ঢাকা মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪

জলবিদ্যুৎ নহে জলবৎ তরলং

জলবিদ্যুৎ নহে জলবৎ তরলং

.

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২২:৫৭

ভারতীয় সঞ্চালন লাইন ব্যবহার করিয়া নেপাল হইতে জলবিদ্যুৎ আমদানি করিবার যেই প্রস্তাব বুধবার অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে নীতিগত অনুমোদন পাইয়াছে, উহাকে আমরা সতর্কতার সহিত স্বাগত জানাই। বস্তুত হিমালয় অঞ্চলের খরস্রোতা প্রবাহগুলিকে কেন্দ্র করিয়া নেপাল ও ভুটানে লক্ষাধিক মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের যেই সম্ভাবনা রহিয়াছে, সেইখানে অংশীদারিত্ব ও বিনিয়োগ লইয়া আমরাই অনেক দিন ধরিয়া তাগিদ দিয়া আসিতেছি। বিলম্বে হইলেও এই সংক্রান্ত উদ্যোগ গতি পাইয়াছে এবং গত মে মাসে ঢাকা ও কাঠমান্ডুর মধ্যে পাঁচ বৎসর মেয়াদি একটা চুক্তিও হইয়াছে। ঐ চুক্তি অনুযায়ী নেপালের দুইটি প্রকল্প হইতে ৪০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ আমদানির উদ্যোগ মন্ত্রিসভা কমিটির নীতিগত অনুমোদনের মধ্য দিয়া এক ধাপ আগাইয়া গেল। ইহাও উৎসাহব্যঞ্জক, নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যে এই বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা কেবল আমদানি নহে, রপ্তানিরও বিষয়। গ্রীষ্মকালে যদ্রূপ উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ আমদানি, তদ্রূপ শীতকালে নেপালের ঘাটতির সময় রপ্তানিও করা হইবে। কিন্তু স্মরণে রাখিতে হইবে, বিষয়টি এখনও জলবৎ তরলং নহে। স্বাগত জানাইতে গিয়াও আমরা সতর্কতার কথা বলিতেছি সেই কারণেই।

আমরা জানি, নেপাল ও বাংলদেশের মধ্যে বিদ্যুৎ আমদানি-রপ্তানিতে ব্যবহৃত হইবে ভারতীয় সঞ্চালন লাইন। গত জুন মাসে এই জন্য নেপাল ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হইয়াছে। প্রতিবেশী এই দেশ হইতেও আমরা বর্তমানে তিনটি সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে আড়াই সহস্রাধিক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করিতেছি। এই ক্ষেত্রে নেপালের বিদ্যুৎ ঐ সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে আনিবার সময় প্রচলিত বিদ্যুতের মূল্যই পরিশোধ করিতে হইবে কিনা, এখনও স্পষ্ট নহে। আমরা মনে করি, জলবিদ্যুতের উৎপাদন খরচ যেহেতু অনেক কম, সেই অনুপাতে নেপাল হইতে আসা বিদ্যুতের মূল্যও কম হওয়া উচিত। ভারতীয় পক্ষ চাহিলে সঞ্চালন লাইনের মাশুল লইতে পারে মাত্র। যদিও বাংলাদেশের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও বাণিজ্য সম্ভাবনা বিবেচনায় ভারতের উচিত হইবে মাত্র ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের সঞ্চালন মাশুলেও ছাড় প্রদান। আর মাশুল প্রদান করিতে হইলেও উহা যাতে মুনাফায় না গড়ায়, সেই ব্যাপারে সতর্কতার প্রয়োজন রহিয়াছে বৈকি। এই বিদ্যুৎ আমদানি করিতে গিয়া দরপত্র আহ্বান না করিয়া সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির ব্যাপারেও আমরা দ্বিতীয়বার চিন্তা করিতে বলিব। কারণ এইরূপ ব্যবস্থায় সুশাসনের ঘাটতি থাকিবার আশঙ্কা থাকিয়াই যায়।

দীর্ঘ মেয়াদে হইলেও আমরা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকগণকে আরেকটা বিষয় ভাবিয়া দেখিতে বলি। নেপাল বা ভুটান হইতে জলবিদ্যুৎ ‘ক্রয়’ করিবার পরিবর্তে তথায় ‘বিনিয়োগ’ করা যায় কিনা। হিমালয়বাহিত নদীগুলির অভিন্ন অববাহিকার অংশ হিসাবে উজানে উৎপন্ন জলবিদ্যুতে বাংলাদেশেরও অধিকারের কথা ভুলিয়া যাওয়া চলিবে না। কারণ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করিতে গিয়া প্রতিবেশ ব্যবস্থার যেই ক্ষতি হইতে পারে, উহার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়িবে। জলবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ কিংবা ত্রিপক্ষীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে আরও সাশ্রয়ী মূল্যে ও অধিক পরিমাণে বিদ্যুৎ প্রাপ্তির মাধ্যমে উহার ‘ক্ষতিপূরণ’ পাওয়া যাইতে পারে। আমরা যদিও বরাবরই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিবার কথা বলিয়া আসিয়াছি; উহার সহিত সাশ্রয় ও সুশাসনের প্রশ্নটিও ভুলিয়া যাইবার অবকাশ নাই।

আরও পড়ুন

×