ঢাকা বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

চাউলের বাজারের ‘মৌসুমি রোগ’

চাউলের বাজারের ‘মৌসুমি রোগ’

প্রতীকী ছবি

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৪ | ১১:৪৬

মাত্র কয়েক সপ্তাহ পূর্বে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী আমন মৌসুমে ধানের ‘বাম্পার ফলন’ লইয়া সন্তোষ প্রকাশ করিয়াছিলেন। পক্ষান্তরে বুধবার চাউলের মূল্যবৃদ্ধি লইয়া খাদ্যমন্ত্রীকে ক্ষোভ জানাইতে হইয়াছে। পরদিন বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রীও অবৈধ মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়াছেন। কারণ আমন ধান কৃষকের গোলা হইতে মজুতদার কিংবা মিলারের গুদামে পৌঁছাইতে না পৌঁছাইতেই দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দেশের বাজারে মান ও ধরনভেদে চাউলের মূল্য কেজিপ্রতি দুই হইতে ছয় টাকা বৃদ্ধি পাইয়াছে।

এই চিত্র যে কেবল চলতি বৎসর দেখা গেল, এইরূপ নহে। বোরো মৌসুমের তুলনায় কম উৎপাদনশীল আমন মৌসুমেও একক নহে; প্রতি বৎসর প্রায় প্রতি মৌসুমেই ঘটিয়া থাকে। বস্তুত এই পরিস্থিতির নেপথ্যে রহিয়াছে সেই ‘ধ্রুপদি’ কারণ– মাঠের উৎপাদন যথেষ্ট ও মিলগুলিতে পর্যাপ্ত ধান থাকিলেও মধ্যস্বত্বভোগীরা ধান ও চাউল মজুত করিবার কারণে বাজারে নূতন মৌসুমের প্রভাব পড়িতেছে না। বরং ঘটিতেছে মূল্যবৃদ্ধি।

ধান-চাউলের বাজারে ঊর্ধ্বগতি রোধে বুধবার খাদ্য অধিদপ্তরে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় খাদ্যমন্ত্রী যদিও ‘চার দিবসের মধ্যে’ চাউলের মূল্য পূর্বের পর্যায়ে নামাইয়া আনিতে ব্যবসায়ীদের নির্দেশ এবং ব্যবসায়ীরাও উক্ত কথায় সম্মতি জানাইয়াছেন; আমরা উহাতে আশ্বস্ত হইতে পারি না। বরং চাউলের মূল্যবৃদ্ধিতে গৃহদগ্ধ গরুর ন্যায় আরেক দফা খাদ্য মূল্যস্ফীতির সিঁদুরবর্ণ মেঘ দর্শন করিয়া ভীত হইতেছি। মধ্যস্বত্বভোগী কবে ধর্মের কাহিনি শুনিয়াছে? বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রীও চাউলের বাজার নিয়ন্ত্রণে উৎপাদক হইতে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় সমন্বয়ের উদ্যোগ লইবার যেই প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন, উহাও দূরের বাদ্য। আমরা অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা দেখিতে চাহি। ভরা মৌসুমেও চাউলের মূল্য কীভাবে বৃদ্ধি পায়, কাহারা জড়িত– এই সকল বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা, অনুসন্ধান, সুপারিশ সম্পন্ন হইয়াছে। বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের প্রতিশ্রুতির ঝুলিও স্ফীত। এখন আমরা বৃক্ষের পরিচয় ফলের মাধ্যমেই জানিতে চাহি।

নিম্ন আয়ের মানুষের নির্ভরতা যেই মোটা চাউলে, উহার মূল্যও অন্যায্যভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছে। ঐ প্রকার চাউলের মূল্যবৃদ্ধি নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত নির্বিশেষে সকলের জন্য জীবিকা নির্বাহ কঠিন করিয়া তুলিতে পারে। ইহাও স্মরণে রাখিতে হইবে, দেশের প্রধান খাদ্যশস্যের বাজার সামান্য অস্থিতিশীল হইলেই অন্যান্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়া থাকে। 

আমরা আশঙ্কা করি, প্রতি মৌসুমেই ‘বাম্পার ফলন’ লইয়া কর্তৃপক্ষের আত্মতুষ্টির মাশুলই ভোক্তাদের গুনিতে হয় কয়েক সপ্তাহের মধ্যে। কৃষি, খাদ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে মাঠ হইতে ভোক্তা পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে তদারকি ও নজরদারি প্রয়োজন। কিন্তু বাম্পার ফলনের শোরগোলে সমন্বয় ও তদারকির প্রশ্নটি চাপা পড়িবার কারণে মজুতদার ও মধ্যস্বত্বভোগীরা অন্যায্য সুযোগ পাইয়া থাকে।

আমরা দেখিতে চাহিব, বিলম্বে হইলেও সংশ্লিষ্টদের সম্বিত ফিরিয়াছে। চাউলের চলমান মূল্যবৃদ্ধি যেই কোনো মূল্যে হ্রাস করিতেই হইবে। প্রতি বৎসর চাউলের বাজারের এই ‘মৌসুমি রোগ’ হইতে ভোক্তাদের মুক্তির কথাও ভাবিতে হইবে।

আরও পড়ুন

×