২০১৯ সালের ২ মে তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শ. ম. রেজাউল করিম রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনলাইন সেবার উদ্বোধন করেন।ওই অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, এখন থেকে গ্রাহককে ভবনের নকশা অনুমোদন ও ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রের জন্য রাজউক ভবনে দৌড়াদৌড়ি করতে হবে না। দালালদের খপ্পরে পড়তে হবে না। গ্রাহককে হয়রানির শিকার হতে হবে না। ঘরে বসেই গ্রাহকরা রাজউকের সেবা পাবেন। 

মাত্র দুই বছর যেতে না যেতেই রাজউকের অনলাইন সেবা এখন নগরবাসীর জন্য ‘কাল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনলাইনে আবেদনই করতে পারছেন না গ্রাহকরা। অনলাইন সার্ভারে ঢুকতেই পারেন না কেউ। কখনো ঢুকতে পারলেও ১০-২০ মিনিট যেতে না যেতেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে বার বার ব্যর্থ হয়ে গ্রাহককে আবারও রাজউকেরই দ্বারস্থ হতে হয়। তখন রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সার্ভারে সমস্যা, সার্ভার ডাউন বলে গ্রাহকদের ফিরিয়ে দেন। তখনই গ্রাহকরা অনুনয়-বিনয় শুরু করেন। 

এই সুযোগে রাজউকে আবার গড়ে উঠেছে দালাল চক্র। সেই দালালদের মাধ্যমে কাজ করাতে গেলে গ্রাহকের গুনতে হয় কয়েকগুণ অর্থ। গ্রাহককে ঘুরতে হয় মাসের পর মাস। অথচ অনলাইনে আবেদন করলে মাত্র ৪০ দিনেই ভবনের নকশার অনুমোদন সম্পন্ন হওয়ার কথা।

একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই রাজউকের ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র ও রাজউকের নকশা অনুমোদন নিয়ে গ্রাহকের অভিযোগের অন্ত ছিল না। এ দুটি কাজকে কেন্দ্র করে গ্রাহকরা ভয়াবহ হয়রানির শিকার হতেন। এসব নিয়ে চলত ভয়াবহ উৎকোচ বাণিজ্য। এসব হয়রানি ও দুর্নীতি থেকে মুক্তি দিতেই অনলাইন সেবা কার্যক্রম চালুর দাবি ছিল দীর্ঘদিন। 

উদ্বোধনের পর বলা হয়, অনলাইন চালুর কারণে ঘরে বসেই সবাই আবেদন করতে পারবেন। এতে করে রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরাসরি দেখা হওয়ার সুযোগ বন্ধ হবে। ফলে দুর্নীতিরও সুযোগ থাকবে না। গ্রাহক ওয়েবসাইটে ঢুকে তার কাগজপত্র সাবমিট করবেন। কোনো কাগজের ঘাটতি বা ভুল থাকলে রাজউক থেকে ই-মেইলে বা মোবাইলে মেসেজ যাবে। গ্রাহক অনলাইনেই সেগুলো সংশোধন বা যুক্ত করে অনলাইনে সাবমিট করবেন। এমনকি অনলাইনে গ্রাহক দেখতে পারবেন তার আবেদনের অগ্রগতি কোন পর্যায়ে আছে। 

উদ্বোধনের পর প্রথম থেকেই সার্ভারে আবেদন গ্রহণে রাজউকের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গ্রাহকদের অনাগ্রহী করে তুলতে শুরু করে। কিন্তু যেসব গ্রাহক অনলাইনেই আবেদন করেন, তাদেরও ঠিকমতো সেবা দেওয়া হতো না। ফলে রাজউকের এই অনলাইন সেবা অনেকটাই নামসর্বস্ব হয়ে আছে।

মিরপুরের মধ্যপীরের বাগের বাসিন্দা আনিসুর রহমান জানান, গত মার্চে সেনপাড়া মৌজার একটি জমির ছাড়পত্রের আবেদন অনলাইনে করতে যান। কিন্তু তিনি সার্ভারে ঢুকতে পারেননি। পরে রাজউকের শরণাপন্ন হন। সেখানে একজনের মাধ্যমে তিনি আবেদন করে ছাড়পত্র পান। তাও তার লেগে যায় তিন মাস। অথচ একটি ছাড়পত্র পাওয়ার কথা দুই সপ্তাহের মধ্যে।

ধানমন্ডি এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, তিনিও একইভাবে একটি ভবনের নকশার অনুমোদনের জন্য অনলাইনে আবেদনের চেষ্টা করেন। কিন্তু সার্ভার জটিলতার কারণে তিনিও ব্যর্থ হন। পরে রাজউকের দ্বারস্থ হন। কর্মচারীরা জানিয়ে দেন সার্ভার জটিলতার কারণে কাজ এগোয় না। এ জন্য সময় লাগবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজউকের একজন অথরাইজড অফিসার সমকালকে বলেন, রাজউকের লোকজন এমনিতেই মানুষকে অনেক ঘুরায়। এখন তাদের কমন ভাষা হয়ে গেছে ‘সার্ভার নাই, সার্ভার ডাউন’। সার্ভারের দোহাই দিয়ে অনেকে বাণিজ্যও শুরু করেছে।

আরেকজন কর্মকর্তা জানান, সার্ভার ডাউন থাকার কারণে স্টেট শাখা ও বিশেষ কমিটির কাজ এখন ম্যানুয়ালি হচ্ছে। সার্ভারে করতে গেলে বেশি ভোগান্তি হয় বলে এখন তারা মনে করছেন সার্ভারের চেয়ে ম্যানুয়ালই ভালো।

আরেক কর্মকর্তা জানান, এই সার্ভারটি তৈরিতে রাজউকের খরচ হয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকা। অথচ দুই কোটি টাকায় একটি সার্ভার করলে সারা দেশের মানুষের সেবা দেওয়া সম্ভব। 

তিনি বলেন, একটি ব্যাংকের একটি সার্ভার থেকে সারা দেশের গ্রাহকের সেবা দেওয়া হয়। তাহলে রাজউকের কেন এত টাকার সার্ভার দুর্বল থাকবে?

অবশ্য রাজউকের অথরাইজড অফিসার নূর আলম দাবি করেন, যারা এসব বলছে, সেগুলো পুরোপুরি ঠিক বলা যাবে না। যারা দালালের আশ্রয় নেয়, তারা এসব অভিযোগ করতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতার উচিত সংশ্লিষ্ট অফিসারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা।

সংস্থাটির ওয়েবসাইট, সার্ভার ও আইটি কার্যক্রমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাজউকের সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট কাজী মাহবুবুল হক সমকালকে বলেন, যারা এটা বলছে, ঠিক বলছে না। আমাদের সার্ভার এখন ঠিক আছে। এই সার্ভার দেশের জাতীয় সার্ভারের সঙ্গেও যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। কাজেই কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না।