ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

সড়ক পরিবহনে নৈরাজ্যের উৎস

সড়ক পরিবহনে নৈরাজ্যের উৎস

প্রতীকী ছবি

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৪ | ০৪:২০

সড়ক পরিবহন খাতে বিশেষত ঘুষ লেনদেন ও চাঁদাবাজির ব্যাপকতা বরাবরই আলোচিত বিষয়। কিন্তু সেই ব্যাপকতার মাত্রা কতটা হইতে পারে? মঙ্গলবার রাজধানীর এক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশিত দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির এক গবেষণার ফলকে উদ্ধৃত করিয়া বুধবার সমকাল জানাইয়াছে, দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস হইতে বৎসরে সহস্রাধিক কোটি টাকা ঘুষ ও চাঁদারূপে আদায় হয়।

যাত্রী অধিকারবিষয়ক বেসরকারি সংগঠন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব বলিয়াছেন, বাস ব্যবসায় ঘুষ ও চাঁদাবাজির সামান্য অংশই টিআইবির গবেষণায় প্রতিফলিত। তাঁহার মতে, বৎসরে ৪-৫ সহস্র কোটি টাকার চাঁদা ও ঘুষ আদায় হয়। লক্ষণীয়, টিআইবি বা যাত্রী কল্যাণ সমিতি প্রদত্ত ঘুষ-চাঁদাবাজির হিসাব শুধু বাস খাতের। ট্রাক এবং সড়ক-মহাসড়কে সচল অন্যান্য হালকা ও ভারী যান হইতে আদায়কৃত ঘুষ-চাঁদা যুক্ত করিলে অঙ্কটা নিঃসন্দেহে গগন স্পর্শ করিবে।

টিআইবি বলিয়াছে, বাস মালিকগণ বাসের ফিটনেস ও অন্যান্য কাগজ হালনাগাদ করিতে গিয়া বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআরটিএর ঘরে বৎসরে সাড়ে নয়শত কোটির অধিক টাকা ঘুষ দেন এবং বৈধ-অবৈধ মামলা পরিহারে হাইওয়ে ও ট্রাফিক পুলিশকে দেন সাড়ে ৮৭ কোটির অধিক টাকা। ব্যাখ্যা করার কী প্রয়োজন– কেন দশকের পর দশক সড়কে নৈরাজ্য চলমান, যাহার প্রধান মাশুল গুনিতেছেন বিশেষত যাত্রীসাধারণ সড়ক দুর্ঘটনায় কাতারে কাতারে হতাহত হইয়া। ঘুষ-চাঁদারূপী এই বিপুল অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ মালিকগণ যে যাত্রীদিগের নিকট হইতেই আদায় করেন, উহাও কি অস্বীকার্য? চলমান অসহনীয় মূল্যস্ফীতিতেও যে বিশেষত পণ্যবাহী পরিবহনে চাঁদাবাজি অগ্নিতে ঘৃতাহুতিসম ভূমিকা রাখিতেছে, উহা আমরা জানি। উল্লেখ্য, টিআইবির মতে, বাস হইতে মালিক ও শ্রমিক সংগঠন বৎসরে চাঁদা আদায় করে প্রায় ১৩ কোটি টাকা এবং সিটি করপোরেশন, পৌরসভার ইজারাদাররা পার্কিং ইজারার নামে অবৈধভাবে আদায় করে প্রায় সাড়ে ৩৩ কোটি টাকা। 

তবে দুর্ভাগ্যজনক, সড়ক পরিবহনে এহেন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাসমূহ বরাবর অস্বীকার করিয়াছে। বিভিন্ন বাস টার্মিনালে স্বীয় প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি পরিবহন মালিক, শ্রমিক, যাত্রী এমনকি বিআরটিএ ও পুলিশ প্রতিনিধিদিগের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে টিআইবির প্রতিবেদনটি প্রণীত হইলেও, ঘুষ-চাঁদাবাজির দায়ে অভিযুক্ত পক্ষসমূহ অস্বীকারের একই ধারা অব্যাহত রাখিয়াছে। আমরা মনে করি, টিআইবি যথার্থই বলিয়াছে– ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের আশীর্বাদপুষ্ট মালিক-শ্রমিক সংগঠন ও সিন্ডিকেটের হস্তে পরিবহন খাত জিম্মি, যে কারণে সচেতন নাগরিকদিগের পুনঃপুন দাবি সত্ত্বেও সড়ক পরিবহন খাতের নৈরাজ্য বন্ধে অদ্যাবধি কার্যকর কোনো সরকারি তৎপরতা পরিলক্ষিত হইতেছে না।

অনস্বীকার্য, অন্য বহু সমস্যার ন্যায় এই সমস্যাও রজনীকালেই সৃষ্ট হয় নাই। তবে নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী বর্তমান সরকার সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাই আলোচ্য খাতে শুদ্ধাচার নিশ্চিতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ প্রত্যাশিত।

আরও পড়ুন

×