ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

দক্ষিণ এশিয়া

জনরায় উপেক্ষিত হলে পাকিস্তানের দুর্গতি বাড়বে

জনরায় উপেক্ষিত হলে পাকিস্তানের দুর্গতি বাড়বে

এবারের জাতীয় নির্বাচনে বেশির ভাগ আসন লাভ করে এগিয়ে আছে ইমরান খানের দল সংগৃহীত

সাইফুর রহমান তপন

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২৩:১৫ | আপডেট: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০৫:৫৮

পাকিস্তানের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনকে যদি পুরাকথার লখিন্দরের বাসরঘরের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে সম্ভবত ভুল হবে না। সবচেয়ে জনপ্রিয় দল ইমরান খানের পিটিআই তথা পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফকে নির্বাচনের বাইরে রাখার জন্য দেশটির সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন এমন কোনো চেষ্টা নেই যা বাদ রেখেছে। প্রথমে নির্বাচনটিই পিছিয়ে দেওয়া হলো– সংবিধান অনুসারে তা হওয়ার কথা ছিল গত নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে, শেষমেষ যা হলো গত ৮ ফেব্রুয়ারিতে। তারপর দলনেতা ইমরান খানসহ পিটিআইর প্রায় সব শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার করে নানা বায়বীয় মামলায় সাজা দিয়ে নির্বাচনে অযোগ্য করা হলো, ইমরানকে তো হাস্যকরভাবে তাঁর বিয়ের জন্যও সাজা দেওয়া হলো। এক অবিশ্বাস্য যুক্তি দিয়ে পিটিআইর জনপ্রিয় নির্বাচনী প্রতীক ক্রিকেট-ব্যাট কেড়ে নেওয়া হলো, যে কারণে দলের প্রার্থীরা সবাই স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করতে বাধ্য হন। পিটিআই প্রার্থীদের সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়া হলো, সংবাদমাধ্যমের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপিত হলো; এমনকি সাংবাদিকদের গুমের পাশাপাশি খুন করা হলো। নির্বাচনের দিন ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হলো এবং শেষে ভোট গণনায় অস্বাভাবিক বিলম্ব করার পাশাপাশি, পিটিআইর অভিযোগ অনুযায়ী, অনেক জায়গায় ভোটের ফলও পাল্টে দেওয়া হলো। 
এ বিষয়ে ডন ডটকমে যেমনটা বলা হয়েছে, পাকিস্তানি এক ডিজিটাল অধিকার কর্মী উসামা খিলজি তাঁর সামাজিক মাধ্যম এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, ‘…এরপরও নির্বাচনটিকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলতে হবে!’
বিস্ময়কর হলেও সত্য, অন্তত নির্বাচনটির ফল দেখে আপনাকে উসামার সঙ্গে আংশিক হলেও ভিন্নমত পোষণ করতে হবে। বার্তা সংস্থা এএফপি পাকিস্তানের জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ পাকিস্তানের নির্বাহী পরিচালক বিলাল জিলানিকে উদ্ধৃত করে লিখেছে, ‘সামরিক-বেসামরিক এস্টাবলিশমেন্টের উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা সত্ত্বেও একটা দল ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিসেবে পিটিআই তার ভোটব্যাংক ধরে রাখতে পেরেছে।’ তাঁর মতে, ‘এটা প্রমাণ করে সামরিক বাহিনী তাদের (পিটিআই) পথে সবসময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।’ আসলে সেনাবাহিনী পিটিআইকে মনসা দেবী জ্ঞান করে তাকে আটকানোর জন্য ঠিকই লখিন্দরের বাসরঘর তৈরির চেষ্টা করেছে। তবে সাধারণ ভোটাররা এতটাই তক্কে তক্কে ছিলেন যে, সামান্য ছিদ্রপথ পেয়েই তারা সে বাসরঘরে ঢুকে প্রায় দক্ষযজ্ঞ বাধিয়ে দেয়। আর তা সামাল দিতে ভোট গণনায়ও সৃষ্টিছাড়া যত কাণ্ড ঘটাতে হয়। পাকিস্তানের এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের খবর অনুসারে, পাকিস্তান নির্বাচন কমিশন বেলুচিস্তানে সকালে নিজেরই ঘোষিত ফল দুপুর নাগাদ পাল্টে দেয়; ফলে সেখানে প্রথমে পাস করা প্রার্থীদের বিক্ষোভ এখনও চলছে।

২০১৮ সালের নির্বাচনে পাকিস্তানের এস্টাবলিশমেন্টের প্রিয়পাত্র হিসেবে বিশেষ খাতির-যত্ন পেয়ে ক্ষমতায় এলেও ক্ষমতার রশি কার হাতে থাকবে– এ বিবাদে জড়িয়ে পিটিআই এক পর্যায়ে সেনা এস্টাবলিশমেন্টের চক্ষুশূল হয়ে যায়; এরই পরিণামে ২০২২ সালে সেনাসমর্থিত এক সাংবিধানিক ক্যুতে দলটি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। ফলে ইমরান খানকে ক্ষমতার ফিরতে বাধা দেওয়ার সব চেষ্টাই সেনাবাহিনী করেছে। সম্ভবত তারা ভেবেছিল, এত চাপাচাপির পর পিটিআই সমর্থকরা নিশ্চয় হতোদ্যম হয়ে পড়বে, তাই ভোটের দিন খুব বড়সড় কোনো জালিয়াতির প্রয়োজন বোধ করেনি তারা। তাছাড়া অন্তত বহির্বিশ্বের কাছে দেখানোর জন্যও ভোটদানে বাধাদানের পথে যায়নি তারা। এটাই ছিল পাকিস্তানের এস্টাবলিশমেন্টের তৈরি লখিন্দরের বাসরঘরের ছিদ্রপথ।

 ডন ডট কম পরিবেশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নামে পরিচিত সংসদের নিম্নকক্ষের মোট ২৬৬ আসনের মধ্যে ২৬৫টিতে নির্বাচন হয়, ফল ঘোষিত হয়েছে ২৫৩টির, যে কারণে সবচেয়ে বেশি ৯২ আসনে জয় পেয়েছেন পিটিআই-সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। সে হিসেবে পিটিআইকে এবারের নির্বাচনের একক বৃহত্তম দল বলা যায়। তবে তারাই  পাকিস্তানে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে, এমনটা বলা যায় না। 

কারণ দ্বিতীয় স্থানে ৭১ আসন নিয়ে আছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পিএমএল-এন, তৃতীয় স্থানে আছে একসময়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা এবং সামরিক শাসক জিয়াউল হকের ফাঁসির দণ্ডে প্রাণ হারানো জুলফিকার আলি ভুট্টো প্রতিষ্ঠিত পিপিপি– যার ঝুলিতে আছে ৫৪ আসন। তাছাড়া ক্ষমতায় থাকাকালে পিটিআইর সহযোগী এবং পরবর্তী সময়ে অনাস্থা ভোটে পিএমএল-এন ও পিপিপির সঙ্গী মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট (এমকিউএম) ১৭ আসনে জয়ী হয়েছে। জানা মতে, এ তিন দল মিলে জোট গঠনের প্রয়াস ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে; তেমনটা হলে এখনই এরা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ম্যাজিক ফিগার ১৩৪ অতিক্রম করেছে। তাছাড়া পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের মোট আসন ৩৩৬, যেখানে ৬০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত এবং ১০টি সংরক্ষিত সংখ্যালঘু প্রার্থীদের জন্য। সংরক্ষিত এ আসনগুলো পাওয়ার কথা শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর এবং বিরোধীরা যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ তাই বেশির ভাগ সংরক্ষিত আসন ওদের ঝুলিতে যাবে এটাই স্বাভাবিক। মনে রাখতে হবে, পিটিআইর সংসদ সদস্যরা এখন শুধুই স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য। সংরক্ষিত আসনে ভাগ পেতে তাদের সংসদে আসন পেয়েছে এমন কোনো একটা দলে ভিড়তে হবে। আবার তেমন পরিস্থিতিতে এ সংসদ সদস্যরা পিটিআই নন, ওই দলেরই পরিচয়ে পরিচিত হতে হবে। ফলে পিটিআইর ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন অনেক যদি-কিন্তুর ওপর নির্ভর করছে বললে ভুল হবে না।

আর সামরিক বাহিনীও কি চুপ করে থাকবে? প্রথমেই তারা পিটিআই-সমর্থিত সংসদ সদস্যদের তাদের পছন্দের দলে ভিড়তে চাপ দেবে– এমন কথা দেশটির প্রায় সব বিশ্লেষক মনে করেন। আর যে পিএমএল-এন, পিপিপি ও এমকিউএম এতদিন ইমরানকে ক্ষমতাচ্যুত করা থেকে নির্বাচনের প্রক্রিয়া ঠিক করা পর্যন্ত সেনাবাহিনীর সহযোগী ছিল, তারাও কিন্তু নিজ নিজ পছন্দের পথে চলতে পারবে না। এ প্রসঙ্গে নির্বাচন নিয়ে বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত দেশটির সেনাপ্রধান সৈয়দ আসিম মুনিরের বিবৃতিটির কথা বলা যায়। একটা গণতান্ত্রিক দেশে সেনাপ্রধান সরকারের অধীন একজন কর্মকর্তা হওয়ার কথা থাকলেও, পাকিস্তানি সেনাপ্রধানের বিবৃতিটি বেশ ব্যতিক্রম। মনে হয়, তিনি যেন গণতন্ত্র কোন পথে ‘কার্যকর ও উদ্দেশ্যমুখীন’ করা যাবে তা রাজনৈতিক নেতাদের চিনিয়ে দিচ্ছেন।

আসিম মুনির বলেছেন, ‘নৈরাজ্য এবং মেরূকরণের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে জাতির প্রয়োজন স্থিতিশীল হাত এবং নিরাময়মূলক স্পর্শ।’ তাঁর মতে, ‘রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং তাদের কর্মীদের হীনস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের শাসন ও সেবা করার প্রচেষ্টায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত, যা গণতন্ত্রকে কার্যকরী এবং উদ্দেশ্যমুখীন করার একমাত্র উপায়।’
বিশেষত নওয়াজ শরিফ, বিলাওয়াল ভুট্টো এবং তাদের সহযোগীদের প্রতি আসিম মুনিরের বার্তাটি স্পষ্ট– একসঙ্গে বসুন এবং সরকার গঠন করুন।

সর্বশেষ খবরে জানা যায়, এক সন্ত্রাসবিরোধী আদালত ইমরানকে ১২টি মামলায় জামিন দিয়েছেন, যদিও তাঁর বিরুদ্ধে আরও বহু মামলা রুজু আছে। ফলে বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইতরবিশেষ ঘটবে বলে মনে হয় না। তবে এ আশঙ্কা অমূলক নয় যে, নির্বাচনে উঠে আসা জনগণের বার্তা উপেক্ষিত হলে রাজনীতিতে বিশৃঙ্খলা থেকেই যাবে, যা দেশটির টালমাটাল অর্থনীতিকে আরও টালমাটাল করে দেবে। এ কথাও বলা যায়, নির্বাচনে পাকিস্তানের জনগণ যেভাবে দেশ পরিচালনায় সেনা কর্তৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করেছেন তা এখানেই থেমে যাবে না, গণতন্ত্রের সূর্য সেখানে উঁকি দেবেই।

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী
সম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×