ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪

সমকালীন প্রসঙ্গ

টিকা-বৈষম্য দূর করতেই হবে

টিকা-বৈষম্য দূর করতেই হবে

ডা. মুশতাক হোসেন

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২:০০

প্রায় গোটা বিশ্ব করোনা মহামারির যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ধারণ করে আছে এর বাইরে আমরাও নই। জনক্ষয় তো হয়েছেই, এখনও হচ্ছে। কিন্তু এর পাশাপাশি এই মহামারির নানামুখী অভিঘাতের ক্ষত রয়ে গেছে সর্বত্রই। সহজে শুকাবে না এই ক্ষত। এই অবস্থায় করোনা-উত্তর পরিস্থিতি ও এর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক পরিসরে কর্মপরিকল্পনা জরুরি। এই বাস্তবতার আলোকেই ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশনে ভাষণদানকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে এবং দিকনির্দেশনামূলক প্রস্তাবনা আকারে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। তিনি বৈশ্বিক সংহতি ও সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে যে আলোকপাত করেছেন, তা সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
এত বড় মহামারির পরও করোনা প্রতিরোধে টিকা-বৈষম্য জিইয়ে রাখছে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যে দাবি উত্থাপন করেছেন, তা নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক দাবি। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে তিনি নেতৃত্বমূলক অবস্থান নিয়েই কথাগুলো বলেছেন। একই সঙ্গে অধিকারের ও কল্যাণের পক্ষে আমাদের অবস্থানও স্পষ্ট করলেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই বিষয়টি নিয়ে লড়াই করছে যে, করোনার টিকা উৎপাদনে যেসব দেশের সক্ষমতা রয়েছে তাতে সমগ্র বিশ্ববাসীকে টিকার আওতায় আনা কাঙ্ক্ষিত সময়ের মধ্যে সম্ভব নয়। এ রকম মহামারির সময় আগে থেকেই একটি চুক্তি আছে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রতিষেধক উৎপাদনের পথ খুলে দেওয়া। স্বল্পমূল্য ওষুধ, টিকা, মেডিকেল সামগ্রীসহ আনুষঙ্গিক সবকিছু প্রাপ্তির পথ সহজ করা।
কিন্তু বিস্ময়কর হলো, করোনার মতো এত বড় দুর্যোগেও তারা অর্থাৎ উৎপাদক দেশগুলো প্রতিশ্রুতি-অঙ্গীকার ভঙ্গ করে বাণিজ্যচিন্তা একচেটিয়া করে ফেলেছে। এমন পরিস্থিতিতে সব উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশের পক্ষে কণ্ঠ মিলিয়ে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যে বিষয়টি তুলে ধরেছেন তা সাধুবাদযোগ্য। করোনা মহামারি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করবে যদি এই দাবি আদায় হয়। দাবি উত্থাপিত হয়েছে এবং এখন দায়িত্ব হলো, একজোট হয়ে তা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। যূথবদ্ধভাবে চাপ সৃষ্টি করা উচিত, তারা যেন তা মানতে বাধ্য হয়। আমরা যদি বর্তমান বিশ্ব-বাস্তবতায় ভাবি তাহলে যূথবদ্ধভাবেই নতুন নতুন অংশীদারিত্ব, সহযোগিতার ক্ষেত্র, সমস্যা সমাধানের সড়ক তৈরি করতে হবে। জাতিসংঘ এ ক্ষেত্রে আরও জোরালো অবস্থান নেবে তাও তাদের প্রত্যাশিত। টিকা উৎপাদনে প্রযুক্তি সহায়তা ও মেধাস্বত্ব উন্মুক্তকরণের মধ্য দিয়েই বিদ্যমান টিকা-বৈষম্য নিরসনের পথটা মসৃণ করা সম্ভব। কাজেই বড় শক্তিগুলোর বোধোদয় জরুরি।
কয়েকটি শক্তিশালী দেশ এ ব্যাপারে অনেকটা ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করলেও অন্য শক্তিশালী কয়েকটি দেশের ওজর-আপত্তি রয়েছে। এ ব্যাপারে তারা যেসব যুক্তি দেখাচ্ছে তা অত্যন্ত খোঁড়া এবং বিদ্যমান বাস্তবতায় অমানবিকও বটে। যদি প্রযুক্তি সহায়তা পাওয়া যায় এবং মেধাস্বত্ব উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, তাহলে অনেক দেশই প্রস্তুতি সম্পন্ন করে টিকা উৎপাদনে এগোতে পারবে যার যার সাধ্যমতো। যেমন, আমরা যদি বিশাল আকারে উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নাও পারি, যেটুকুই করতে পারব তাও বা কম কিসের। এখন আমরা বাইরে থেকে যে টিকা পাচ্ছি বা সংগ্রহ করতে সক্ষম হচ্ছি, এর চেয়ে তো কয়েক গুণ বেশি টিকা নিশ্চিত করা যাবে। যদি এমন হয়- আমাদের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন বেশি করা সম্ভব হয়েছে, তাহলে অন্যের দিকে আমরাও বাড়াতে পারব সহযোগিতার হাত।

আর যদি সবার সহযোগিতা থাকে একই সঙ্গে যদি থাকে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার, তাহলে এই ব্যবস্থার পথ মসৃণ করা কঠিন নয়। আমরা যখন করোনার পরীক্ষা শুরু করি তখন তা ছিল একেবারেই গণ্ডিবদ্ধ, তারপর বেড়ে হলো কয়েকটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র। আর এখন আটশর মতো কেন্দ্রে এই পরীক্ষা হচ্ছে। এ থেকে আমরা খুব সহজেই বুঝতে পারি, সহযোগিতা, পরিকল্পনা, সদিচ্ছার সমন্বয়ে অনেক কঠিন কাজই সহজ করা সম্ভব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও। যদি প্রযুক্তি সহায়তা আমরা পাই ও মেধাস্বত্ব উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের যেটুকু সক্ষমতা রয়েছে, তাতে আমরা আশান্বিত হতেই পারি। সরকারি পর্যায়ে ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে কাজ শুরু হয়ে গেছে। আশা করা যায়, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে অনেক কিছুই দৃশ্যমান হবে। বেসরকারি পর্যায়েও আমাদের সক্ষমতা আছে। কাজেই যারা অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি ভুলে তাদের মস্তিস্কে একচেটিয়া বাণিজ্যের চিন্তা চাষ করছে, তা থেকে সরে আসতে হবে।
কোনো কোনো উৎপাদক দেশ বলছে, প্রযুক্তি সহায়তা ও মেধাস্বত্ব ছাড় দিলে এই টিকা নকল হয়ে যাবে। তাদের এই বক্তব্যও অত্যন্ত খোঁড়া যুক্তি। নকল কি অন্যান্য ওষুধ হচ্ছে না? উন্নত রাষ্ট্রেও কি নকল ওষুধের সন্ধান মেলেনি? তবে এই অপপ্রক্রিয়া যাতে কেউ না চালাতে পারে এ ব্যাপারে প্রত্যেকটি দেশকে বলিষ্ঠ অবস্থান নিতে হবে। অভ্যন্তরে তো বটেই, বাইরে থেকেও এ ব্যাপারে সতর্ক-সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। যেসব রাষ্ট্র এমন কথা বলছে, তারা যদি টিকা একা উৎপাদন করে কিংবা অন্য দেশের সঙ্গে যৌথভাবে উৎপাদন করে, তাহলেও এক কথাই। তবে যখন উৎপাদনের পরিসর বাড়বে, তখন নজরদারির পরিসর কিংবা ব্যবস্থার দিকেও সমগুরুত্ব দিয়েই দৃষ্টি দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী করোনার টিকার ন্যায়সংগত মূল্যেরও ফের তাগিদ দিয়েছেন তার ভাষণে। এর রূপরেখা কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক দেওয়া আছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর স্তরও নির্ধারণ করেছে। কোনো দেশ পাবে বিনামূল্যে, কেউ পাবে স্বল্পমূল্যে। যাদের সামর্থ্য আছে তারা উচ্চমূল্যে কিনবে। বিশ্বব্যাংকের নির্ধারিত ক্যাটাগরি অনুযায়ী উন্নত, উন্নয়নশীল, স্বল্পোন্নত কিংবা অনুন্নত দেশ- এ অনুযায়ীই মূল্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের ব্যত্যয় ঘটছে। আন্তর্জাতিক চাপ এ ব্যাপারে সেইভাবে সৃষ্টি না হওয়ায় মুনাফা যাদের লোটার সুযোগ রয়েছে, তারা সেই সুযোগ নিচ্ছে। এমতাবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাবও নতুন করে সামনে এলো এবং এ জন্য ভুক্তভোগী দেশগুলোর এক কাতারভুক্ত হওয়া জরুরি। নতুন কিংবা পুরোনো বলে কথা নেই, যে কোনো উদ্ভাবনের মান যাতে বজায় থাকে তাতে সচেষ্ট থাকতে হবে সবাইকে। আমাদের যেমন এ ব্যাপারে আইন আছে, অন্যদেরও আছে। তারা এও বলেছে, মেধাস্বত্ব উন্মুক্ত করে দিলে টিকা উৎপাদন ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়বে। এসবই হচ্ছে মুনাফা লোটার ফন্দি।
ওষুধ তো সাধারণ কোনো পণ্য নয়। এর উৎপাদনে আন্তর্জাতিক নিয়ম আছে। মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সে ক্ষেত্রে মুখ্য। আন্তর্জাতিক টিকা জোগানদাতা সংস্থা কোভ্যাক্সের স্লোগান- 'মহামারির এ বিশ্বে আমরা কেউই নিরাপদ নই, যতক্ষণ না প্রত্যেকেই নিরাপদ হই। আমরা কেউই দৌড়ে জিতব না, যতক্ষণ না প্রত্যেকেই জিতব।' তাদের এই স্লোগান টিকা-বৈষম্যহীন বিশ্ব গড়ার অনন্য নজির। উন্নত কিংবা টিকা উৎপাদক রাষ্ট্রগুলো এই স্লোগানের পক্ষে সম্মতি জ্ঞাপন করলেও কার্যক্ষেত্রে কি তেমনটি দৃশ্যমান? রোমে জি-২০ সম্মেলন হয়ে গেল। সেখানেও এ বিষয়ে অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়েছে। তারাও যদি এ ব্যাপারে অধিকতর তৎপর হয়, তাহলে জি-৭-এর দেশগুলো চাপে পড়বে। জি-২০ভুক্ত দেশগুলো যদি তাদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রত্যয়ী হয়, তাহলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্য পূরণের পথও মসৃণ হবে। নিশ্চয়ই আমরাও তাদের সঙ্গে থাকব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো বলেছেনই, নতুন নতুন অংশীদারিত্ব ও সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হবে। তার এই বক্তব্য অত্যন্ত সময়োপযোগী।
রোগতত্ত্ববিদ; সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আইইডিসিআর

আরও পড়ুন

×