ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

অর্থনীতির দুর্গতি ঠেকাইতে হইলে…

অর্থনীতির দুর্গতি ঠেকাইতে হইলে…

.

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২২:২৮

বাংলাদেশের মতো মধ্যম আয়মুখী দেশগুলির ইতিহাসের এক পর্যায়ে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণ আসিয়া থাকে। নিম্নমধ্যম আয় হইতে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের সেই সন্ধিক্ষণ অনেকটা বাঁদরের তৈলাক্ত বাঁশ দিয়া বাইয়া উঠিবার মতো। একেবারে শীর্ষে উঠিবার পূর্বেই সেইখানে পতনের সমূহ আশঙ্কা দেখা যায়। আমরা দেখিয়াছি, এশিয়ার মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুর ছাড়া আর কোনো দেশই নিম্ন হইতে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরিত হইতে পারে নাই। দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করিতে করিতে ঠেকিয়া যাওয়া এই দেশগুলির মধ্যে মালয়েশিয়া, উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও দক্ষিণ আফ্রিকা রহিয়াছে। ভারত ও ইন্দোনেশিয়াও নিম্নমধ্যম আয়ের ফাঁদেই আটকাইয়া রহিয়াছে। 

দেখা যাইবে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক কোনো সংকটই উপরে উল্লিখিত দেশগুলিকে নিম্নমধ্যম আয়ের ফাঁদ হইতে বাহির হইতে দেয় নাই। আশঙ্কা জাগিয়াছে যে, নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংকট, ভূরাজনীতি এবং অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সেইরকম কোনো সন্ধিক্ষণে আসিয়া পড়িয়াছে কিনা।

বাংলাদেশের সবেধন নীলমণি রপ্তানি পণ্য পোশাকশিল্পের উপর বাহিরের কুদৃষ্টি হইতেই এই আশঙ্কা জাগ্রত হইয়াছে। এমনকি বাংলাদেশের সরকারি মহলে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা লইয়া সতর্ক আলাপ-আলোচনা চলিতেছে। যেমন সোমবারের এক সংবাদে বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষের বরাতে বলা হইয়াছে, শ্রম অধিকারের ইস্যুতে বাংলাদেশের উপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় নাই। আমরাও অনুরূপ আশা করি। কিন্তু গত রবিবার রাজধানীতে সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াবের মতবিনিময় সভায় দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ সেই আশায় বসত করিতে দেয় না। এই দিকে যে সরকারি সভায় এই বিষয়ে আলোচনা হইয়াছে, তাহাতে পররাষ্ট্র, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধিদেরও উপস্থিত থাকা দিয়া পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। 

এইদিকে কিন্তু রিজার্ভ সংকট কাটে নাই, ডলার সংকটের এই সময়ে টানা দুই মাস পণ্য রপ্তানির পরিমাণও কমিল। সর্বশেষ গত নভেম্বরে ৪৭৮ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হইয়াছে। এই রপ্তানি গত বৎসরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ০৫ শতাংশ কম। ব্যাংক ব্যবস্থার চিত্রও গুরুতর। বাংলাদেশ ব্যাংককে অভূতপূর্ব মাত্রায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলিকে নগদ তহবিল জোগাইতে হইতেছে। এই পরিস্থিতিতেই ঘোষিত হইয়াছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শ্রমনীতি। এই নীতিতে শ্রমমান ও শ্রমিকের অধিকার খর্বকারী দেশগুলিকে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার হুঁশিয়ারি ব্যক্ত করিয়াছে। বাংলাদেশ সরকারের তরফে যদিও বলা হইয়াছে যে, শ্রমিকের নিম্নতম মজুরি বৃদ্ধিসহ শ্রম আইন সংস্কার করা হইয়াছে এবং এই ক্ষেত্রে আরও শ্রমিকবান্ধব আইনি পদক্ষেপ আসিবে। এইসবের ভিত্তিতে বলা যায়, বাংলাদেশ এই নিষেধাজ্ঞার খাঁড়া কাটাইয়া উঠিবে নিশ্চয়। 

কিন্তু তাহার জন্য কাজ করিতে হইবে। রাজনৈতিক মতবিরোধের অবসান ঘটাইয়া শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিতের সময় এখনও ফুরাইয়া যায় নাই। বিনিয়োগের উৎস ও রপ্তানি-গন্তব্য দেশগুলি তথা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশের সহিত যোগাযোগ ও সমঝোতা বাড়াইতে হইবে। দেশ আর অনিশ্চয়তা বহন করিতে পারিতেছে না।

আরও পড়ুন

×