ঢাকা বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

তিস্তার আক্রোশ এবং আমাদের করণীয়

দুর্যোগ

তিস্তার আক্রোশ এবং আমাদের করণীয়

মো. ফখরুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৩ | ০৭:৪৫

পাহাড়ি খরস্রোতা নদী তিস্তা গত ৪ অক্টোবর হঠাৎ রুদ্র মূর্তি ধারণ করে ধ্বংসলীলা সাধন করেছে। সিকিমের চুংথাং ড্যাম থেকে বাংলাদেশের ব্রহ্মপুত্র নদে মিলিত হওয়ার মোহনা পর্যন্ত দুই তীরের মানুষ, ঘরবাড়ি, ফসল তছনছ করে অসীম ক্ষমতা দেখিয়েছে। মনে হয়, বহুকাল ধরে তিস্তার এই আক্রোশ অভ্যন্তরে পুঞ্জীভূত ছিল। সেদিন সুযোগ বুঝে আক্রোশ ঝেড়েছে।

পূর্ব হিমালয়ের পাদদেশে হিমবাহের বরফ গলা পৌহনরি, কাংসি, কাংচুং প্রভৃতি লেকের পানিতে তিস্তার উৎপত্তি। এর সঙ্গে উত্তর সিকিমের ছোট ছোট ঝরনা, লাচিন উপত্যকার তিনটি নদী (চুম্বু চু, চুম্ব চো, ত্রিস্রোতা) একসঙ্গে মিলিত হয়েছে। সিকিমের পর্বতময় এলাকায় সিভোক রেলওয়ে টানেল পর্যন্ত প্রবাহিত হয়ে পরে দার্জিলিং রিজের ছোট ছোট পাহাড় ও সমভূমির ওপর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলা পর্যন্ত প্রায় ১৬০ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়েছে তিস্তা।

বাংলাদেশের উত্তরে লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম ও নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষে বাংলাদেশে প্রবেশ করে কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলার কামারজানি মৌজায় ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিশেছে তিস্তা। বাংলাদেশে এর ক্যাচমেন্ট এলাকা ১৭৭ কিলোমিটার। বৃহত্তর রংপুর জেলায় তিস্তার শাখা নদীর মধ্যে রয়েছে ঘাঘট, বুড়ি তিস্তা, রত্নাই, সানিয়াজান, সতী তিস্তা, কাটাখালী প্রভৃতি। কিন্তু উজানে ব্যারাজ তৈরি হওয়ায় বর্ষাকাল ছাড়া এসব শাখা নদী শুষ্ক থাকে।

পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবায় নির্মিত ব্যারাজ থেকে পানির সামান্য অংশ বাংলাদেশের দিকে ছেড়ে দেওয়া হয়ে থাকে, যাতে বাংলাদেশের তিস্তা নদী একবারেই বিলীন হয়ে না যায়। তিস্তার পানির এই অংশ বর্ষাকালে বেশি আসে, যা বিপৎসীমার অনেক ওপরে থাকে। কারণ অতিরিক্ত পানির চাপে যেন উজানের গজলডোবায় তিস্তা ব্যারাজ ভেঙে না পড়ে অথবা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে কোনো কোনো সময় তিস্তার পানিপ্রবাহের পরিমাণ উজানে ১১ হাজার কিউসেক থাকলেও বাংলাদেশের ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদী বাঁচিয়ে রাখার মতো প্রবাহ থাকে না। এক গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে, শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের ডালিয়া পয়েন্টে কমপক্ষে সাড়ে চার হাজার কিউসেক পানিপ্রবাহ থাকলে এর অধীনে কৃষি প্রকল্পে সেচকাজ সচল রাখা সম্ভব। কিন্তু খরার সময় কোনো কোনো দিন ডালিয়া পয়েন্টে সর্বনিম্ন মাত্র ১৭৬ কিউসেক পানি পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে, যা দিয়ে সেচ ব্যবস্থা চালানো অসম্ভব। অর্থাৎ সীমান্তের ওপারে তিস্তায় একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের তিস্তা ক্যাচমেন্ট এলাকায় ভয়াবহ পানিশূন্যতা হয় ও পরিবেশের বিপর্যয় ঘটে। সম্প্রতি সিকিমের চুংথাম বাঁধ ভেঙে আকস্মিক বন্যা ও ঢলে তিস্তার দুই তীরে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। এই বিপর্যয়ের ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে কিছু বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা যায়।

সিকিম থেকে জাতীয় সড়ক ধরে বাসে চলার পথে ৪১১ কিলোমিটার তিস্তা নদীতে কিছুক্ষণ পরপর বাঁধ চোখে পড়ে। প্রাকৃতিকভাবে নদীর পানি আটকানোর ফলে নদীর চেহারায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। ভারতে ২০০৪ সালে তিস্তাকে কেন্দ্র করে সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গে ৪৭টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তার মাত্র ৯টি চালু হয়েছে এবং ১৫টির কাজ চলমান।

চুংথাম বাঁধের উজানে হিমবাহ গলা পানির ব্যাপকতা নিয়ে সতর্কবার্তা যথেষ্ট ছিল না। এর সঙ্গে টানা মেঘভাঙা (ক্লাউড বার্স্ট) বৃষ্টির ফলে অতিরিক্ত পানি জমে লোনাক লেকের পানি বেড়ে উপচে গেছে। ড্যাম ফেটে ভেঙে গেছে সেই পানির চাপে। এর সঙ্গে চারটি ভূমিকম্প যুক্ত হয়েছে। সিকিমের চুংথাং লেকের দেয়াল ফেটে যাওয়ার মূল কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে, ঘটনার দু’দিন আগে এই এলাকায় পরপর ঘটা চারটি ভূমিকম্প। ৩ অক্টোবর রাতে নেপালে এক ঘণ্টায় চারবার ভূমিকম্প হয়েছে। রিখটার স্কেলে এর একটি ৪.৪, একটি ৬.২, আরেকটি ৩.৮ মাত্রার; যা হিমালয়ের নিম্নাংশে শিলং ও বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে অনুভূত হয়েছিল। এ ছাড়া ২ অক্টোবর সন্ধ্যায় ঢাকা ও আশপাশ এলাকায় ৫.৩ মাত্রার ভূমিকম্পের সময় সারাদেশ কেঁপে উঠেছিল, যার উৎপত্তিস্থল ছিল সিকিমের কাছে শিলংয়ে।

এ ছাড়া ব্যাপকভাবে পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি, উঁচু ভবন, হোটেল নির্মাণ, পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ ইত্যাদির জন্য প্রাকৃতিক মাটি ও গাছপালার বিনাশ করা হয়েছে। বড় বড় নির্মাণকাজের জন্য তিস্তা নদীকে উভয় দিকে কেটে, চিরে, আটকে, ক্ষতবিক্ষত করে ফেলা হয়েছে। মাটি ড্রেজিং ও বালু উত্তোলন করা হয়েছে। রেলপথ বসানোর কাজে টানেল তৈরির জন্য পাহাড়ের ভেতর দিয়ে দৈত্যাকার মেশিন দিয়ে ড্রিল করা হয়েছে, যা যোশী মঠের মতো কৃত্রিম ভূমিকম্পের সৃষ্টি করেছিল বলে মনে করা হচ্ছে। সিকিমের বিপর্যয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে মানুষের ওপর পাহাড়ি খরস্রোতা নদীর আক্রোশ কেমন হতে পারে। প্রকৃতি যেন মানুষের কারণে মানুষের প্রতি বিরূপ হয়ে প্রতিশোধ নিতে এগিয়ে আসতে না পারে, সে জন্য নতুন করে ভাবতে হবে। বনখেকো, নদীখেকোদেরও সবার জন্য ভাবতে হবে। প্রাকৃতিক সম্পদের বেলায় ‘একাই নেব একাই খাব’ নীতি পরিহার করতে হবে। প্রকৃতির প্রতিশোধের আগুন এখন মানুষের কল্পনার বাইরে পৌঁছে গেছে। এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতা এড়াতে মানুষকে আরও বৈজ্ঞানিক তথ্যনির্ভর আগাম সতর্কতা নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। মানুষ প্রকৃতিকে সংরক্ষণের চেষ্টা না করে ক্রমাগত ধ্বংস করতে থাকলে প্রকৃতি নিরুপায় হয়ে নিজেই একদিন ক্ষমতা দেখিয়ে প্রতিশোধ নিতে এগিয়ে আসবে– তিস্তার সাম্প্রতিক বিপর্যয় সেটারই ইঙ্গিত বহন করছে। মো. ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের প্রাক্তন ডিন fakrul@ru.ac.bd

আরও পড়ুন

×