শীতের মিষ্টি সোনালি রোদ ছড়িয়ে পড়ার আগেই মিলন মেলায় পরিণত হলো বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) খেলার মাঠ। শত ব্যস্ততা উপেক্ষা করে কিসের এক দুর্বার আকর্ষণে ভোর থেকেই জড়ো হতে শুরু করলেন শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে অশীতিপর বৃদ্ধ সবাই। বয়স-শ্রেণির সীমারেখা পেরিয়ে তারা মুখর করে তুললেন বুয়েট খেলার মাঠ। মাতলেন প্রাণের উচ্ছলতায়। মাঠের কোনায় কোনায় শুক্রবার স্মৃতির অ্যালবাম খুলে ধরলেন সবাই।

'বুয়েট অ্যালামনাই-২০১৯-এর গ্র্যান্ড রিইউনিয়নে' শুক্রবার সকাল থেকে উৎসবমুখর হয়ে ওঠেন বুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। প্রবেশ ফটক থেকে শুরু করে ভেতরে ঢাকঢোল আর বাঁশি বাজিয়ে তাদের স্বাগত জানানো হয়। মাঠের চারপাশ সাজানো হয় রঙিন কাপড় ও ব্যানারে। শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে ঐতিহ্যবাহী নাশতার মধ্য দিয়ে শুরু হয় উৎসব।

ছুটির দিন থাকায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাও ছিল অনেক। কয়েক হাজার প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা ছুটে আসেন ক্যাম্পাসে। সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী কিংবা সাহিত্যিক হয়ে যাওয়া প্রকৌশলী- সবাই এসেছেন স্মৃতির টানে। প্রিয় বন্ধুদের একনজর দেখতে হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এসেছেন অনেকেই। বেলুন উড়িয়ে শুরু হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, কাটা হয় কেক। অনুষ্ঠানে বুয়েটের ১১টি বিভাগের স্নাতক পরীক্ষায় স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীদের বিশেষ সম্মাননা এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরস্কার দেওয়া হয়।

বুয়েট অ্যালামনাইয়ের সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর সভাপতিত্বে পুনর্মিলনীতে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বিশেষ অতিথি ছিলেন বুয়েটের উপাচার্য প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম।

উপস্থিত ছিলেন বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক ড. সত্য প্রসাদ মজুমদার, বুয়েট অ্যালামনাইয়ের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী সাদিকুল ইসলাম ভূঁইয়া ও অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মুনির উদ্দিন আহমেদ।

অনুষ্ঠানে প্রফেসর ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এখনকার পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান অনেকটা ব্যবসায়িক মেলায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু আজকের বুয়েটের এ মিলন অন্তরের, ব্যবসার নয়। তিনি বলেন, ঢাকা থেকে এখন বাগান হারিয়ে যাচ্ছে। সব বেদখল হয়ে যাচ্ছে। এটাকে রোধ করতে হবে। উন্নয়ন হবে, তবে সতর্কভাবে ঐতিহ্যকে রক্ষা করে উন্নয়ন করতে হবে। এখন সব ব্যক্তিমালিকানাধীন হয়ে যাচ্ছে; কিন্তু তা কতটুকু মান ধরে রাখতে পেরেছে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রাইভেটাইজেশন করা হচ্ছে লোকসানের কারণে। আর প্রাইভেট হয়ে তারা শ্রমিক ঠকাচ্ছে, মান কমাচ্ছে- আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে তারা লাভ করছে। আমরা ব্যক্তিতান্ত্রিক পর্যায়ে আছি, তাই পুঁজিবাদ আরও বেগবান হচ্ছে। এতে আমরা ঠকছি।

অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, ২০০৯ সালে বুয়েট অ্যালামনাইয়ের প্রথম মহাপুনর্মিলনী শুরু হয়। ধারাবাহিকভাবে প্রতিবছর এই মেলা চলছে। এ বছর প্রায় চার হাজার স্নাতক ও তাদের পরিবার, বন্ধু-বান্ধবের সমাগম ঘটেছে। ভবিষ্যতে আরও বড় আকারে এই পুনর্মিলনী হবে বলে আশা রাখি।

সব শেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন গ্র্যান্ড রিইউনিয়ন সাংগঠনিক কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী মুনিরুদ্দিন আহমেদ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে খেলাধুলা, পুতুলনাচ, র‌্যাফেল ড্র ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মেতে ওঠেন প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা। ছোটদের জন্য ছিল ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা, নারীদের জন্য পিলো পাসিং, পরিবারের সবার জন্য ছিল বয়সভিত্তিক আলাদা আয়োজন। বিকেলে স্মৃতিচারণ পর্বে প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা যেন হারিয়ে গিয়েছিলেন অতীত রোমন্থনে। বিকেলের সূর্য হারিয়ে যাচ্ছিল রাতের আঁধারে। কিন্তু সেদিকে নজর ছিল না কারও।

বিষয় : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েট রিইউনিয়ন

মন্তব্য করুন