ঢাকা বুধবার, ২২ মে ২০২৪

সমকালীন প্রসঙ্গ

সম্ভাবনার ই-কমার্সে সুশাসন সর্বাগ্রে

সম্ভাবনার ই-কমার্সে সুশাসন সর্বাগ্রে

আহসান এইচ মনসুর

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২:০০

অনেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, প্রথম দিকে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ব্যাপক লোকসান করতে। এরপর বিক্রি বাড়িয়ে ভালো রকমের ব্যবসা করে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে। অ্যামাজন এই ধরনের বিজনেস মডেল ফলো করে। কিন্তু তারা চায় গ্রাহকরা যেন তাদের ওপর সন্তুষ্ট থাকে। কোনো প্রতিষ্ঠানের এই ধরনের লোকসানের ইচ্ছা থাকলে তাদের পুনরায় বিনিয়োগ করার মতো প্রচুর অর্থের জোগান থাকতে হয়। কিন্তু ইভ্যালি বা আলোচিত অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসার মডেল টেকসই নয়। তাদের মূল্যছাড়ের প্রলোভনে প্রথমে অল্প কিছুসংখ্যক ক্রেতা এসেছে। এসব ক্রেতার প্রচারণার ফলে পরে আরও ক্রেতা এসেছে। এভাবে অনেক ক্রেতা তাদের আগাম টাকা দিয়েছে। একপর্যায়ে তারা আর নতুন ক্রেতা পায়নি। ফলে পণ্য সরবরাহে সময় বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। কিন্তু এভাবে বেশিদিন টিকে থাকা যায় না। এ গতিতে চলতে গেলে হয় নতুন ক্রেতা আসতে হবে, নতুবা বিনিয়োগকারী আসতে হবে। এর কোনোটা না এলে শেষের দিকে যারা টাকা দিয়েছে তারা লোকসানে পড়েছে। আসলে ই-কমার্স কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা ব্যবসার মডেলে। কে কীভাবে করছে, তা নিয়ে।
সারাবিশ্বে যখন ই-কমার্স সেক্টর বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, তখন আমাদের দেশে ই-কমার্স মুখ থুবড়ে পড়েছে মূলত দুর্বল ব্যবসায়িক মডেল এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার যথাযথ পর্যবেক্ষণ না থাকার কারণে। আমাদের দেশে ই-কমার্সের সঙ্গে কিছু নেতিবাচক কর্মকাণ্ড জুড়ে আছে। পণ্যের মূল্যে অতিরিক্ত ছাড় দিয়ে গ্রাহককে প্রলুব্ধ করা, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ না করা, কাঙ্ক্ষিত পণ্যের পরিবর্তে গ্রাহকের কাছে অন্য পণ্য সরবরাহ, নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ- এ জাতীয় কর্মকাণ্ডের কারণে ই-কমার্সের ওপর আস্থাশীল হচ্ছে না গ্রাহক।
সাম্প্রতিক সময়ে গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে বেশ কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সরকার। গত ২৩ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আরও ১০টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান একদিকে অতিরিক্ত ছাড় দিয়ে মানুষকে প্রলুব্ধ করে প্রচুর টাকা নিয়েছে। অন্যদিকে সরবরাহকারীদের কাছ থেকেও বাকিতে পণ্য সংগ্রহ করেছে। কিন্তু এখন তাদের অনেকের কাছে ক্রেতা ও সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধ করার মতো পর্যাপ্ত পণ্য বা টাকা নেই। ফলে বিপুলসংখ্যক ক্রেতা ও সরবরাহকারীর পাওনা নিয়ে অনিশ্চয়তার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা ক্রেতা ও সরবরাহকারীর টাকা নিয়ে বিদেশে চলে গেছেন।
এ জাতীয় ঘটনা পুরো ই-কমার্স খাতে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। মূলত সমন্বয়হীনতার কারণে ই-কমার্সে সংকট তৈরি হয়েছে। আমাদের দেশে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারি নেই বললেই চলে। প্রতিষ্ঠানগুলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থেকে যে যার মতো করে ব্যবসা পরিচালনা করছে। অধিক লাভের নানা প্রলোভন মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে। ফলে এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। মূলত সরকারি সংস্থাগুলোর দায়িত্বে অবহেলার কারণেই দেশে অসাধু ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম মাথাচাড়া দিয়েছে।
আমাদের দেশে ই-কমার্স একটা নতুন খাত। এখনও শুরুর দিকেই অবস্থান করছে। সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অধীনে এ খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো জরুরি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে যাবতীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এখন পর্যন্ত যে অর্থ লোপাট হয়েছে, তা উদ্ধারে সংশ্নিষ্টদের দায়িত্ব নিতে হবে। পরিকল্পনায় নতুনত্ব আনতে হবে। ই-কমার্সের মতো এত বড় একটি শিল্পের ওপর নজর রাখার জন্য শুধু একটি সেল গঠনই যথেষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) বা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর মতো একটি রেগুলেটরি কমিশন থাকা দরকার। এই কমিশনের কাজ হবে রেজিস্ট্রেশন, অভিযোগ ও অনুসন্ধান, নীতিমালা প্রণয়ন প্রভৃতি। এই কমিশন বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য করে নীতিমালা প্রণয়ন করবে। সার্বিকভাবে এই কমিশন ই-কমার্স খাতে সুষ্ঠু পরিচালনা নিশ্চিত করার কাজে নিয়োজিত থাকবে।

সারাবিশ্বেই ই-কমার্স একটি সম্ভাবনাময় খাত। বিভিন্ন দেশে এ খাতের উদ্যোক্তারা সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে। সেখানে গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা কিংবা অর্থ আত্মসাতের খুব বেশি উদাহরণ নেই। কাজেই আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। আগামীর জন্য নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে। প্রতিটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত কোম্পানি হতে হবে। তাদের জবাবদিহির ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রাহকের অভিযোগ করার সুযোগ রাখতে হবে। নজরদারি বাড়াতে হবে, যেন কোনো প্রতারণা কিংবা অর্থ লোপাটের ঘটনা না ঘটে। সেই সঙ্গে গ্রাহক হয়রানির অন্যান্য বিষয় যেমন, একধরনের পণ্য দেখিয়ে অন্য ধরনের পণ্য সরবরাহ করা; নকল পণ্য দেওয়া বা পণ্যের মান ভালো না হওয়া; সঠিক সময়ে সরবরাহ না করা ইত্যাদি অভিযোগও নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতে আস্থার জায়গা ধরে রাখতে নীতিমালা ও নির্দেশিকা জারি করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। নতুন নির্দেশিকায় পণ্য সরবরাহ ও রিফান্ড দেওয়ার সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ও ক্রেতা একই শহরে অবস্থান করলে পাঁচ দিনের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে হবে। ভিন্ন শহরে অবস্থান করলে ১০ দিনের মধ্যে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। স্টকে পণ্য না থাকলে সেটার কোনো পেমেন্ট গ্রহণ করা যাবে না। আগাম পরিশোধ করা টাকা পণ্য সরবরাহের পরই বিক্রেতার অ্যাকাউন্টে জমা হবে। ক্রেতার অগ্রিম মূল্য পরিশোধের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পণ্যটি ডেলিভারিম্যান বা ডেলিভারি সংস্থার কাছে হস্তান্তর করে তা টেলিফোন, ই-মেইল বা এসএমএসের মাধ্যমে জানাবে ই-কমার্স কোম্পানিগুলো। পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ডেলিভারিম্যান পণ্যটি ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেবে। আর সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পণ্য বা সেবা ডেলিভারিম্যানের কাছে হস্তান্তর করার মতো অবস্থায় না থাকলে ই-কমার্স কোম্পানি পণ্যমূল্যের ১০ শতাংশের বেশি অর্থ অগ্রিম নিতে পারবে না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এ নির্দেশিকা এখন পর্যন্ত কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে। এর বাস্তবায়ন জরুরি। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নির্দেশিকা অমান্য করার অভিযোগ এলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। কেউ যেন কোনো ফাঁকফোকরের সুযোগ নিতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
সম্ভাবনাময় ই-কমার্স খাত আমাদের দেশে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে করোনার সময়ে সবার প্রয়োজনবোধ থেকেই ই-কমার্সের বেশি প্রসার ঘটেছে। সাধারণ মানুষ চাল-ডাল থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক পণ্য, গাড়ি, মোটরসাইকেল কিনতেও এই ই-কমার্স সাইটগুলোর ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছেন। বাজার ধরতে বড় বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ছোটখাটো দোকানপাটও চালু করেছে অনলাইন ব্যবসা। ক্রমেই এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে, নতুন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। কাজেই এ খাতকে যেন আমরা নষ্ট হতে না দিই। যারা বিভিন্ন সময়ে গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে এ খাতে মানুষের আস্থা ফিরবে না। পাশাপাশি গ্রাহকদের সচেতন থাকতে হবে। চটকদার বিজ্ঞাপন, মূল্যছাড় ও প্রতিশ্রুতিতে আকৃষ্ট না হয়ে বাজারদর বিবেচনা করে অগ্রসর হতে হবে। গ্রাহকরা সচেতন হলে প্রতারণা অনেকাংশে কমে আসবে।
নির্বাহী পরিচালক, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট

আরও পড়ুন

×