবাদ কভার করার জন্য ইসরায়েলে সাংবাদিকদের পাঠিয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু ব্যবহারকারী বেশ তিক্ত মন্তব্য করেছেন– ভারতীয় মূলধারার টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে মণিপুর রাজ্যের সহিংসতা যতটা জায়গা পেয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি জায়গা পাচ্ছে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত। গত সপ্তাহে মোদি সরকার এবং ভারতীয় জনতা পার্টির সমর্থক চ্যানেলগুলো ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত প্রায় বিরতিহীনভাবে প্রচার করেছে। ভারতীয় টেলিভিশন মিডিয়ার বড় অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের বদান্যতার ওপর নির্ভর করে এবং বেশির ভাগ সময় এরা সরকারের সমর্থনসূচক অনুষ্ঠান প্রচার করে। এ প্রেক্ষাপটে বলা যায়, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত বিজেপির জন্য মোক্ষম এক সময়ে ঘটেছে। এ ঘটনার ঠিক আগে বিরোধীরা সম্ভবত এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো বিহারে বর্ণশুমারির তথ্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে একটি এজেন্ডা সেট করেছিল। যার ফলে ক্ষমতা দখলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিন্দি অঞ্চলে বিজেপির হিন্দুত্ব প্ল্যাটফর্ম একটি আদর্শিক ও নির্বাচনী চ্যালেঞ্জে পড়ে যায়। কিন্তু এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে পাঁচ হাজার কিলোমিটার দূরের এক সংঘাতের কারণে সংবাদমাধ্যম থেকে বর্ণশুমারির খবর উধাও হয়ে গেছে।

বিজেপির জন্য আরও ভালো খবর হলো, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত দলটিকে তার হিন্দুত্ব এজেন্ডা এবং জাতীয় নিরাপত্তা জুজুকে চাঙ্গা করার সুযোগ করে দিয়েছে। যেমন– ফিলিস্তিনি জঙ্গিগোষ্ঠী হামাসের আক্রমণের ঠিক এক দিন পর, উদাহরণস্বরূপ, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রগতিশীল জোটের সময় বিজেপি ইসলামপন্থি সন্ত্রাসী হামলা সম্পর্কে একটি ভিডিও টুইট করেছে। তার পর থেকে বিজেপি বিষয়টির চর্চা চালিয়ে যাচ্ছে। উত্তর প্রদেশের বিজেপি সরকার শনিবার ফিলিস্তিনকে সমর্থন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টের কারণে একজন মুসলিম ধর্মগুরুকে গ্রেপ্তার করেছে। এর আগে ফিলিস্তিনের সমর্থনে মিছিল করার কারণে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। ডেকান হেরাল্ডের খবর অনুসারে, উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কার্যত পুলিশকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন, রাজ্যের যে কোনো বাসিন্দা ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে মামলা দিতে হবে। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতে বিজেপির এ তৎপরতার প্রভাব কংগ্রেস নেতাদের ওপরেও বেশ ভালোভাবে পড়েছে বলা যায়। ১০ অক্টোবর এ বিষয়ে দেওয়া কংগ্রেস কার্যনির্বাহী কমিটি বা সিডব্লিউসির এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সিডব্লিউসি মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, সেখানে গত দু’দিনে এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হওয়ায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।’ সেখানে আরও বলা হয়, ‘সিডব্লিউসি ফিলিস্তিনি জনগণের ভূমি, স্ব-শাসন এবং মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে বসবাসের অধিকারের প্রতি বরাবরের মতোই তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে।’

তবে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস রিপোর্ট করেছে, ওই প্রস্তাবে হামাসের হামলার কথা উল্লেখ না করায় কংগ্রেসের মধ্যে অস্বস্তি ছিল। দলটির প্রধান মল্লিকার্জুন খাড়গে বর্ণশুমারি ইস্যুটি আলোচনায় রাখার জন্য ওই সংঘাতের কথা পুরোই চেপে যেতে চেয়েছিলেন; বর্ণশুমারি মাত্র কয়েক দিন আগেও দলটিকে একটি শক্তিশালী গতিতে রেখেছিল। প্রত্যাশিতভাবে বিজেপি দ্রুত গৃহীত তার প্রস্তাবে ‘সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা’ করতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য কংগ্রেসকে আক্রমণ করে।

ভারতে ফিলিস্তিন বিষয়ে ঐতিহ্যগতভাবে যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, তা এখন আর নেই এবং মোদির বিজেপি এ পরিবর্তন ধারণ করে। তবে আশির দশকে এ পরিবর্তনের সূচনা করেন রাজীব গান্ধী, যদিও তা করা হয় গোপনে এবং কোনো প্রকার ঢাকঢোল না পিটিয়ে। এ ক্ষেত্রে মোদি কোনো রাখঢাক করেননি। ফলে জনপরিসরে ইসরায়েলের প্রতি ভারতের সমর্থন ফিলিস্তিনিদের আকাঙ্ক্ষার প্রতি নয়াদিল্লির সরকারি সমর্থনকে ছাপিয়ে গেছে।

রাজীব গান্ধী মুসলিম নেতৃত্বের বিশিষ্ট অংশগুলোকে চটাতে চাননি। অন্যদিকে বিজেপি এ ইস্যুতে মুসলিম ক্ষোভ থেকে উপকৃত হয়। কারণ এটি হিন্দুত্ববাদীদের মনে জোশ এনে দেয়। তদুপরি বিজেপির মুসলিম ভোট খুব কম, তাই তার হারানোর কিছু নেই। বিজেপির এ বাগাড়ম্বরের পালে হাওয়া লাগার আরেক কারণ হলো, ইতোমধ্যে ইসরায়েল ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবে বিশ্বপরিসরে জায়গা করে নিয়েছে। এমনকি সৌদি আরবের মতো আরব দেশগুলোও ইহুদি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাইছে। ভারতের ভোটারদের ওপর ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের প্রভাব বাস্তবে কতটুকু হবে, তা স্পষ্ট নয়। যে হিন্দু ভোটাররা ইসরায়েলের প্রতি বিজেপির সমর্থন দেখে লাফাচ্ছেন, তারা আগে থেকেই এ দলকে সমর্থন করেন না– এমনটা বলা যায় না। অন্যদিকে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যতই আলোচিত হোক, এমন সম্ভাবনাই বেশি যে বেশির ভাগ ভারতীয় মুসলমান বহুদূরের এক সংঘাত দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে বরং সরাসরি রুটি-রুজি বা বিজেপি শাসনে হারানো তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা ভেবেই ভোট দেবেন। শোয়াইব দানিয়েল: স্ক্রল ডটইনের সাংবাদিক; স্ক্রল ডটইন থেকে ভাষান্তর করেছেন সাইফুর রহমান তপন

আরও পড়ুন

×