ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

কী আফসোস! হাবিব ভাই!

শ্রদ্ধাঞ্জলি

কী আফসোস! হাবিব ভাই!

ফারুক ওয়াসিফ

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০

ফরাসি কবি বোদলেয়ার লিখেছিলেন, আধুনিক সময়ে প্রতিদিনই আমরা কোনো না কোনো শোকযাত্রায় শামিল। কথাটা এখন যেন আক্ষরিকভাবেই সত্য। কিশোর বয়সে যিনি পদ্মা পাড়ি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে শামিল হয়েছিলেন সাম্যবাদী আন্দোলনে, এরশাদের দশকে ছিলেন রাজপথে, সেই তিনি জীবনের সত্তর বছরে এসে হৃদরোগের ফাঁড়া পেরুতে পারলেন না। কী আফসোস কী আফসোস হাবিবুর রহমান হাবিব ভাই! রাষ্ট্রচিন্তা জার্নাল নামে ত্রৈমাসিক প্রবন্ধ পত্রিকা সম্পাদনায় ব্যস্ত ছিলেন গত কয়েক বছর।

মনে আছে দু’বার দেখা করার কথা। দু’বারই পরামর্শ চেয়েছেন, লেখা চেয়েছেন। দু’বারই আমার আগে এসে উপস্থিত হয়েছেন সাক্ষাতের জায়গায়। একবার দেখি, সমকাল অফিসের সোফার একপাশে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন হাবিব ভাই। আমি সম্ভবত বাইরে ছিলাম। দুপুরের রোদে পুড়ে তিনি ঠিকঠাক এসেছেন এই বৃদ্ধ দেহে। মনের জোরে তিনি সব পারতেন। মৃত্যুর আগের রাতেও হাসপাতালের বেডে শুয়ে রাত জেগে রাষ্ট্রচিন্তা পত্রিকার প্রুফ দেখছিলেন। যাতে ঠিক সময়ে পত্রিকাটা পাঠকের হাতে দেওয়া যায়। ভাবা যায়, কতটা নিষ্ঠা!

আসলে মৃত্যুর আগে আমরা বুঝতে পারি না কারও দাম। বুঝতে পারি না বলে, যাঁর যা প্রাপ্য তেমন মঞ্চ, তেমন আসন তাঁকে দেওয়া হয় না। হাবিব ভাই তেমন একজন। যারা বাইরের রংজ্বলা চেহারা ও অমায়িকতার আড়াল ভেদ করে তাঁর সঙ্গে মিশেছেন, তারা বোঝেন এমন মানুষ এই বিকিকিনির যুগে, এই স্বার্থপরতার পরিবেশে কতটা বিরল। তরুণ সংগঠক ও লেখক সারোয়ার তুষারের কথাটা সত্যি, ‘হাবিব ভাই, আমার অক্সিজেন, অটল ছিলেন বলে যাঁর অস্তিত্ব আলাদাভাবে টের পাওয়া যেত না, এখন তাঁর অভাবে জানি না দিনগুলো কীভাবে কাটবে!’ বাংলাদেশে কেন জানি জীবন জিয়ে না। যারা অদম্য মানুষ, কাজের মানুষ, মানুষের জন্য কাজ করেন; তাদের বাঁচানো যাচ্ছে না। কি তরুণ কি প্রবীণ– একে একে নিভছে দেউটি।

অবসাদ মানুষের আয়ু কেড়ে নেয়, উদ্যম কেড়ে নেয়, প্রাণশক্তি শুষে নেয়। জীবনের লতাটি শুকিয়ে যায়। এক দশক ধরে দেখছি এক গভীর ডিপ্রেশন, তীব্র অবসাদ কুরে কুরে খাচ্ছে অনেকের আত্মাকে। কত তরুণ মরে গেল অকালে, কতজন আত্মহত্যা করল, বুকের ইঞ্জিন ধুঁকে ধুঁকে চলতে চলতে হারিয়ে গেলেন অনেকে। শুধু একা বাঁচা যায় না। যখন দেশ খারাপ থাকে, গভীর হতাশা চোরাবালির মতো চেপে আসে চারদিক থেকে, যখন ভবিষ্যৎ থাকে অনিশ্চিত, তখন অনুভূতিশীল মানুষ, দায়িত্বশীল মানুষকে অবসাদে ধরে। যখন পথের ওপর বিরাট বাধাটা সরানো কঠিন মনে হয়, তখন তারা দ্বিগুণ জেদ নিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাতে করে হয়তো আরও দ্রুত আয়ুক্ষয় হয়।

তারপর একদিন একটা খবর আসে। বুকের মধ্যে একটা ধাক্কা লাগে। মানুষটাকে ঘিরে জমানো সব স্মৃতি কিছুক্ষণ তোলপাড় তোলে বুকের ভেতর। তারপরে আবার জীবন চলতে থাকে জীবনের নিজস্ব বোঝা কাঁধে নিয়ে। আধুনিক সময়ে প্রতিদিনই আমাদের জানাজা পড়তে হচ্ছে, যোগ দিতে হচ্ছে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়। এবং এটা সেই সময়, যখন শোক দ্রুতই ফুরায়– কিন্তু অকালমৃত্যুর দুঃখটা রয়ে যায়। কাজের মাঝখান থেকে মৃত্যু যাদের নিয়ে যায়, তাদের মৃত্যু তো অবশ্যই অকালমৃত্যু। রাষ্ট্র সংস্কার করতে চেয়েছিলেন হাবিবুর রহমান, নতুন মানবিক সংবিধান চেয়েছিলেন হাবিবুর রহমান। সত্তর বছর বয়সেও যিনি এমন মুক্তিযোদ্ধা থেকে যেতে পারেন, তিনিই তো বলতে পারেন, মৃত্যুতেই সব শেষ হয় না। আপনাদের সিলসিলা শেষ হবে না হাবিব ভাই। তবুও বড় আফসোস হাবিব ভাই, আপনাকে যথাযোগ্য অভিবাদন জানাতে পারি নাই। ফারুক ওয়াসিফ: পরিকল্পনা সম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×