ঢাকা বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

সংসদ সদস্য যখন অপহরণকারী

সংসদ সদস্য যখন অপহরণকারী

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৩ | ০৭:৪৭

নানা নেতিবাচক পরিবর্তন সত্ত্বেও এই দেশে শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা এখনও বহুলাংশে অক্ষুণ্ন। প্রধান শিক্ষক কিংবা অধ্যক্ষের ক্ষেত্রে উহার সহিত সামাজিক প্রভাব ও ক্ষমতাও যুক্ত হয়। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্মুখে শিক্ষকের মর্যাদা কিংবা প্রভাব কতখানি তুচ্ছ হইয়া উঠিতে পারে, প্রায়শ তাহার প্রমাণ পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু রাজশাহীর পুঠিয়ায় একজন অধ্যক্ষকে সংসদ সদস্য স্বয়ং সন্ত্রাসী কায়দায় তুলিয়া লইবার হুমকি দিয়াছেন এবং পরদিন তাঁহার ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী পাঠাইয়া উহা কার্যকর করিয়াছেন, তাহা তুলনারহিত। বিষয়টি নিছক শিক্ষকের মর্যাদার প্রশ্নে সীমিত থাকিতে পারে না। পুঠিয়ার বিড়ালদহ সৈয়দ করম আলী ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমানকে সোমবার প্রকাশ্য দিবালোকে শিক্ষায়তন হইতে উঠাইয়া লইয়া, প্রহার করাইয়া, তিন ঘণ্টা আটকাইয়া রাখিয়া সংসদ সদস্য ডা. মনসুর রহমান ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত করিয়াছেন। তিনি একজন সংসদ সদস্য বিধায় এই অপরাধের রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নহে।


রাজশাহীর পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট যদিও ‘অভিযোগ পাইলে ব্যবস্থা লইব’ বলিয়া দৃশ্যত গা বাঁচাইতে চাহিয়াছেন, উহা খোঁড়া অজুহাত ব্যতীত কিছুই নহে। যেইখানে অধ্যক্ষকে তুলিয়া লইবার পর ছাত্রছাত্রী সড়ক অবরোধ করিয়া বিক্ষোভ প্রদর্শন করিয়াছে; পুলিশ অধ্যক্ষকে সংসদ সদস্যের বাড়ি হইতে উদ্ধার করিয়াছে; অধ্যক্ষও স্বয়ং সংবাদমাধ্যমের নিকট বলিয়াছেন, তাঁহাকে অপরহণ ও প্রহার করা হইয়াছে; সেইখানে অভিযোগ না পাইবার আর কী আছে? বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সংসদ সদস্য যেইখানে তাঁহার নির্বাচনী এলাকার কার্যত দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, সেইখানে কে যাইবে পুলিশের নিকট অভিযোগ করিতে? আর গেলেও ‘ক্ষমতাসীন’ সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে থানার অভিযোগ গ্রহণ করিবার নিশ্চয়তা যে নাই– আলোচ্য ঘটনায় পুলিশের ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ অবস্থানই তাহার প্রমাণ। আমরা মনে করি, আইনের শাসনের স্বার্থেই অঘটনটিকে আইনের আওতায় আনিতে হইবে।

পরিস্থিতি বিবেচনা করিয়াই হয়তো আক্রান্ত অধ্যক্ষ এই সম্পাদকীয় স্তম্ভ লিখিবার সময় পর্যন্ত মামলা করিবার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত। এই ক্ষেত্রে পুলিশই বাদী হইয়া মামলা করিতে পারে। একই সঙ্গে অধ্যক্ষ ও তাঁহার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করিতে হইবে বৈ কি। পুঠিয়ার শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকবৃন্দেরও উচিত হইবে অধ্যক্ষের পার্শ্বে দাঁড়াইয়া সংসদ সদস্যের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সুবিচারের দাবি জোরদার করা। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমসূত্রে জানা যাইতেছে, মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটিতে পছন্দের সভাপতি না পাইয়াই অধ্যক্ষের উপর রুষ্ট হইয়াছিলেন সংসদ সদস্য। এই ঘটনা জানায় যে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনা কমিটির নামে কী ঘটে। দীর্ঘ মেয়াদে এই বিষয়েও নজর দিতে হইবে। কিন্তু সকলের পূর্বে জরুরি, সংসদ সদস্যের অপরাধের বিচার। এইরূপ নেতা বা সংসদ সদস্য দল ও সরকারের জন্য বোঝামাত্র; যত দ্রুত ঝাড়িয়া ফেলা যায়, ততই মঙ্গল।

আরও পড়ুন

×