সমকালের সঙ্গে সাক্ষাৎকার

ছাত্রলীগ ও প্রশাসনের বাধায় তেমন কিছু করতে পারিনি: ভিপি নুর

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক

বিগত ছয় মাসে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ করতে পেরেছে ডাকসু?

ঠিক এ প্রশ্নটাই করা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুরকে। উত্তরে তিনি বলেন, 'ডাকসু নির্বাচন নিয়ে সারাদেশের মানুষের মধ্যে এক ধরনের আগ্রহ কাজ করে। ২৮ বছর পর সেই নির্বাচন হয়েছে। তবে সারাদেশের মানুষ যে রকম নির্বাচন আশা করেছিল, আসলে শুরুতেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে মানুষ হতাশ হয়। নির্বাচন হয়ে পড়ে প্রশ্নবিদ্ধ। তারপরও শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশা করেছিল নির্বাচিতরা ছাত্রদের প্রাধান্য দিয়ে কাজ করবেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মূল সমস্যাগুলো নিয়ে আমরা ডাকসুর পক্ষ থেকে তেমন কিছু করতে পারিনি। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের প্রধান সমস্যা আবাসিক সংকট নিরসন করা এবং হল থেকে অছাত্র-বহিরাগত বিতাড়ন করে বৈধ শিক্ষার্থীদের আসন দেওয়ার বিষয়টি কার্যকর হয়নি। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের জোর করে মিছিল-মিটিংয়ে নেওয়া এবং ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমরা পারিনি। প্রশাসনের অসহযোগিতা এবং ছাত্রলীগের বাধার কারণে এসব সম্ভব হয়নি। তারা এসব কখনই করতে চায়নি। বরং আমরা করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়েছি।'

সমকালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভিপি নুর বলেন, এসএম হলে অছাত্র-বহিরাগতদের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে লাঞ্ছিত ও হামলার শিকার হয়েছি। নারীদেরও লাঞ্ছিত করা হয়। অছাত্র-বহিরাগতদের বিতাড়নের বিষয়ে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার কারণে একজন শিক্ষার্থীকে মেরে কান ফাটিয়ে দেওয়া হয়। এর বিচার বিশ্ববিদ্যালয় এবং হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের সব অপতৎপরতায় প্রশাসন সহযোগিতা করে যাচ্ছে।

তবে তিনি বলেন, এসব সত্ত্বেও তারা ছোট ছোট কিছু কাজ করার চেষ্টা করেছেন। সেগুলো করতে গিয়েও তারা বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগের বাধার সম্মুখীন হয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অসহযোগিতা দেখেছেন। যেমন সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন মেয়েদের বিভিন্ন হলে 'সাইবার সিকিউরিটি অ্যাওয়ারনেস' কর্মসূচি আয়োজন করতে গেলে ছাত্রলীগ তা করতে দেয়নি এবং অতিথিদের আসতে নিষেধ করে। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ডাকসু সভাপতিকে জানালেও কোনো প্রতিকার মেলেনি।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে আন্দোলনের কারণে আলোচনায় আসা নুর বলেন, ডাকসুর পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-সংশ্নিষ্ট বিষয় নিয়ে বেশ কয়েকটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, বিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে এসব সেমিনারের আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি বেশ কিছু সাংস্কৃতিক কর্মসূচিও আয়োজন করা হয়। তবে মোটা দাগে শিক্ষার্থীদের মৌলিক চাহিদা নিয়ে এখন পর্যন্ত ডাকসু কিছুই করতে পারেনি। কারণ হলো ছাত্রলীগ ও প্রশাসনের অসহযোগিতা এবং বাধা।

নুর বলেন, প্রশাসন এবং ছাত্রলীগের কেউই চায় না ডাকসু কার্যকর কিংবা সক্রিয় হোক। তারা চায় না এটা শিক্ষার্থীদের কথা বলার একটা জায়গা হোক, তাদের অধিকার আদায়ের প্ল্যাটফর্ম হোক। কারণ এতে প্রশাসন অস্বস্তিতে পড়বে এবং ছাত্রলীগের রাজনীতিতে ভাটা পড়বে। তারা রাজনীতি করার জন্য শিক্ষার্থীদের হলে সিট দেয় এবং মিছিল-মিটিং করায়। ডাকসু পূর্ণাঙ্গ রূপে সচল হলে প্রশাসনিকভাবে শিক্ষার্থীরা সিট পাবে। এতে তাদের রাজনীতি বাধাগ্রস্ত হবে। এ জন্য তারা ডাকসুকে সেভাবে সক্রিয় করতে চাচ্ছে না। প্রশাসন ছাত্রলীগকে খুশি রেখে যেনতেনভাবে বিশ্ববিদ্যালয় চালাচ্ছে। তবে ডাকসু নেতৃবৃন্দ এটা মেনে নেবে না।

তিনি আরও বলেন, 'বাজেটের সময় আমি যে প্রস্তাবনা দিয়েছিলাম, সেটি মানা হয়নি। ডাকসুর গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছে ভিপি হলো ছাত্র সংসদের প্রধান নির্বাহী। অথচ ডাকসুর বাজেট উত্থাপন করা হয় ভিপির অনুমোদন ছাড়াই। জিএস যেভাবে বলে, সেভাবেই করা হয়। আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও সেটা করে। প্রশাসন এখানে ছাত্রলীগের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে।'

তিনি বলেন, তবে শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে এগিয়ে এলে ডাকসুকে কার্যকর করা সম্ভব। কেবল একজন ভিপি কিংবা সমাজসেবা সম্পাদক একা করতে পারবে না। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ এবং তাদের স্বতঃস্ম্ফূর্ত প্রতিবাদ দরকার। তারা এগিয়ে এলে আমরা তাদের সঙ্গে থাকব, কথা বলব। এক্ষেত্রে একটি পরিবর্তন হতে পারে।

দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসেও ইশতেহারের মূল অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এ প্রসঙ্গ তোলা হলে তিনি বলেন, গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধির যে কথা বলা হচ্ছে সে বিষয়ে কাজ হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ফোরাম সিনেটে তারা এ বিষয়ে কথা বলেছেন। এতে প্রশাসনও সম্মত হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এটা আরও বাড়ানো হবে। এক্ষেত্রে কিছুটা হলেও কাজ হয়েছে। তবে পরিবহন সংকটের বিষয়ে এখনও দৃশ্যমান কিছু করা হয়নি। আর ক্যাম্পাসে বহিরাগত যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও প্রশাসন সম্মত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি পয়েন্টে নিরাপত্তাকর্মী বসানোর কথা বলেছেন তারা। বাইরের যান চলাচল সীমিত করার ব্যাপারে তারা কাজ করবে।