নির্মাণকাজের টুংটাং শব্দ। তলার পর তলা দাঁড়িয়ে গেছে। দেয়ালের গায়ে শেষ প্রলেপ দিতে ব্যস্ত শ্রমিকদের কেউ কেউ। কর্মমুখর শ্রমিক অনেকে আবার তৈরি করছেন দরজা-জানালার কাঠামো। এভাবেই দিনরাত কাজ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) তৈরি হচ্ছে ৬টি আবাসিক হল। নির্মাণকাজের ৮০ ভাগের বেশি এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আগামী জানুয়ারিতে নতুন এসব হলে শিক্ষার্থী ওঠানোর পরিকল্পনা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। এর মধ্য দিয়ে শতভাগ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ পাবে ক্যাম্পাস। এরপর আর একজন শিক্ষার্থীকেও হলে সিট ছাড়া থাকতে হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার প্রথম দিন থেকেই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য সিট বরাদ্দ থাকবে। গণরুমের মতো তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হবে না তাদের। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণরুম শব্দটিই চলে যাচ্ছে জাদুঘরে। একসঙ্গে ৬ হলের যাত্রার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন পর হলেও দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় সত্যিকার অর্থে তার আবাসিক চরিত্র ফিরে পাচ্ছে। দশতলা বিশিষ্ট ৬টি হলে ৬ হাজার শিক্ষার্থীর সিট বন্দোবস্তের পর তৈরি হবে নতুন এক মাইলফলক। ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ হলগুলো উদ্বোধন করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। এরপর ৪৯ ও ৫০তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের দিয়ে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হচ্ছে নতুন হলের।

ছায়াঘেরা আর অতিথি পাখির কলকাকলিতে এক নৈসর্গিক পরিবেশে ঢাকার অদূরে সাভারে প্রায় ৭০০ একর জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৭০ সালে জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় নামে দেশের প্রথম ও একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৩ সালে এটির নামকরণ হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ক্যাম্পাসের উত্তরে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, উত্তর-পূর্বে সাভার সেনানিবাস, দক্ষিণে বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং পূর্বে সরকারি ডেইরি ফার্ম। জীববৈচিত্র্য, জলাশয়, বিভিন্ন স্থাপনার স্বতন্ত্র নির্মাণশৈলী, নিপীড়নবিরোধী আন্দোলনসহ শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে নানা সংগ্রামের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়টি আলাদা পরিচিতিও পেয়েছে। আবার দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে সর্বজনীন স্বীকৃত থাকলেও বাস্তবে প্রায় অর্ধেক সংখ্যক শিক্ষার্থীর হলে সিটের বন্দোবস্ত নেই।

বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীরা আবাসন সমস্যা নিরসনে আন্দোলন করে এসেছেন। এরপর 'জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অধিকতর উন্নয়ন' শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ৬টি আবাসিক হলের নির্মাণকাজ শেষের দিকে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক সংলগ্ন জায়গায় পাশাপাশি মেয়েদের তিনটি হল ও ক্যাম্পাসের পেছনের অংশের গেরুয়া এলাকা-সংলগ্ন জায়গায় ছাত্রদের তিনটি হলের নির্মাণকাজ চলছে। প্রতিটি হলে এক হাজার শিক্ষার্থীর আসন সংকুলান হবে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত মোট ৬ হাজার শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা হচ্ছে। প্রতিটি হলে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য থাকবে স্বতন্ত্র কিছু কক্ষ। ছয়টি হলসহ অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২৩টি স্থাপনা তৈরি করা হবে। মোট প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৪৪৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এই প্রথম এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক হল রয়েছে ১৬টি। এতে ৯ হাজার শিক্ষার্থীর থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা সাড়ে ১৩ হাজারের বেশি। নতুন হলগুলোর নির্মাণ শেষ হলে ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর থাকার বন্দোবস্ত হবে।

সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের আগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মাধ্যমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পরিবেশ ও প্রাণী এবং পাখিকুলের বিচরণক্ষেত্র অক্ষুণ্ণ রেখে একটি নিরীক্ষা ও সংশোধিত মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হয়। সংশোধিত পরিকল্পনা তৈরির টিম লিডার হলেন বুয়েটের সহযোগী অধ্যাপক শেখ আহ্‌সান উল্লাহ মজুমদার।

নতুন স্থাপনা কোথায় কীভাবে তৈরি করলে স্থপতি মাজহারুল ইসলামের মূল মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে তা সাংঘর্ষিক হবে না- তা বিবেচনায় নেয় বুয়েটের প্রতিনিধি দলটি। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সীমানা ঘেঁষে তারা বহুতল ভবন তৈরির মতামত দেয়। মূল ক্যাম্পাসের ভেতরে উঁচু কোনো ভবন নির্মাণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়। বুয়েটের চার শিক্ষকের সংশোধিত পরিকল্পনার আলোকেই তৈরি হচ্ছে নতুন স্থাপনা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম সমকালকে বলেন, জানুয়ারিতে শিক্ষার্থীদের নতুন হলে ওঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ৪৯-৫০তম ব্যাচ দিয়ে একযোগে দশতলা বিশিষ্ট এই হলগুলোর যাত্রা শুরু হবে। এর মধ্য দিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'গণরুম' নামক শব্দটি জাদুঘরে যাবে। নতুন হলে উন্নত পরিবেশে উন্নত জীবন ধারণ করতে পারবে তারা। শিক্ষা ও মানসম্মত গবেষণার জন্য ভালো পরিবেশের বন্দোবস্ত করাও জরুরি। এ ব্যাপারে সবিশেষ নজর রয়েছে আমাদের। বর্তমানে তৃতীয় বছর পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের গণরুমে থাকতে হচ্ছে।

ফারজানা ইসলাম আরও বলেন, ক্যাম্পাসের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখে নতুন স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। এটা বলতে পারি, আমরা কংক্রিটের জঙ্গল বানাব না। পরিবেশ ঠিক রেখে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। নতুন স্থাপনা তৈরির পাশাপাশি অনেক পুরোনো-জীর্ণ স্থাপনা পাশ থেকে ভেঙে ফেলার পর তা নান্দনিক রূপে ধরা দেবে। এটা বুঝতে হবে, অনেক সময় যে কোনো স্ট্রাকচার একটি সুপারস্ট্রাকচারকে ধরে রাখে- এটা অস্বীকার করা যাবে না। যেসব বিশেষজ্ঞের মতামত নিয়ে স্থাপনা তৈরি হচ্ছে তারাও অত্যন্ত সবুজপিয়াসী।

উপাচার্য আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও পরিবেশের মানোন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে আমরা কিছু কাজ করে যাচ্ছি। আবাসন সংকট নিরসনে প্রথম ধাপে শিক্ষার্থীদের জন্য হল তৈরি হলো। এরপর বিশ্বমানের লেকচার থিয়েটার, পরীক্ষার হল ও ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধাসংবলিত লাইব্রেরি নির্মাণ করা হবে। এখন যেখানে ক্লাস সেখানে পরীক্ষা হওয়ায় পরীক্ষার যে সত্যিকার অনভূতি- এটা অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে আসে না। এ জন্য অত্যাধুনিক পরীক্ষার হল তৈরি করা হবে। আশা করি, আমার পরে যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নেবেন, এ কর্মযজ্ঞ আরও এগিয়ে নেবেন তিনি। ক্যাম্পাসের মোট আয়তনের তিন ভাগের এক ভাগ পানি, এক ভাগ বনাঞ্চল, এক ভাগ উঁচু-নিচু ভূমি। নতুন স্থাপনা তৈরি করতে গেলে কিছু গাছ কাটা পড়লেও মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী গাছ লাগানো হচ্ছে।

সংশোধিত পরিকল্পনা তৈরির টিম লিডার বুয়েটের সহযোগী অধ্যাপক শেখ আহ্‌?সান উল্লাহ মজুমদার সমকালকে বলেন, সংশোধিত মাস্টারপ্ল্যানের কোথাও ব্যত্যয় হচ্ছে কিনা, এটা দেখভাল করছে বুয়েট। আমাদের মূল কাজ হলো ক্যাম্পাসের পরিবেশগত গুণাগুণ ঠিক রাখার বিষয়টি নিশ্চিত রাখা। সংশোধিত মাস্টারপ্ল্যান করার সময় আমরা সব স্থাপনা সার্ভে করেছি। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে জোনভিত্তিক স্থাপনা হচ্ছে। অতিথি পাখির বিচরণস্থল যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয়টি মাথায় রাখা হয়েছে। ৬ হাজার শিক্ষার্থী ৬টি হলে একটি ভালো পরিবেশে থাকার জায়গা পাবে। ক্যাম্পাসে এটা একটি বিশাল পরিবর্তন আনবে।

অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে শুরু থেকে নিবিড়ভাবে সংশ্নিষ্ট মাইক্রোবায়োলজি (অণুজীববিদ্যা) বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আলী আজম তালুকদার। তিনি শহীদ সালাম-বরকত হলের প্রাধ্যক্ষ ও পরিবহন অফিসের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ড. আলী আজম তালুকদার সমকালকে বলেন, করোনাকে চ্যালেঞ্জ করে শিক্ষার্থীদের কথা সর্বাধিক গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিয়ে আবাসিক হলের নির্মাণকাজের গুণগত মান ধরে রাখার জন্য তদারকি করে যাচ্ছি নিরলসভাবে। ক্যাম্পাসে ভালো পরিবেশে ছাত্র-ছাত্রীদের বসবাসের ব্যবস্থা করা, শিক্ষার মান বাড়ানো, বিদেশে বৃত্তিরর সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার নৈতিক দায় আমাদের। এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবহন সংকট ছিল ব্যাপক। সেটাও দূর করা হয়েছে। বর্তমানে পরিবহন পুলে গাড়ির সংখ্যা ৬৫। এর মধ্যে ১৭টি বাস। এ বছর দুটি অ্যাম্বুলেন্সসহ ৫টি গাড়ি কেনার কাজ প্রক্রিয়াধীন। সালাম-বরকত হল সংস্কার করা হয়েছে। ৫০ লাখ টাকার বাজেটের মধ্যে হলের অফিস ভবন কক্ষ, ম্যুরালসহ মূল গেট ও রাস্তা নতুনভাবে তৈরি করা হয়। অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

উন্নয়ন প্রকল্পে যা আছে :এ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৩টি স্থাপনার মধ্যে ছয়টি আবাসিক হল ছাড়াও রয়েছে প্রশাসনিক ভবন, হাউস টিউটরদের বাসভবন, প্রভোস্টদের আবাসিক কমপ্লেক্স, শিক্ষক, কর্মকর্তা, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী, পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য আবাসিক টাওয়ার, গেস্ট হাউস-কাম গ্র্যাজুয়েট রিসার্চার হাউস, জীববিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, কলা ও মানবিকী অনুষদ, গাণিতিক ও পদার্থবিষয়ক অনুষদের আনুভূমিক সম্প্রসারণ, লেকচার থিয়েটার এবং পরীক্ষার হল নির্মাণ, নতুন লাইব্রেরি ভবন, স্পোর্টস কমপ্লেক্স, সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চের উন্নয়ন, ছাত্রীদের জন্য খেলার মাঠ, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির লাইন সম্প্রসারণ, জহির রায়হান মিলনায়তনের সংশোধন, রাস্তা (ব্রিজ ও ড্রেনসহ), মেডিকেল সেন্টারের জন্য দুটি অ্যাম্বুলেন্স কেনা, ৩২ সিটের একটি মিনিবাস, আসবাব ও পিকআপ কেনা।

সার্কুলার রোড :সংশ্নিষ্টরা জানান, ক্যাম্পাসে একটি পরিকল্পিত রোড নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। নির্মাণ করা হবে সার্কুলার রোড। স্বতন্ত্র সড়কে হেঁটে, সাইকেল চালিয়ে ও বাসে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের ভেতরে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে পারবেন। ১৫ মিনিট পরপর সার্কুলার রোডে বাস চলবে।