শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চাঁবিপ্রবি) স্থাপনের প্রস্তাবিত এলাকায় আমি বা আমার পরিবারের কারও কোনো জমি নেই। তাই অধিগ্রহণের সময় বেশি মূল্যে জমি বিক্রি করে লাভবান হওয়ার কোনো প্রশ্নই উঠে না।

তিনি পুরো বিষয়টির তদন্ত দাবি করে বলেন, দুর্নীতির সঙ্গে আমার পরিবারের কারও কোনো সংশ্নিষ্টতা নেই। এখানে কোনো দুর্নীতি হয়েছে কি-না, সেটা খতিয়ে দেখতে সরকারের অনেক রকমের মেকানিজম আছে, বহু কর্তৃপক্ষ আছেন, যারা দুর্নীতি হয়েছে কি-না বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারেন। আমি চাইব তারা যেন তদন্ত করেন। এতে যদি কেউ জড়িত থাকে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

বৃহস্পতিবার একটি জাতীয় দৈনিকে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির ঘনিষ্ঠজনদের চাঁদপুরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ভূমি অধিগ্রহণে কারসাজি করে ৩৫৯ কোটি টাকা বাড়তি নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপরই মন্ত্রী সন্ধ্যায় হেয়ার রোডে তার সরকারি বাসভবনে এ বিষয়ে জবাব দিতে সংবাদ সম্মেলন করেন।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, চাঁদপুর জেলার কোথাও ক্রয়সূত্রে আমার কোনো জমির মালিকানা নেই। আমি কখনোই চাঁদপুরে কোনো জমি কিনিনি। আমার পরিবারের কোনো সদস্যের কোনো জমি ওই অধিগ্রহণ এলাকায় নেই। কাজেই জমির মূল্য থেকে তাদের লাভবান হবার বা অনৈতিক কোন সুবিধা গ্রহণের কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না।

দীপু মনি বলেন, আমার বড় ভাই বিশেষজ্ঞ শল্য চিকিৎসক ডা. জাওয়াদুর রহিম ওয়াদুদ লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নে নদীর পাড়ে হাসপাতাল ও বৃদ্ধাশ্রম স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরুর বহু আগে থেকেই অল্প অল্প করে জমি কিনছিলেন। চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রাথমিকভাবে চিন্তা করা দুইটি স্থানের মধ্যে লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের স্থানটি চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরে আমার ভাই রেজিস্ট্রার্ড দলিলমূলে কেনা সব জমি হস্তান্তর করে দেন। আমি শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকার কারণেই তিনি জমি হস্তান্তর করে দেন। কারণ তার কেনা জমি সরকার থেকে অধিগ্রহণ করা হলে তিনি আর্থিকভাবে লাভবান হবেন, কিন্তু কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, কে বা কারা প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থানে জমি কিনছেন, তা আমার জানার কথা নয়। শুধুমাত্র আমার বড় ভাইয়ের হাসপাতাল ও বৃদ্ধাশ্রম স্থাপনের জন্য আগে থেকেই কেনা জমির বিষয়ে অবহিত ছিলাম এবং অধিগ্রহণের আগেই তিনি দলিলমূলে তা হস্তান্তর করে দেন।

তিনি বলেন, জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করে আমার সুনাম ও সস্মান নষ্ট করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। গত ১৩ বছরে আমার নির্বাচনী এলাকায় বহু সরকারি স্থাপনা নির্মিত হয়েছে এবং এসব স্থাপনার জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। চাঁদপুরে কোনো অধিগ্রহণ করা জমিতে কোথাও কখনও আমি বা আমার পরিবারের কোনো জমি কখনও ছিল না। আমার উদ্যোগে চাঁদপুর হাইমচরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হয়। সেখানে জমির মূল্য শতাংশ প্রতি পাঁচ হাজার টাকা থেকে কয়েক লাখ টাকায় উন্নীত হয়। সরকার থেকে ক্ষতিপূরণ লাভের আশায় বা অন্যকোনো উদ্দেশে সেখানেও আমি বা আমার পরিবার কখনও কোনো জমি কেনেনি।

সংবাদ সম্মেলনে দীপু মনি বলেন, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে জমির মূল্য নির্ধারণ জমির মালিকের করার সুযোগ নেই। জেলা প্রশাসনই প্রাক্কলন তৈরি করেছে। স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন, ২০১৭ এর ৯(১) ধারা অনুযায়ী প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হয়। সকল দলিল বিবেচনায় নিয়ে গড় মূল্য নির্ধারণ করা হয়। আইন অনুযায়ী ৪ ধারার নোটিশ জারির পূর্ববর্তী ১২ মাসে সম্পাদিত সকল দলিল বিবেচনায় নিয়ে গড় মূল্য নির্ধারণ করতে হয়। আইনের বিধান অনুযায়ী প্রথম প্রাক্কলন দাঁড়ায় ৫৫৩ কোটি টাকা। পরবর্তীতে ৪ ধারার নোটিশ জারির পূর্ববর্তী ১২ মাসের সম্পাদিত সকল দলিলের গড় মূল্যের পরিবর্তে ১৮২টি দলিলের মধ্যে ১৩৯টি দলিল বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ৪৩টি দলিলের (সর্বনিম্ন মূল্যের) গড় মূল্যকে বিবেচনায় নিয়ে দ্বিতীয় প্রাক্কলনটি প্রস্তুত করা হয়, যার মূল্য দাঁড়ায় ১৯৩ কোটি টাকা। আইনে ৪ ধারার নোটিশ জারির পূর্ববর্তী ১২ মাসের গড় মূল্যের ভিত্তিতে বাজার মূল্য নির্ধারণের বিধান থাকা সত্ত্বেও ৪ ধারার পূর্ববর্তী তিন বছরের গড় মূল্যকে বিবেচনায় নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটির প্রথম প্রাক্কলনকৃত মূল্য ৫৫৩ কোটি টাকা, যা জমির মূল্য বাড়িয়ে দেওয়ার কারণে ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসন কর্তৃক দ্বিতীয় পর্যায়ে গঠিত কমিটির প্রাক্কলনকৃত মূল্য ১৯৩ কোটি টাকা (যেখানে অধিগ্রহণের জন্য নির্ধারিত জমি ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের জন্য ইতোপূর্বে অধিগ্রহনকৃত জমির মূল্য বাদ দিয়ে হিসাব করা হয়েছে) যা বাজার মূল্য বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। একইসাথে বলা হচ্ছে, পূর্ববর্তী প্রাক্কলনে বাজারমূল্যের ২০ গুণ বেশি দাম ধরা হয়েছিল। ১৯৩ কোটি টাকার ২০ গুণ গণিতের কোন নিয়মে ৫৫৩ কোটি টাকা হয়, তাও বোধগম্য নয়।

আওয়ামী লীগের এই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, চাঁদপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দ্বিতীয় দফায় আরও ২২ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব সংবলিত নথি শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে আমার কাছে উপস্থাপিত হলে, আমি সে প্রস্তাব নাকচ করে দিই। নথিতে লিখে দিই, চাঁদপুর নদীভাঙন কবলিত এলাকা হওয়ায় সেখানে জমি অপ্রতুল। এছাড়া একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য ৬২ একর জমি, যা ইতোমধ্যে অধিগ্রহণের জন্য অনুমোদন করা হয়েছে, তাই যথেষ্ট।

তিনি বলেন, অভিযোগ করা হচ্ছে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অধিগ্রহণ করা নির্ধারিত স্থানটি অনুপযুক্ত এবং ভাঙনের ঝুঁকি রয়েছে। এর আগে চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ স্থাপনের ক্ষেত্রেও একই অভিযোগ তোলা হয়েছিল। একটি মহল চায় না আমার হাত দিয়ে চাঁদপুরের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলো পরিচালিত হোক। কিন্তু যত বাধাই আসুক, চাঁদপুরের উন্নয়নের গতিকে থামানো যাবে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিগ্রহণের জন্য নির্ধারিত জমির মূল্য ইচ্ছাকৃতভাবে বৃদ্ধি করার জন্য বেশি মূল্যে জমি হস্তান্তরের ঘটনা যদি ঘটে থাকে, তবে সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে দীপু মনি মনে করেন। তিনি বলেন, সঠিক মূল্যে জমি অধিগ্রহণ দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কাজ যেন অযথা বিলম্বিত না হয়, তাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আলোচ্য বিষয়টি পদ্মা সেতুর কথিত দুর্নীতির অভিযোগের মতো। যেখানে অর্থ বরাদ্দ বা লেনদেন হয়নি, ক্রয়-বিক্রয় হয়নি, সেখানে দুর্নীতি হয়েছে বলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

কারা অপপ্রচার করছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যারা দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছে। চাদঁপুর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও ফরিদগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য আপনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছে জানানো হলে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবেই। প্রতিযোগিতাকে তারা প্রতিহিংসার পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। দলীয় শিষ্টাচার মেনে তারা দলীয় ফোরামে এসব অভিযোগ তুলতে পারতেন। তা না করে তারা গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে গেছেন। আমি দলীয় ফোরামেই অভিযোগ জানাব। দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও দলের সাধারণ সম্পাদককে আমি জানিয়েছি।

চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিসকে নিয়ে প্রশ্ন করা হলে দীপু মনি বলেন, সরকারের দায়িত্বশীল পদে থেকে আমি তাকে নিয়ে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন মনে করছি না।