ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

শতাব্দীপ্রাচীন আলোকচিত্রে ১৮৯৭ সালের ‘রৌমারী ভূমিকম্প’

তৃতীয় মেরু

শতাব্দীপ্রাচীন আলোকচিত্রে ১৮৯৭ সালের ‘রৌমারী ভূমিকম্প’

শেখ রোকন: লেখক ও গবেষক; সহযোগী সম্পাদক, সমকাল

শেখ রোকন

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২২:৪১ | আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩ | ১৯:৫৬

সোয়া শতাব্দীপ্রাচীন আলোকচিত্রটি যখন সামনে এলো, নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল! এও সম্ভব! ১৮৯৭ সালের প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পটির কথা বহুল আলোচিত। কম্পন মাত্রা, ব্যাপ্তি ও ধ্বংসযজ্ঞ বিবেচনায় এটি ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়াক’ বা ভারতীয় মহাভূমিকম্প নামে পরিচিতি পেয়েছে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে যে ক’টি ভূমিকম্প ভীতিকর উদাহরণ হয়ে আছে, এটি তার একটি। কিন্তু ভূমিকম্পটি কুড়িগ্রামের রৌমারীর মতো প্রত্যন্ত জনপদে কীভাবে আঘাত হেনেছিল, সেই আলোকচিত্র কোথাও নিভৃতে পড়ে থাকতে পারে, ধারণা ছিল না।

১৮৯৭ সালের ১২ জুন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আরাকান থেকে দিল্লি পর্যন্ত কাঁপিয়ে তোলা ভূমিকম্পতে সেই কম ঘনত্বের জনসংখ্যার যুগেও ১৫৪২ জনের প্রাণহানি রেকর্ড হয়েছিল। রিখটার স্কেলে ৮ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটির উৎস মেঘালয়ের ৫০০ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে সবকিছু ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। দেড় লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ‘ম্যাসনরি’ বা ইট-পাথর-সিমেন্টে নির্মিত সমস্ত স্থাপনা ভেঙে পড়েছিল। শিলং, গৌহাটি, সিলেট, রংপুর, কোচবিহার শহর তো বটেই; ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কলকাতার ভবনগুলোও গুরুতর ফাটল ও ধসের সম্মুখীন হয়েছিল। ব্রহ্মপুত্রে দেখা দেওয়া সুনামিতে ভেসে গিয়েছিল গোয়ালপাড়া শহর। দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দিরের নবরত্ন চূড়া ওই ভূমিকম্পে ভেঙে গিয়ে বর্তমান ‘বোঁচা’ আকার ধারণ করে। ঢাকায় আহসান মঞ্জিলের গম্বুজ ভেঙে পড়ায় আতঙ্কিত নবাব পরিবার মঞ্জিলের সামনের চত্বরে কিছুদিনের জন্য তাঁবু টানিয়ে বসবাস করেছিল। 

প্রশ্ন হচ্ছে, পূর্বে মেঘালয়ের পাহাড়ি অঞ্চল ও পশ্চিমে বিপুল ব্রহ্মপুত্র নিয়ে গঠিত পলল উপত্যকা রৌমারীতে ১৮৯৭ সালের ওই ভূমিকম্পে কী পরিস্থিতি হয়েছিল? ভূমিকম্পের ১শ বছর কেটে যাওয়ার পর প্রথম প্রজন্মের সেই ভীতিকর অভিজ্ঞতা দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রবীণদের মধ্যে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিল। আমি প্রথম শুনেছিলাম পিতামহ মফিজউদ্দিন আহমেদের (১৯১৮-২০০৩) কাছে, নব্বই দশকের গোড়ায়। তিনি শুনেছিলেন তাঁর পিতা ও ভূমিকম্পের প্রত্যক্ষদর্শী শেখ জয়েনউদ্দিনের কাছে। শুনেছিলেন, অধিকাংশ বাড়িঘর ও গাছপালা তো পড়ে গিয়েছিলই; মানুষ দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। মুড়ি ভাজার সময় খোলায় যেভাবে চাল ফুটতে থাকে, সেভাবে সবাই মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। কড়াইয়ের পানি মাটিতে ঢালার মতো করে পুকুরগুলো খালি হয়ে আশপাশের জমিজমা ভিজে গিয়েছিল। সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল কোথাও কোথাও ভূমি ভেদ করে ওঠা তীব্র গতির প্রস্রবণ; পানি, বালি ও পাথরের আঘাতে অনেকে প্রাণ হারিয়েছে।

একজন প্রত্যক্ষদর্শী অবশ্য তখনও জীবিত ছিলেন। রৌমারীর অনেক পরিবারেই তিন প্রজন্ম ধরে প্রসবকালীন ভরসা খ্যাতিমান ধাত্রী জোবেদা বেগম। প্রজন্ম নির্বিশেষে সবাই তাঁকে ‘নানি’ বলে ডাকত। প্রসবকালীন জটিলতা দেখা দিলে দূরদূরান্তের গ্রাম থেকেও মানুষ আসত। নব্বই দশকের গোড়ায় একদিন কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, তাঁর বয়স পাঁচ কুড়ি পার হয়েছে। আমি সেই বয়স নিয়ে সন্দেহ পোষণ করায় প্রমাণ হিসেবে শৈশবে ‘বড় ভূমিকম্প’ দেখার কথা বলেছিলেন। তখন তিনি ৭-৮ বছর বয়সী; কিন্তু স্পষ্ট মনে আছে, সবাই মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। আর ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী খঞ্জনমারা গ্রামের দিকে ‘ফুক্যার’ উঠেছিল। এই ফুক্যার মানে ভূমি ভেদ করে ওঠা প্রস্রবণ। তাঁর কাছে শোনার বহু বছর পরে বুঝেছিলাম, সেটি ছিল ১৮৯৭ সালের মহাভূমিকম্প।

আমার কাছে দেওয়া এ দুই প্রয়াত ব্যক্তির বর্ণনার সঙ্গে মিলে যায় যুক্তরাজ্যের সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদনের ভাষ্য। ১২ এপ্রিল ২০০১-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়– ‘১৮৯৭ সালের ১২ জুনের ভূমিকম্পের তীব্রতা চূড়ান্ত পর্যায়ে রিখটার স্কেলে ৮ দশমিক ৮ মাত্রায় পৌঁছে গিয়েছিল। কম্পনের সময় তৎকালীন শিলং জেলার একটি মালভূমি বা সমতল অংশ, যা এখন বাংলাদেশে পড়েছে, তিন সেকেন্ডের মধ্যে ৫০ ফুট উঁচু হয়ে গিয়েছিল।’ এর মধ্য দিয়ে পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের স্রোত আরও কমে যাওয়ার কারণ অনুমান করা যায়। ব্রহ্মপুত্রের মূল স্রোত আগেই পুরাতন খাতের বদলে নতুন সৃষ্ট যমুনা দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ভূমিকম্পের ফলে ময়মনসিংহ ও শেরপুর অঞ্চল ৫০ ফুট উঁচু হয়ে যাওয়ায়, স্বাভাবিকভাবেই নদীটির স্রোত আরও ঘুরে গিয়েছিল অপেক্ষাকৃত ঢালু অঞ্চলের যমুনার দিকে।

ভূমিকম্পকালীন পরিস্থিতি নিয়ে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে আরও যা বলা হয়েছে, তা মানুষের ‘মুড়ি ভাজা’ হওয়ার মতোই: ‘বড় পাথর, শিলা, এমনকি মানুষকেও ভূমি থেকে তুলে শূন্যে ছুড়ে ফেলছিল কম্পন। নিম্ন আসাম অঞ্চলে ভূমিকম্পের আগের সমতল ধানক্ষেতগুলো এক মিটার পর্যন্ত উঁচু-নিচু ভূমিতে পরিণত হয়েছিল। দেখে মনে হচ্ছিল, শতছিন্ন গালিচা। যুক্তরাজ্যের আয়তনের সমান এলাকাজুড়ে সমস্ত পাকা ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।’ 

ভূমিকম্পের পর ‘আফটার শক’ বা পরাঘাত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলেছিল। দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে– ‘আসামের একটি চা বাগানে টেবিলের ওপর রেখে দেওয়া এক গ্লাস পানি ভূমিকম্প-পরবর্তী এক সপ্তাহ পর্যন্ত কাঁপছিল। একবারের জন্যও থামেনি’।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনের সূত্র বিজ্ঞানবিষয়ক ব্রিটিশ সাপ্তাহিক ‘নেচার’। ২০০১ সালের এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সংখ্যায় ওই ম্যাগাজিনে একটি গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশ হয়েছিল ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পটি নিয়ে। নিবন্ধটি যৌথভাবে লিখেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রজার বিলহ্যাম এবং যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফিলিপ ইংল্যান্ড। ভূতাত্ত্বিকভাবে অপেক্ষাকৃত শান্ত ও বহুলাংশে সমতল এলাকায় ভূমিকম্পটি কেন ঘটেছিল– ওই দুই অধ্যাপক প্রথমবারের মতো প্রশ্নটির জবাব খুঁজে পান।

ভূমিকম্প-পরবর্তী এক শতাব্দী ধরে বিভিন্ন গবেষকের অনুসন্ধান ও অনুমান শেষেও বোঝা যাচ্ছিল না, ভূমিকম্পের ‘এপিসেন্টার’ বা উৎসস্থল কোনটি। আগের এক হাজার বছরে যেখানে ভূমিকম্প ঘটেনি, সেখানে এমন প্রবল ভূমিকম্পের কারণ কী?

অবশ্য ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পটি সম্ভবত সবচেয়ে বিস্তারিত নথিভুক্ত ভূমিকম্পগুলোর একটি। এর কৃতিত্ব দিতে হবে ইন্ডিয়ান জিওলজিক্যাল সোসাইটির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রিচার্ড ডিক্সন ওল্ডহ্যামকে। এই ব্রিটিশ ভূতত্ত্ববিদ ১৮৭৯ থেকে ১৯০৩ সাল পর্যন্ত হিমালয় অঞ্চল নিয়ে কাজ করেছেন। ভূমিকম্পের পরপরই তিনি ভূতত্ত্ববিদদের একটি দল নিয়ে অকুস্থলে চলে যান। শিলং, সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুর, গোয়ালপাড়া অঞ্চলে তিন মাস ধরে জরিপ ও নথিভুক্তির কাজ করে তথ্য ও চিত্রের বিপুল সম্ভার নিয়ে কলকাতায় সদরদপ্তরে ফেরেন। দুই বছর পর ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত হয় ‘রিপোর্ট অন দ্য গ্রেট আর্থকোয়াক অব টোয়েলভথ জুন এইটিন নাইনটি সেভেন’। ওই রিপোর্ট অতীতের মতো নিছক কয়েক পৃষ্ঠার ‘ভূমিকম্প প্রতিবেদন’ ছিল না। সাড়ে পাঁচ শতাধিক পৃষ্ঠার নথিতে ভূমিকম্পের কম্পন মাত্রা, উৎস অঞ্চলের বিভিন্ন ‘ফল্ট লাইন’ বা চ্যুতি, ভূ-তরঙ্গ, সৃষ্ট ‘ফিশার’ বা ফাটল ও ‘স্যান্ড-ভেন্ট’ বা প্রস্রবণ-গর্ত, ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও স্থাপনা, নদীপ্রবাহ এবং আক্রান্তদের ভাষ্য যথাসম্ভব বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছিল। এমনকি ওই এলাকায় ১৮৬০ সালে পরিচালিত ভূ-জরিপ চিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে তুলনামূলক পর্যালোচনা করা হয়েছিল।

প্রতিবেদনে পর্যাপ্তসংখ্যক ড্রয়িং, গ্রাফ, মানচিত্র, সূচক রয়েছে। এছাড়া জরিপের অংশ সব জনপদের অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ উল্লেখ করা হয়েছে। সবচেয়ে যে বিষয়টি এই প্রতিবেদনকে অতীতের সমস্ত প্রতিবেদন থেকে স্বতন্ত্র করেছে এবং ভবিষ্যতেও ভূমিকম্পবিষয়ক গবেষণার পথ খুলে দিয়েছে, সেটি হচ্ছে বিপুলসংখ্যক আলোকচিত্র। তৎকালীন বাস্তবতায় একেকটি আলোকচিত্র ছিল বিপুল ব্যয়সাপেক্ষ। কিন্তু আর. ডি. ওল্ডহ্যাম খরচের ব্যাপারে কার্পণ্য করেননি। এতে ব্যবহৃত অর্ধশতাধিক আলোকচিত্রের মধ্যে ১০ ও ১১ নম্বরে রয়েছে রৌমারীর দুটি আলোকচিত্র: একটি স্যান্ড ভেন্ট বা প্রস্রবণচিহ্ন, অপরটি ফিশার বা ভূমির ফাটল। 

এ ছাড়া একটি বিস্তারিত মানচিত্রে জরিপ দলের যাতায়াত পথ চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, একটি দল বর্তমান মেঘালয় রাজ্যের তুরা থেকে বর্তমান আসাম রাজ্যের মানকারচর হয়ে বর্তমান রৌমারী উপজেলায় এসেছে এবং ব্রহ্মপুত্রের পাড় পর্যন্ত জরিপ করেছে। অপর একটি দল কোচবিহার থেকে ট্রেনে দিনহাটা ও কুড়িগ্রাম স্টেশন হয়ে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে ‘যাত্রাপুর স্টেশন’ পর্যন্ত এসেছে। হায়, ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে যাত্রাপুর পর্যন্ত রেললাইনও সেই কবে কালের গর্ভে অপসৃত হয়েছে!

গুরুত্ব বিবেচনায় প্রতিবেদনটি পরবর্তীকালে, খুব সম্ভবত ১৯২৩ সালে লন্ডন থেকে ‘মেমোয়ারস অব দ্য জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া’ শীর্ষক গ্রন্থ সিরিজের ২৯ নম্বর ভলিউম আকারে প্রকাশিত হয়। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে রৌমারী অঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ওই আকর গ্রন্থের পিডিএফ কপিটি হাতে আসে আমার। ওই গ্রন্থের ১৪, ১৫৯ নম্বর পৃষ্ঠায় তুরা থেকে রৌমারী যাত্রাপথে ভূমিকম্পের ধ্বংসযজ্ঞ বর্ণিত হয়েছে। ওই অঞ্চলে মোতায়েন ‘মিলিটারি পুলিশ’ ফাঁড়ির লোকজন জানিয়েছেন, কয়েকটি পাহাড়ের যেমন অবনমন ঘটেছে, তেমনই কয়েকটির উচ্চতা বেড়ে গেছে। তুরা থেকে রৌমারী পর্যন্ত সড়কপথ ধস ও ফাটলে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। 

১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে রৌমারীতে সৃষ্ট ‘ফিশার’ বা ফাটল

গ্রন্থটির ২৫৮-২৫৯ নম্বর পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে আরেকটি জরিপ দলের পর্যবেক্ষণ। তারা নদীপথে যমুনা দিয়ে গোয়ালন্দ থেকে সিরাজগঞ্জ হয়ে রৌমারী পর্যন্ত এসেছিল। সেখানে বর্ণিত হয়েছে– ‘‘আমরা দেখলাম, রৌমারীর কাছে নদীটি (ব্রহ্মপুত্র) উত্তর-পূর্ব দিক থেকে এসে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়েছে। নদীর ডান দিকে প্রধান একটি ফাটল দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ৫০০ গজ গিয়ে একটি ঝিলের মধ্যে হারিয়ে গেছে। শুনলাম, ফাটলটি ঝিল পার হয়ে নদী থেকে ৯ মাইল পর্যন্ত গিয়েছে। ফাটলের পাশেই একটি গ্রাম অবস্থিত। সেটির ভিটাগুলো নদীর পাড়ের চেয়ে উঁচু। সম্ভবত পুরোনো কোনো নদীখাতের পাড়ে বসতি গড়ে উঠেছিল। ফাটল থেকে বালি ও কাদা দুই পাশে উথলে উঠে ভূমি থেকে চার ফুট পর্যন্ত উঁচু স্তূপ হয়ে আছে। প্রধান ফাটল থেকে আরও কয়েকটি শাখা ফাটল উত্তরে উঁচু ভূমির দিকে চলে গেছে। এগুলোর একটি গ্রামের বাড়িঘর ভেদ করে চলে গেছে। ফাটলের মধ্য দিয়ে বালি ও কাদা উথলে ওঠার পরিণতিতে কিছু জায়গার অবনমন ঘটেছে এবং ‘হ্রদের মতো’ গভীর জায়গা তৈরি হয়েছে। ফাটল দিয়ে উঠে আসা পানি সেখানে গিয়ে জমেছে। আরও ছোট ছোট ফাটল একে অন্যকে অতিক্রম করায় ভূমির মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে চৌকোনা ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।” 

স্থানীয়ভাবে এই হ্রদগুলো এখন ‘কুড়া’ নামে পরিচিত। বালিময় গভীর তলদেশ, স্বচ্ছ পানি। রৌমারীতে ভৌগোলিকভাবে বেশকিছু ‘কুড়া’ থাকার রহস্য এখন বোঝা যাচ্ছে।

১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পের কারণ, এর উৎপত্তিস্থল এবং ভবিষ্যৎ পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা নিয়ে পরবর্তী এক শতাব্দী ধরে ভূতত্ত্ববিদ, বিজ্ঞানী ও গবেষকরা বিতর্ক করেছেন। এমনকি ঠিক কয়টা কত মিনিট কত সেকেন্ডে ভূমিকম্পটি ঘটেছিল, সে নিয়েও দ্বিমত ছিল। কারণ, আর. ডি. ওল্ডহ্যাম ‘সিসমিক’ বা কম্পনসংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত গ্রহণ করেছিলেন সুদূর ইতালিতে অবস্থিত বিভিন্ন ভূকম্পন স্টেশন থেকে। এর আগে ১৮৯৯, ১৯৮৭ ও ১৯৯২ সালে পরিচালিত গবেষণায় ধারণা করা হয়েছিল, ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল হচ্ছে ভুটানের দক্ষিণ দিকে হিমালয়ের একটি চ্যুতি। কিন্তু সর্বশেষ, ২০০১ সালে নেচার ম্যাগাজিনের গবেষণা নিবন্ধে অধ্যাপকদ্বয় কম্পিউটার মডেলিংয়ের মাধ্যমে প্রমাণ করেন, শিলং মালভূমির ২০ মাইল গভীরে ৭৮ মাইল দীর্ঘ একটি ‘ঘুমন্ত চ্যুতি’ রয়েছে। এটিই জেগে ওঠায় সেই প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প ঘটেছিল। ভূমিকম্পটি নিয়ে যিনি প্রথম প্রতিবেদনের জনক, সেই আর. ডি. ওল্ডহ্যামের নামে চ্যুতিকে ‘ওল্ডহ্যাম ফল্ট’ নামকরণও করেন তারা।

গবেষকদ্বয় বলছেন, ওল্ডহ্যাম চ্যুতি গত এক শতাব্দীতে আরও দক্ষিণে, অর্থাৎ বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে অগ্রসর হয়েছে। ১৮৯৭ সালের মতো আরেকটি প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প ঘনবসতিপূর্ণ রংপুর অঞ্চলের জন্য ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে আনতে পারে। তবে আশার কথা হচ্ছে, ওল্ডহ্যাম চ্যুতি প্রতি তিন হাজার বছরে একবার জেগে উঠতে পারে। আগামী ২৯ শতাব্দীতে ভূমিকম্প পূর্বাভাস ও প্রস্তুতি ব্যবস্থা আরও অগ্রসর হবে নিশ্চয়ই। আজকের রৌমারীর ভৌগোলিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নিশ্চিতভাবেই আজকের মতো থাকবে না। 

‘মাত্র’ সোয়া শতাব্দী পর ‘রৌমারী ভূমিকম্প’-সংক্রান্ত আলোকচিত্রগুলো দেখতে পাওয়া অবশ্য ওই অঞ্চলের বাসিন্দা হিসেবে ব্যক্তিগত আবেগেরও বিষয়। রংপুর অঞ্চল লন্ডভন্ড করে দেওয়া এ কেবল তথ্য ও আলোকচিত্র নয়; যেন এক শতক আগের অখণ্ড বাংলা ও আসাম ঘুরে আসার টাইম মেশিন। এক মুহূর্তে উনিশ শতকের রংপুর, গোয়ালপাড়া, সিলেট, শিলং ছাড়াও রৌমারীতে যাওয়া যায়, যেখানে আমাদের প্রপিতামহ বা প্রপিতামহী জ্যৈষ্ঠের শেষদিকে এক শনিবার বিকেলে প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে উদ্ভ্রান্ত হয়ে দিগ্বিদিক ছুটছিলেন। 

সোয়া শতাব্দী আগের রৌমারী কেমন ছিল; ভূমিকম্প প্রতিবেদনের আলোকচিত্র দুটিতে স্পষ্ট। ভূমিকম্প আক্রান্ত প্রপিতামহ, প্রপিতামহীরা দেখতে কেমন ছিলেন?

শেখ রোকন: লেখক ও গবেষক; সহযোগী সম্পাদক, সমকাল
skrokon@gmail.com

আরও পড়ুন

×