ঢাকা বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

প্রতিযোগিতা কমিশন ব্যর্থ কেন?

বাজার

প্রতিযোগিতা কমিশন ব্যর্থ কেন?

মো. আসাদুজ্জামান

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৩ | ১৯:৪৬ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৩ | ১৯:৪৬

বাংলাদেশে প্রতিযোগিতা আইন বা কমিশন না থাকায় বিভিন্ন সময়েই অসুস্থ ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় বাজার ব্যবস্থা ভারসাম্যহীন ও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি কোনো হাতিয়ার ছিল না। সরকার ২০১২ সালে প্রতিযোগিতা আইন প্রণয়ন করে এবং একজন চেয়ারম্যান ও চারজন সদস্যের সমন্বয়ে ‘বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন’ নামে আধাবিচারিক সংস্থা প্রতিষ্ঠা হয়।

আইনের ৮ ধারায় সুস্পষ্ট বলা হয়েছে, কমিশন একই সঙ্গে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। সেই ক্ষমতা কতখানি প্রয়োগ হচ্ছে, বাজার পরিস্থিতি দেখে সন্দেহ জাগে। প্রতিযোগিতা আইনের ১৫ ধারায় বলা আছে– ‘কোনো ব্যক্তি কোনো পণ্য বা সেবার উৎপাদন, সরবরাহ, বিতরণ, গুদামজাতকরণ বা অধিগ্রহণ সংক্রান্ত এমন কোনো চুক্তিতে বা ষড়যন্ত্রমূলক যোগসাজশে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আবদ্ধ হইতে পারিবে না, যাহা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে বা বিস্তারের কারণ ঘটায় কিংবা বাজারে মনোপলি অথবা অলিগোপলি অবস্থার সৃষ্টি করে।’ অথচ বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় এই অলিগোপলি ও কিছু ক্ষেত্রে মনোপলি ব্যবসা চলছে, কিন্তু কমিশন নীরব ভূমিকা পালন করছে। 

বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে প্রতিযোগিতা কমিশনের কোনো ভূমিকা চোখেই পড়ে না। যেমন রমজান মাসে হঠাৎ সব পণ্যের দাম উৎপাদক পর্যায় থেকে একসঙ্গে বাড়ানো হয়েছিল। পোলট্রি ব্যবসায় নিয়োজিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেট করে খাবারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছিল। সে জন্য মুরগির দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। একই অজুহাতে ডিমের বাজারে অস্থিরতা চলেছে। এ ছাড়াও কসমেটিকস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের বাজার অস্থির হয়ে আছে। সাবান, গুঁড়ো সাবান, পেস্টসহ টয়লেট্রিজ সামগ্রীর দাম অনেক বেড়েছে। ফলে মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। 

এসব পণ্যের দাম বাড়ানোর পেছনে কারা দায়ী, সংবাদমাধ্যমে প্রায়শ লেখা হচ্ছে। কিন্তু প্রতিযোগিতা কমিশন উদ্যোগী হচ্ছে না। অথচ প্রতিযোগিতা আইনের ৮(২) ধারা অনুযায়ী স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অথবা অভিযোগের ভিত্তিতে কমিশন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অনিয়ন্ত্রিত বাজার, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদির বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা কমিশনের ভূমিকা একেবারে শূন্য। 

যদিও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের আওতায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হচ্ছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তবুও তাদের ভূমিকা দৃশ্যমান। প্রতিযোগিতা আইনে যদিও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট ধারা নেই, কিন্তু বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন পর্যালোচনা করার ক্ষমতা রাখে। 

আইনে প্রতিযোগিতা কমিশনকে অভ্যন্তরীণ আদেশ জারির ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ কোনো অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে এই কমিশন অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কার্য চলমান রাখা থেকে বিরত থাকার আদেশ দেয়। এ আইনের দুর্বল দিক হলো, জনগণকে সম্পৃক্ত করতে না পারা। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন নিয়ে আলোচনা হয়, এ আইন নিয়ে সে রকম আলোচনা নেই। তাই কেউ এ আইনের আওতায় মামলা করে না। 

বাজারে প্রতিযোগিতাবিরোধী যদি কোনো কাজ হয় তাহলে এ আইনের আওতায় শাস্তি দেওয়ার বিধান আছে। এ ক্ষেত্রে কমিশন ওই প্রতিষ্ঠানের গত তিন বছরের মোট লাভের ১০ শতাংশ জরিমানা করতে পারে। প্রতিযোগিতা কমিশন থেকে যে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে, সেটি না মানলে বা কমিশনের কাজে অসহযোগিতা করলে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা করার সুযোগ রয়েছে। বাজারে যেসব পণ্য ও সেবা রয়েছে, সেগুলোর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কাজ করবে প্রতিযোগিতা কমিশন। 

প্রতিযোগিতা কমিশন বা বাজার প্রতিযোগিতা কমিশন ১৫০টি দেশে রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতিযোগিতা কমিশন পুরোপুরি কাজ করতে পারলে দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বা জিডিপিতে ২ থেকে ৩ শতাংশ ভূমিকা রাখতে পারে। এতে দেশ লাভবান হবে। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রক সংস্থা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাজার গবেষণা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। অথচ আমাদের প্রতিযোগিতা কমিশন শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক। ঢাকার বাইরে এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চালানোর মতো অফিস নেই। পর্যাপ্ত লোকবল, গবেষক নেই। নিয়মিত বাজার তদারকি, ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দৃশ্যমান কোনো আলোচনা নেই।

প্রতিযোগিতা কমিশন সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে জানানোর জন্য প্রচারণার পাশাপাশি সংবাদকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা ও কর্মমালা করলে সফলতা বেশি আসবে। কারণ বাজার নিয়ে সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা বিভিন্ন খবর বাজার গবেষণা ও মূল্যবৃদ্ধি কমাতে সাহায্য করবে। আমাদের দেশে আইন আছে, কমিশন আছে, তবুও বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। অসম বাজার নীতি ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য দমনে এ আইন ও কমিশন কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারলে বাজার নিয়ন্ত্রণ, সিন্ডিকেট বাণিজ্য নির্মূল করা সম্ভব। 

মো. আসাদুজ্জামান: সহকারী অধ্যাপক, আইন ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা

asad@law.ku.ac.bd

আরও পড়ুন

×