কেউ ১৩তম বিসিএসে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়েছেন, কেউ বা ১৪তম কিংবা ১৬তম বিসিএসে। বহু আগে বয়স ৫০ বছর পেরিয়েছে, চাকরিও শেষ দিকে। অথচ সরকারি কলেজের মেধাবী এই শিক্ষকরা একটিও পদোন্নতি পাননি; রয়ে গেছেন প্রভাষক পদেই। বিভাগীয় পরীক্ষা সম্পন্ন করতে না পারলে ভূতাপেক্ষভাবে চাকরি স্থায়ীকরণের বিধান নেই- এমন অজুহাতে আটকে দেওয়া হয়েছে স্থায়ীকরণ। তাই কর্মজীবনে তাদের হয়নি একটিও পদোন্নতি, পাননি উচ্চতর গ্রেড।

যদিও এর আগে বিভাগীয় পরীক্ষা সম্পন্ন না করলেও বয়স ৫০ বছর পূর্ণ হওয়ায় বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস নিয়োগ বিধিমালা ১৯৮১-এর ৮(১)(এফ) বিধি অনুসারে অনেককেই স্থায়ীকরণ ও পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। বাদ পড়েছেন কেবল এই শিক্ষকরা। ওই বিধি অনুসারে, ৫০ বছরের বেশি বয়সী সরকারি কর্মকর্তাদের স্থায়ীকরণ ও পদোন্নতির জন্য শর্ত শিথিলের বিধান রয়েছে। বিধিতে বলা হয়েছে, 'কোন ব্যক্তির পঞ্চাশ বৎসর বয়স পূর্ণ হইলে বিধি-৫-এর (বি) অনুচ্ছেদের শর্ত হইতে অব্যাহতি পাইবেন।' বিধি-৫-এর (বি) অনুচ্ছেদের শর্ত অনুযায়ী, বিভাগীয় পরীক্ষায় পাস ও বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে। ১৯৮১-এর অনুচ্ছেদ ৮(১)-এর এফ বিধি অনুসারে বয়স ৫০ বছর পূর্ণ হলে এ দুটো শর্তই শিথিলের বিধান থাকলেও অজ্ঞাত কারণে বঞ্চিত করা হচ্ছে বিসিএস ক্যাডারভুক্ত অন্তত ২৩ শিক্ষককে। দেশের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক ও সর্বোচ্চ মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষা বিসিএস উত্তীর্ণ এই শিক্ষকরা চাকরির শেষ সময়ে এসে স্থায়ীকরণ ও পদোন্নতি না হওয়ায় চরম মানসিক যন্ত্রণা ও হতাশার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন।

১৬তম বিসিএসে নিয়োগপ্রাপ্ত লক্ষ্মীপুর সরকারি রামগঞ্জ কলেজের স্থায়ীকরণ ও পদোন্নতিবঞ্চিত দর্শনের প্রভাষক মুহাম্মদ আবদুস শহীদ দুশ্চিন্তা ও হতাশায় স্ট্রোক করে করুণ ও অসহায় জীবনযাপন করছেন।

স্বামীর অকালমৃত্যু ও নানাবিধ শারীরিক সমস্যায় জর্জরিত চট্টগ্রাম হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক নায়লা জামিল তার আবেদনে বলেন, 'বয়স ৫০ বছরের অধিক হওয়ার পরও আজ পর্যন্ত আমার চাকরি স্থায়ীকরণ ও পদোন্নতি হয়নি। যার ফলে আমি চরম হতাশার মাঝে দিন কাটাচ্ছি। এতকাল পর্যন্ত প্রভাষক পদে অবস্থান করায় মানসিক ও সামাজিকভাবে ভীষণ হেয় ও বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছি। অন্যদিকে আর্থিকভাবেও অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হয়ে আসছি।'

নথিপত্রে দেখা যায়, ১৯৮১-এর অনুচ্ছেদ ৮(১)-এর এফ বিধি অনুসারে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের অনেক শিক্ষককে স্থায়ীকরণ করে প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। শুধু বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারাই নন, এ পর্যন্ত অসংখ্য আত্তীকৃত কলেজ শিক্ষককে ৫০ বছর পূর্তিতে চাকরি স্থায়ীকরণ ও পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। অথচ বারবার আবেদন করেও স্থায়ীকরণ ও পদোন্নতিবঞ্চিত রয়েছেন অন্তত ২৩ জন বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারভুক্ত শিক্ষক। বঞ্চিতরা জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশি অধিদপ্তরের কিছু ডেস্ক কর্মকর্তার ভুল ব্যাখ্যার কারণে এ ব্যাপারে কোনো সমাধান মিলছে না। এসব কর্মকর্তার অসহযোগিতার কারণে মৃত্যুর আগে নিজের চাকরির স্থায়ীকরণ দেখে যেতে পারেননি, অথচ মৃত্যুর পর স্থায়ীকরণ করা হয়েছে  এমন নজিরও আছে!

শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ২০১৮ সালের ২৯ আগস্ট এক চিঠিতে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের ৫০ বছর বয়স-ঊর্ধ্ব বিভিন্ন পর্যায়ের ও বিভিন্ন বিষয়ের কর্মকর্তাদের চাকরি স্থায়ীকরণের লক্ষ্যে তথ্যছক অনুযায়ী আবেদন জমা দেওয়ার জন্য সব সরকারি কলেজ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পত্র ও তাগিদপত্র দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য যথাযথভাবে আবেদন করলেও আজ পর্যন্ত স্থায়ীকরণ ও পদোন্নতি পাননি বিসিএস ক্যাডারভুক্ত এসব শিক্ষক।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রেরিত চিঠিতে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্ত ছয়জন কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রপতির ১০ শতাংশ কোটায় নিয়োগ পাওয়া ১১ কর্মকর্তার বয়স ৫০ বছরের বেশি হওয়ায় সুপারিশসহ চাকরি ভূতাপেক্ষভাবে স্থায়ীকরণের তথ্যসংবলিত তালিকা প্রেরণ করেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক। বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে এ তালিকায় ছিলেন ১৩তম বিসিএসে নিয়োগপ্রাপ্ত চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক শেখ মো. মুয়াহহিদুল হক (আইডি নম্বর ৩০০৪), ১৪তম বিসিএসের ঝিনাইদহ কেসি কলেজের দর্শন বিভাগের প্রভাষক ফাহমিদা খাতুন (৬৫৪২), চট্টগ্রাম সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক নায়লা জামিল (২৭৮৫) ও ১৬তম বিসিএসে নিয়োগপ্রাপ্ত ঢাকার শহীদ বেগম শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক শাহানা পারভীন (১৮১০৯), টাঙ্গাইল সরকারি সা'দত কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক মো. আজিজুর রহমান (৫০৮৭) এবং লক্ষ্মীপুর সরকারি রামগঞ্জ কলেজের দর্শন বিভাগের প্রভাষক মুহাম্মদ আবদুস শহীদ (৯২৫৪)। বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে ১০ শতাংশ কোটায় নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকায় ছিলেন আরও ১১ কর্মকর্তা। তারা হলেন- মোহাম্মদ আবদুর রশীদ (১০৩০১), শাহজাহান আলী (৪৯৯০), মো. শাহ আলম (২৫৪৫), মো. শহীদুল ইসলাম (১০৪১২), ড. মো. আবদুস সবুর খান (৯৬৭৩), জয়দেব সজ্জন (৯৪৯৭), পরাগ কান্তি দেব (৪০১৫), মো. কালিমুল্লাহ (১০৯৪৮), মো. নাসিম হায়দার (৩৫০), ড. মো. আবদুল মান্নান (১০২৩০) এবং ড. বি এম রেজাউল করিম (৯৬৮৭)।

তারা ছাড়াও পরে স্থায়ীকরণের জন্য আবেদন করা আরও পাঁচজন বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার কর্মকর্তার নাম মাউশির এ তালিকায় যুক্ত হয়। তারা হচ্ছেন- ১৪তম বিসিএসের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক মো. ইকবাল (৪৯৪৪), ১৬তম বিসিএসের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রভাষক মাহফুজা আক্তার (১০৮৬), শেখ মো. আ. সালাম (৭৫৭০) ও হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. মাহতাব হোসেন (৫৫৪৬)। এ ছাড়া ১৬তম বিসিএসের দর্শন বিভাগের প্রভাষক শাহীন পারভীনসহ (০০০০৫২১৯) আরও অনেক শিক্ষক-কর্মকর্তাই একাধিকবার আবেদন করেও এ পর্যন্ত স্থায়ীকরণ ও পদোন্নতিবঞ্চিত।

গত বছরের ৮ জুন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে প্রভাষক পদ থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির বিষয়ভিত্তিক খসড়া তালিকায় উপরোক্ত শিক্ষকদের নাম থাকলেও ডানপাশে মন্তব্য কলামে 'চাকরি স্থায়ীকরণ হয়নি' বলে উল্লেখ করা হয়। ভুক্তভোগী এই শিক্ষকদের বয়স ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে হওয়ায় ১৯৮১-এর ৮(১)(এফ) বিধি অনুযায়ী মন্তব্য কলাম সংশোধনপূর্বক চাকরি স্থায়ীকরণ ও পদোন্নতি প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে কয়েক দফা আবেদন করলেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর।

১৬তম বিসিএসে ১৬তম স্থান অধিকারী মো. আজিজুর রহমানের বয়স ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে ২০১৭ সালের ৯ মে। জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) ৫৪তম ব্যাচে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন তিনি। স্ত্রীর দীর্ঘকালীন অসুস্থতা এবং এক বছর বয়সী কন্যাশিশু রেখে অকালমৃত্যুসহ নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিভাগীয় পরীক্ষা সমাপ্ত করতে পারেননি তিনি। ১৯৮১-এর ৮(১)(এফ) বিধি অনুসারে বেশ কয়েকবার চাকরি স্থায়ীকরণ ও পদোন্নতির আবেদন করেও কোনো প্রতিকার পাননি দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে সততা, দক্ষতা ও কর্তব্যনিষ্ঠাসহকারে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানসহ সুষ্ঠুভাবে অর্পিত দায়িত্ব পালন করে আসা এই শিক্ষক।

মানিকগঞ্জ সরকারি ভিকু মেমোরিয়াল কলেজের ইসলামের ইতিহাসের প্রভাষক মাহফুজা আক্তার ও চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক শেখ মো. মুয়াহহিদুল হক তার আবেদনে জানান, গুরুতর শারীরিক অসুস্থতাসহ নানাবিধ সমস্যা-সংকটের কারণে তিনি বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। মাউশি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শিক্ষা বিভাগে একাধিকবার সরাসরি যোগাযোগ করলে কিছুদিনের মধ্যে তাদের চাকরি স্থায়ীকরণ হবে বলে আশ্বস্ত করা হয়। কিন্তু বয়স ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে হওয়া সত্ত্বেও অদ্যাবধি তাদের চাকরি স্থায়ীকরণ হয়নি।

মানিকগঞ্জ সরকারি ভিকু মেমোরিয়াল কলেজের ইসলামের ইতিহাসের প্রভাষক মাহফুজা আক্তার, ঢাকার শহীদ বেগম শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক শাহানা পারভীনসহ অনেক বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার কর্মকর্তা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত ও চরম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। চাকরিজীবনের শেষ সময়ে এসেও স্থায়ীকরণ ও পদোন্নতি না হওয়ায় চরম হতাশা নেমে এসেছে এসব শিক্ষক পরিবারে। বঞ্চিত এসব শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা উপমন্ত্রী, শিক্ষা সচিব ও মাউশির মহাপরিচালকের সুদৃষ্টি, মানবিক বিবেচনা ও আশু সমাধান কামনা করেছেন। তারা চান, অন্তত তাদের পদোন্নতিবঞ্চিত হয়ে যেন অবসরে যেতে না হয়।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক সমকালকে বলেন, বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখবেন। আইনগত কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকলে এই কর্মকর্তাদের চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিতে বিষয়টি তিনি আনবেন।