ঢাকা মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪

তারল্য সংকট রোধে কাঠিন্য জরুরি

তারল্য সংকট রোধে কাঠিন্য জরুরি

প্রতীকী ছবি

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০৩:০১

দেশের ব্যাংকিং খাতে ‘চরম তারল্য সংকট’ সৃষ্টি হইবার যেই চিত্র বুধবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠিয়া আসিয়াছে, উহা উদ্বেগজনক হইলেও বিস্ময়কর নহে। বিস্ময়কর নহে এই কারণে যে, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেক দেশেই ব্যাংকিং খাত এই রূপ সংকটের সম্মুখীন। কারণ একদিকে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাইতেছে, অপরদিকে মানুষের সঞ্চয় সক্ষমতা হ্রাস পাইতেছে। এহেন পরিস্থিতিতে ব্যাংকে নগদ অর্থ রাখিবে কীভাবে?

কিন্তু উদ্বেগের বিষয়, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট ‘ধ্রুপদি’ নহে। এই ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতিজনিত কারণে ব্যাংকে সঞ্চয়ের হার কেবল হ্রাসই পায় নাই; বরং বিভিন্ন ব্যাংকের ‘কীর্তি’ দেখিয়া নগদ টাকা তুলিয়া নিজ পকেটে গচ্ছিত রাখাকেই নিরাপদ মনে করিতেছেন আমানতদারগণ। তৎসহিত বৈদেশিক মুদ্রার মজুত হইতে ডলার বিক্রয় বাড়িয়া যাওয়ায় বাজারের ‘তরল টাকা’ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গিয়া ‘জমাট’ বাঁধিতেছে। আলোচ্য পরিস্থিতিতে তারল্য সংকট মোকাবিলায় ব্যবস্থাপনাগত কাঠিন্য আনয়নের বিকল্প আমরা দেখিতেছি না।

হতাশার বিষয়, গত বৎসরের ডিসেম্বর মাস হইতেই দেশের ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট অল্পবিস্তর বিরাজমান থাকিলেও উহা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান নহে। বস্তুত গত আগস্ট মাসেই অত্র সম্পাদকীয় স্তম্ভে আমরা বলিয়াছিলাম– কেন্দ্রীয় ও অন্যান্য ব্যাংক হইতে ধার গ্রহীতার সংখ্যা ও মোট পরিমাণ যেই হারে বাড়িতেছে, উহা উদ্বেগজনক না হইয়া পারে না। বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাইতেছে, এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আন্তঃব্যাংক হইতে ব্যাংকগুলির ধারের পরিমাণ প্রায় ৬৮ সহস্র কোটি টাকায় স্থিত।

ইহার মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হইতেই ধার ৫৩ সহস্র কোটি টাকা অতিক্রান্ত। ইতোপূর্বে কখনও এই বিপুল পরিমাণ ধার গ্রহণের নজির নাই বলিয়া সংশ্লিষ্টরা জানাইয়াছেন। আমাদের প্রশ্ন, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট এত দীর্ঘ সময় ধরিয়া চলিবার নজিরও কি অতীতে ছিল? আর সংকটটি লইয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ নীতিনির্ধারক পর্যায়ে এইরূপ মহাকাব্যিক নির্লিপ্ততাই বা অতীতে কবে দেখিয়াছি?

তারল্য সংকট প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুরের এই পর্যবেক্ষণের সহিত আমরা একমত যে, তারল্য সংকটের নেপথ্যে নীতিগত ভ্রান্তি প্রণিধানযোগ্য। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলিয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি সরকারকে ঋণ প্রদান বন্ধ রাখিলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলিকে যেই উদারভাবে ধার দিতেছে, তাহা ‘যেই লাউ সেই কদু’ ব্যতীত কিছু নহে। ইহাও বহুল আলোচিত যে, দেশের ব্যাংকিং খাতে সংকটের মুখে রহিয়াছে কয়েকটি ব্যাংকের ঋণ-দুর্নীতি ও খেলাপি ঋণের বাড়বাড়ন্ত।

খেলাপি কিংবা মন্দ ঋণের হার বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেও যে অনেক ব্যাংকে নগদ প্রবাহে ঘাটতি দেখা দিয়াছে, ইহা বুঝিবার জন্য অর্থনীতিবিদ হইবার প্রয়োজন নাই। এখন প্রয়োজন হইতেছে, যে কোনো মূল্যে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরাইয়া আনা।

খেলাপি ঋণ যদ্রূপ হ্রাস করিতে হইবে, তদ্রূপ ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রশ্নেও শূন্য সহিষ্ণুতা প্রদর্শনের বিকল্প নাই। কয়েকটি পরিবার বা গোষ্ঠীবিশেষের জন্য সমগ্র ব্যাংকিং খাত জিম্মি থাকিতে পারে না। এহেন কার্য কঠিন– স্বীকার করিতে হইবে। কিন্তু অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মেরুদণ্ড বলিয়া বিবেচিত ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরাইয়া আনিতে হইলে কঠিনেরেই ভালোবাসিতে হইবে। 

আরও পড়ুন

×