ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

রাজনীতি

একতরফা নির্বাচন সমাধান নয়

একতরফা নির্বাচন সমাধান নয়

আবু সাঈদ খান

আবু সাঈদ খান

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৩ | ০০:২৫

ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ হতে যাচ্ছে। নির্বাচন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অঙ্গ। সংসদীয় পদ্ধতিতে সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠিত হয়; সংসদে বিরোধী দলের অবস্থানও নির্ণীত হয়। সরকারি দল ও বিরোধী দলের পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে সরকার পরিচালিত হয়। তাই শক্তিশালী বিরোধী দল সংসদীয় পদ্ধতির অপরিহার্য শর্ত। যে সংসদে কার্যকর বিরোধী দল থাকে না, সেই সংসদ বন্ধ্যা, অচল। এর প্রমাণ দশম ও একাদশ সংসদ।

দশম সংসদে ক্ষমতার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি সংসদের বাইরে ছিল। জাতীয় পার্টি ছিল একই সঙ্গে সরকারে ও বিরোধী দলে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। আর জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ ছিলেন সংসদের বিরোধী দলের নেতা। রসিকজন বলত, গৃহপালিত বিরোধী দল। 

২০১৮ সালের অভিনব নির্বাচনে বিএনপি সংসদে তৃতীয় অবস্থানে। মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের মর্যাদা লাভ করে। ক্ষমতাসীন দলের প্রতি বিরোধী দলের সীমাহীন আনুগত্যের কারণে সংসদের ভেতরে ও বাইরে একদলীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই বলা যায়, ২০২৪ সালে বিএনপিকে বাইরে রেখে নির্বাচন হলে তা হবে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের গঠিত সংসদের পুনরাবৃত্তি মাত্র।
কেবল বিএনপি নয়; ৪৪টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে বাম ও ইসলামী দলসহ বেশির ভাগ দলই এই নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। প্রতীয়মান হচ্ছে, জাতি ২০১৪ সালের মতো আরেকটি একতরফা নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে। তবে কোনো নাটকীয় ঘটনা ঘটলে আলাদা কথা।

বিএনপি, বাম ও বৃহৎ ইসলামী দলগুলো ছাড়া কেমন নির্বাচন হবে তা আন্দাজ করা যায়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রায়ই বলেন, খেলা হবে। সবাই বোঝেন, বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো ভোটের মাঠে না থাকলে যে খেলা হবে, তা ভানুমতীর খেল। রেফারিরাও ভোট দেবে। তার আলামত আগেই শুরু হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে একাধিক ওসি নৌকা মার্কায় ভোট চেয়েছেন। তবে সবাই এ রকম নন। বেশির ভাগই প্রকাশ্যে ভোট চাইবেন না। পছন্দের প্রার্থীকে ভোটে জিতিয়ে দেবেন। গত ২৮ অক্টোবর বিএনপির জনসভাকে কেন্দ্র করে পুলিশের ভূমিকা, নয়াপল্টন কার্যালয়ে তালা, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সারাদেশে কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে পুলিশের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ। 

আমাদের নির্বাচনের কাছাকাছি সময়ে ভারতের লোকসভার নির্বাচন হবে। দুই দেশের দুটি আইনসভার নির্বাচনের মধ্যে পার্থক্য– ভারতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো বিতর্ক নেই। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলেও সব দল অংশ নেবে; কংগ্রেস বা নকশালিরা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবে না। কারণ তাদের জানা আছে, ভোটের সময় কোনো কোনো কেন্দ্রে সংঘর্ষ ও কারচুপি হলেও, তাতে গণরায় বদলাবে না এবং বিরোধী দল বা জোট প্রার্থীদের জয় ছিনতাই হবে না। 

ভারতে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সরকার পরিবর্তনের রেওয়াজ ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা থেকে আমরা অনেক দূরে। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয় না; কখনোই সরকার পরিবর্তন হয় না। অতীতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হয়নি। এবারও যদি একই ব্যবস্থাপনায় নির্বাচন হয়, একই ঘটনার ব্যতিক্রম হবে না। 

ক্ষমতাসীন দলের নেতারা ভারতসহ নানা দেশের উদাহরণ দেন। বলেন, ওসব দেশে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়। কিন্তু বলেন না যে, ভারতের মতো পুলিশ ও প্রশাসন স্বাধীনভাবে চলবে; তাদের দলমত থাকবে না। ভারত ও পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মতো পুলিশ প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকলে, নির্বাচন কমিশন আজ্ঞাবহ না হলে আমাদের দেশে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে আপত্তি থাকত না। তারপরও ২০১৮ সালে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে গিয়েছিল। ওই নির্বাচনে আরও খারাপ দৃষ্টান্ত তৈরি হলো।

ভারতের মতো আমাদেরও নির্বাচনী আইন-কানুন আছে। নির্বাচনের সময় পুলিশ প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত হয়। কিন্তু নির্বাচন কমিশন চাইলেও তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বরং নির্বাচন কমিশনই সরকার-প্রশাসনের হাতের পুতুলে পরিণত হয়। কারণ যারা ক্ষমতায় থাকে; প্রশাসন তাদের আজ্ঞাবহ হয়, পুলিশ লাঠিয়ালে পরিণত হয়। তাদের ‘কাজ’ সরকারি দলের স্বপ্ন পূরণ। যে কারণে ১৯৯০ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি উঠেছিল এবং সে অনুযায়ী ১৯৯১ সালে নির্বাচন হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগীদের দাবির মুখে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান প্রবর্তিত হয়েছিল। এটি বিলুপ্ত হলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। বেশির ভাগ দলই এ দাবি করছে এবং দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে।

বলা বাহুল্য, আমি এসব আন্দোলনকারী দলের কেউ নই, কোনো দলেরই সদস্য নই। নাগরিক অধিকার সমুন্নত রাখতে আমিও দলনিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থাপনা চাই। ১৯৯০ সালে তত্ত্বাবধায়ক দাবির সঙ্গে ছিলাম। ১৯৯৬ সালে যখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন হয়, তখনও অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছি। যখন ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বিলুপ্ত হয়, তখনও প্রতিবাদ জানিয়েছি। এখনও বিবেকের তাড়নায় নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থাপনা চাই।

ভোটের অধিকার আমাদের অনেক ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত। শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখের নেতৃত্বে সুদীর্ঘ লড়াইয়ের ফসল ভোটাধিকার। ভোটদানের মধ্য দিয়ে দেশ শাসনে সাধারণ মানুষের অংশিদারিত্ব কায়েম হয়, যা হীন রাজনৈতিক স্বার্থে বিপন্ন হতে পারে না।
আমাদের চাওয়া আর বাস্তবতা ভিন্ন। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, এখন আর সংলাপের সুযোগ নেই। এর মানে, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা হচ্ছে না; আবারও বিতর্কিত নির্বাচনের তোড়জোড় চলছে।

আরেকটি একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠিত হবে– এমন আশা করা যায় না। এক বাক্যে বলা যায়, সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জায়গা আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে। অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়বে, যা বহুমাত্রিক সংকটের জন্ম দিতে পারে। 
বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওপর আরও কালো ছায়া পড়বে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে যেতে পারে, যা আমাদের গার্মেন্টসসহ রপ্তানি বাণিজ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। 

সবচেয়ে বড় কথা, দেশের অর্থনৈতিক সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে এসেছে। মুদ্রাস্ফীতি অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমেছে। দিন দিন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমছে। ডলার সংকটে প্রয়োজনীয় আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। এই সংকটের মুখে প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য। একতরফা নির্বাচনে জাতির বিভক্তি রেখা আরও প্রশস্ত হবে। 
পরিশেষে বলতে চাই, এখনও সংলাপের সময় আছে। প্রয়োজনে তপশিল পরিবর্তনেরও সুযোগ আছে। দেশের সামগ্রিক স্বাথের্ই প্রত্যাশা– আর একতরফা নির্বাচন নয়; নয় কোনো প্রহসন। 

আবু সাঈদ খান: লেখক ও গবেষক; উপদেষ্টা সম্পাদক, সমকাল
 

আরও পড়ুন

×