ঢাকা বুধবার, ২২ মে ২০২৪

সমাজ

অভিভাবকত্ব নিয়ে আইনি লড়াই

অভিভাবকত্ব নিয়ে আইনি লড়াই

ড. কাজী ছাইদুল হালিম

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২:০০

বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঢাকার আদালতপাড়ায় বহুল আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে ইমরান-নাকানো দম্পতির কন্যাসন্তানদের অভিভাবকত্ব নিয়ে ওঠা বিরোধ বা বিতর্ক সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। দেশে এবং দেশের বাইরে অনেক মানুষ কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করছে এই অভিভাবকত্ব বিরোধের শেষ সমাধান দেখার জন্য। সবার প্রত্যাশা, ইমরান-নাকানো দম্পতি একটি সমাধানে উপনীত হবেন, যাতে তাদের কন্যারা আদর-ভালোবাসায় পিতামাতার সান্নিধ্যে থেকে বেড়ে উঠতে পারে। ইমরান-নাকানো দম্পতির বাস্তবতা একেবারে অন্যরকম। তারা উভয়ে দুটি ভিন্ন দেশে, দুটি ভিন্ন সংস্কৃতিতে জন্ম হওয়া এবং বেড়ে ওঠা দু'জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। তিন কন্যাসন্তানের অভিভাবক। আমাদের দেশে একটা কথা প্রচলিত আছে- 'কন্যাসন্তানের অভিভাবকদের একটু বেশি দায়িত্ববান হতে হয়।' অভিভাবক হিসেবে ইমরান-নাকানো দম্পতির কাছেও সবার প্রত্যাশা এমনটাই।
তবে দুই (বাস্তবে তিনটি) কন্যাসন্তানকে নিয়ে তাদের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি, অবস্থান এবং দাবি সম্পূর্ণরূপে বিপরীতমুখী এবং একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ জন্যই উভয়কে আইনের আশ্রয় নিতে হয়েছে। ইমরান-নাকানো দম্পতির বিয়েবিচ্ছেদ জাপানে প্রক্রিয়াধীন। এমতাবস্থায় পিতা ইমরান শরীফ তার কনিষ্ঠ কন্যাকে মায়ের কাছে রেখে ১০ এবং ১১ বছর বয়সের দুই কিশোরী কন্যাকে নিয়ে বাংলাদেশে আসেন। পিতা ইমরান চান দুই কিশোরী কন্যাকে বাংলাদেশে তার কাছে রেখে লালন-পালন করতে। যে বিষয়টি অনেকের হৃদয় কেড়েছে তা হলো, এই কন্যাদের আর্জি তাদের বাবা ইমরান শরীফের সঙ্গে বাংলাদেশে থেকে যাওয়া। অপর পক্ষে মা নাকানো দুই কন্যাকে নিয়ে জাপানে ফিরতে চান। আপাতত মনে হচ্ছে, এ দুই মৌলিক দাবি থেকে কেউ কাউকে একবিন্দুও ছাড় দিতে চাচ্ছেন না।
সবার প্রশ্ন উঠতে পারে, বাবার সঙ্গে কন্যাদের এমন গভীর বন্ধন হলো কীভাবে? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে জাপানের কর্মসংস্কৃতির দিকে আলোকপাত করতে হবে। জাপানিরা কর্মে আসক্ত জাতি। অনেকে সেখানে কাজ করতে করতে গভীর রাতে বাসায় ফিরে অথবা কর্মস্থলে ঘুমিয়ে পড়ে। স্বামীর জন্য স্ত্রীর সময়, স্ত্রীর জন্য স্বামীর সময় বা অভিভাবকদের সময় সন্তানদের জন্য অপ্রতুল। কর্মে আসক্তির ফলে পারিবারিক বন্ধন জাপানে হুমকির মুখে। এমতাবস্থায় হয়তো সন্তানদের দেওয়া নৈকট্য, সময়, সহানুভূতি, আবেগ, আদর-ভালোবাসা পিতা ইমরানের এবং তার মেয়েদের মাঝে দৃঢ় বন্ধনের সৃষ্টি করেছে। আর কর্মে আসক্তির কারণে হয়তো মা নাকানোর সঙ্গে সন্তানদের সৃষ্টি হয়েছে দূরত্বের। অধিকন্তু, পরিবার- বাংলাদেশ সমাজ এবং সংস্কৃতির মৌলিক একক। এখানে পরিবারের সদস্যদের একে অপরের প্রতি যে টান, মায়া, সমর্থন এবং সহানুভূতি তা অনেক বিদেশিকেই আকর্ষণ করে। হয়তো ইমরান-নাকানো দম্পতির সন্তানরা এজন্যই বাংলাদেশের পারিবারিক বন্ধন থেকে চলে যেতে চাচ্ছে না। আবার এমনও হতে পারে, মেয়েরা মনে করছে বাবার কাছেই তারা অন্য যে কারও চাইতে বেশি নিরাপদ। ব্যক্তিগত মতপার্থক্য, ভিন্ন সংস্কৃতি, ধর্মের ভিন্নতা, সন্তান লালন-পালনের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে দুই সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে বিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিচ্ছেদের মাধ্যমে পরিসমাপ্তি ঘটে। এরপর শুরু হয় সন্তানদের লালন-পালন নিয়ে বোঝাপড়া। অনেক সময় দেখা যায়, অভিভাবকরা কোনো রকম বাহ্যিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজেরা মিলে বিয়ে বিচ্ছেদ-পরবর্তী সন্তানদের লালন-পালনের বিষয়টা সমাধান করে ফেলেন। আবার অনেক ক্ষেত্রেই বাহ্যিক বা আইনগত হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়, যা লক্ষ্য করা যাচ্ছে ইমরান-নাকানো দম্পতির ক্ষেত্রে।
এক সময় একটা ধারণা বদ্ধমূল ছিল, বিয়ে বিচ্ছেদের পর সন্তানরা মায়ের কাছে যাবে। সময়ের প্রবাহে এমন ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, একজন পিতা সন্তান লালন-পালনে মায়ের চেয়ে কোনো অংশেই কম না। বিয়ে বিচ্ছেদ নেওয়া অভিভাবকদের সন্তান যদি ১০ বা তার অধিক বছর বয়সের হয়ে থাকে, তাহলে তাদেরও মতামত নেওয়ার প্রয়োজন আছে। অভিভাবকত্ব বিষয়ে তাদেরও জিজ্ঞেস করা প্রয়োজন মনে করি। এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। ১০ বছর বয়সে মানুষের মস্তিস্কের নমনীয়তা স্বাভাবিক রূপ ধারণ করে। এ বয়সে একজন মানুষ বেশকিছু সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে বা সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নিজস্ব মতামত দিতে পারে। ইমরান-নাকানো দম্পতির সন্তানরা বাংলাদেশে পিতার কাছে থাকবে, না তারা মায়ের সঙ্গে জাপানে চলে যাবে, এর জন্য আমাদের তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে সামনের দিনগুলোর দিকে। তারা জাপান বা বাংলাদেশ যেখানেই থাকুক, সুন্দরভাবে বেড়ে উঠুক- আমাদের প্রত্যাশা এটিই।
শিক্ষক ও গবেষক

আরও পড়ুন

×