ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

সরকারি হাসপাতালগুলিতে ‘স্বরাজ’ চলিবেই!

সরকারি হাসপাতালগুলিতে ‘স্বরাজ’ চলিবেই!

.

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০০:০৩ | আপডেট: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০৫:৩১

যেক্ষণে সরকারের নবনিযুক্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রী ‘বিদেশিরাও মেডিকেল ভিসায় দলে দলে বাংলাদেশে চিকিৎসা নিতে আসবে’ বলিয়া আশাবাদ প্রকাশ করিয়াছেন, সমকাল জানাইতেছে সেক্ষণেই দেশের বেশ কিছু সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করিয়া দেখা গিয়াছে যে, হাসপাতালে অনুপস্থিত থাকেন ৪৬ শতাংশ চিকিৎসক-কর্মকর্তা। সমকালের প্রতিবেদকেরা দেশের বিভিন্ন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালে সরেজমিন অনুসন্ধান করিয়া যে চিত্র পাইয়াছেন, তাহা আশাবাদের সাক্ষাৎ বিপরীত। বর্তমানে বিদেশি দূরস্থান স্বদেশীয়রাই দলে দলে মেডিকেল ভিসায় নিকটবর্তী ভারত এবং কিঞ্চিৎ দূরবর্তী সিঙ্গাপুর-থাইল্যান্ড গমন করিতেছেন। ৫৩ বৎসর পূর্বে যে দেশ স্বাধীনতার গৌরব পাইয়াছে, সেই দেশের সাধারণ মানুষ অর্ধশতকের অপেক্ষার পরও স্বীয় দেশে সুচিকিৎসা হইতে বঞ্চিত থাকিতেছেন। 

সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার এই যখন হাল, তখন স্বাস্থ্যসেবার বেসরকারি বাজার রমরমা চলিতেছে। তাহাতে অবস্থাপন্নরা অন্তত এই সান্ত্বনা পাইতেছেন যে, বিনা চিকিৎসায় স্বজনকে মরিতে দেন নাই। সরকারও বলিতে পারিবে, মানুষ মরিতেছে তো কী চিকিৎসালয়েই মরিয়াছে, বিনা চিকিৎসায় তো মরে নাই! অথচ গবেষণা জরিপ দেখাইতেছে, চিকিৎসা ব্যয় মিটাইতে গিয়া মানুষ দরিদ্র হইয়া পড়িতেছে। পরিসংখ্যান বলিতেছে, ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ সালে স্বাস্থ্য ব্যয়ে সরকারের অংশ ছিল যথাক্রমে ২৮, ২৬ ও ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ সরকারের অংশ ক্রমান্বয়ে কমিতেছে। আবার উক্ত বৎসরগুলিতে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় ছিল যথাক্রমে ৬৪, ৬৬ ও ৬৯ শতাংশ। অর্থাৎ চিকিৎসা করাইতে গিয়া ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় বাড়িয়াছে। এই হিসাবে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬৯ শতাংশ ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয়। এই কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাহাদের এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলিয়াছিল, বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয় মিটাইতে গিয়া ২৪ শতাংশ মানুষ বিপর্যয়মূলক ব্যয়ের মধ্যে পড়িতেছেন। চিকিৎসা করাইতে গিয়া প্রতিবৎসর ৬২ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলিয়া যাইতেছে এবং ব্যয় বৃদ্ধি পাইবার কারণে ১৬ শতাংশ খানা চিকিৎসা লওয়া হইতে বিরত থাকে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার এই হাল বজায় থাকিলে দারিদ্র্য বিমোচন কস্মিনকালেও সম্পন্ন হইবার কথা না।
সমকালের সরেজমিন প্রতিবেদন স্বাস্থ্য প্রশাসনে যে যথেচ্ছাচার চলে তাহার সাক্ষ্য হাজির করিয়াছে মাত্র। কিন্তু এই ক্ষেত্রে চিকিৎসকগণের পদায়ন, বদলি এবং কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকিবার ‘স্বরাজ’ চলে তাহার পৃষ্ঠপোষণা আসিয়া থাকে দুর্নীতির মাধ্যমে। তথায় হস্ত না দিলে সকলই গরল ভেল হইতে বাধ্য। 

অন্যদিকে চিকিৎসকগণেরও নিজস্ব দুঃখের বিরাট ফর্দ রহিয়াছে। যেখানে ঢাকায় থাকা মানে সন্তানের ভালো শিক্ষা, পরিবারের ভালো চিকিৎসা এবং জীবন উপভোগ ও ক্যারিয়ারের পথগুলি সুগম থাকা, সেখানে ভালো চিকিৎসকগণ মফস্বলে পড়িয়া থাকিবেন কোন দুঃখে। শুধু ক্যারিয়ারই নহে, ভালো চিকিৎসকগণের গবেষণা ও পেশাগত মান বৃদ্ধির সুযোগ ঢাকার জাতীয় বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে যতটা রহিয়াছে, অন্যত্র তাহা একদমই সুলভ নহে। এই বঞ্চনার প্রতিকারে তাহাদের কেহ কেহ অনিয়ম ও গাফিলতির আশ্রয় লইয়া থাকেন। তাহা ছাড়া রহিয়াছে রাজনৈতিক প্রভাবের খেলা। এই খেলায় যিনি যত বড় খেলোয়াড় তাঁহার জবাবদিহি ততই কম।

সরকারি হাসপাতালগুলিতে ঘুরিলে মানুষের হাহাকার, কান্না, প্রতিবাদে হৃদয় বিচলিত হইবার কথা। কিন্তু নীতিনির্ধারকগণের হৃদয় সম্ভবত কঠিন পদার্থ 
দিয়া তৈরি।
 

আরও পড়ুন

×