অর্থবছরের শুরুতেই উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয়ে কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ জন্য উন্নয়ন প্রকল্পে তিনটি ক্যাটাগরি করে 'সি' ক্যাটাগরির প্রকল্পে অর্থ ছাড় স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আর 'বি' ক্যাটাগরির প্রকল্পে সরকারি অংশের বরাদ্দের সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ ছাড় করা হবে। তবে 'এ' ক্যাটাগরির প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করবে সরকার। এর পাশাপাশি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার সব রকম যানবাহন কেনা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আপ্যায়ন ব্যয়, মনিহারি ব্যয়, কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয়, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনা খাতে বরাদ্দের অর্ধেক খরচ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সব রকম প্রকল্প, কর্মসূচি ও স্কিমের কমিটির সভায় সম্মানী বাবদ ব্যয় বন্ধ করা হয়েছে।

গতকাল রোববার নতুন অর্থবছরের প্রথম কার্যদিবসে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে আলাদা তিনটি পরিপত্র জারি করে সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্র সাধনের এসব সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাষিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এসব নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।

অর্থ বিভাগের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বৃদ্ধি, সরকারের ঋণ কমিয়ে রাখাসহ বৈশ্বিক সংকটময় পরিস্থিতিতে সামষ্টিক অর্থনীতির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য এসব কৃচ্ছ্র সাধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তাদের ধারণা, এসব উদ্যোগের ফলে পুরো অর্থবছরে সরকারের ব্যয়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। গাড়ি কেনা বাবদ ৮ হাজার ৮০ কোটি টাকা এ বছরের বাজেটে বরাদ্দ আছে। এর পুরো বরাদ্দের ব্যয় স্থগিত থাকবে। আর প্রশিক্ষণ, মুদ্রণ মনিহারি, বিভিন্ন সভার সম্মানী বাবদ বরাদ্দ আছে আরও ৮ হাজার কোটি টাকা। এর অর্ধেক ব্যয় হবে। এতে সরকারের ঋণ নেওয়া বা রাজস্ব সংগ্রহের ওপর চাপ কমবে।

চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে সরকার উন্নয়ন ও পরিচালন মিলিয়ে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ১১ হাজার ৪০৬ কোটি পরিচালন ব্যয়। আর উন্নয়ন ব্যয় ২ লাখ ৫৯ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৬৬ কোটি টাকা। এডিপির বরাদ্দের মধ্যে ৬০ শতাংশ সরকারি অর্থে এবং বাকি ৪০ শতাংশ বৈদেশিক সহায়তা ও ঋণ থেকে নিয়ে করা হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, সরকারের উদ্যোগটি অবশ্যই ইতিবাচক। গাড়ি কেনা, ভ্রমণ, কমিটির সভার সম্মানীসহ অন্যান্য পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগ আছে। আর এডিপির ক্ষেত্রে উদ্যোগটি ভালো। কারণ এডিপিতে অনেক প্রকল্পের অনুমোদন থাকে, কিন্তু বরাদ্দ থাকে সামান্য। এতে ওই প্রকল্পের বাস্তবায়নে অনেক সময় লাগে। বাড়তি ব্যয় হয়। ক্যাটাগরি করে সুষ্ঠুভাবে সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে দেশ ও সরকার উপকৃত হবে। তবে এতে কাজের মান যাতে ঠিক থাকে, সেদিকে বিশেষ মনোযোগ দরকার।

সরকারের এ সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী বলে মনে করছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন। তিনি সমকালকে বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য ইতিবাচক। এখন দেখতে হবে উদ্দেশ্যের সঙ্গে উদ্যোগের সমন্বয় কীভাবে হচ্ছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে আমদানি ব্যয় কমানো, যাতে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত এবং বিনিময় হারের ওপর চাপ কমে আসে। আবার অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে মূল্যস্ম্ফীতির ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা কমানো। সে জন্য সরকারের অর্থে আমদানি কমানো নিশ্চিত করতে হবে।

ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক ড. সাজ্জাদ জহির সমকালকে বলেন, এটি খুবই ভালো উদ্যোগ। অগ্রাধিকারমূলক বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন খুবই জরুরি। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ও ঋণ পরিস্থিতিতে সতর্ক থাকা দরকার। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করে বছরের পর বছর ব্যয় করে যাওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

বাজেটে বরাদ্দ রাখা হলেও ব্যয়ের ক্ষেত্রে যে সরকার সতর্ক থাকবে- এ তথ্য গত ১০ জুন বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন অর্থ সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার। তিনি বলেছিলেন, সামগ্রিকভাবে বাজেট সম্প্রসারণমূলক মনে হলেও ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকার সতর্ক থাকবে। অহেতুক ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় করা হবে না। বাজেটে এসব বিষয়ে কিছু বলা না হলেও দ্রুত পরিপত্র জারি করে ব্যয় সংকোচনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পরিকল্পনা বিভাগের সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী সমকালকে বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন পদ্ধতি কী হবে, তা নিয়ে গত ১৭ মে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেখানে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রকল্পের ক্যাটাগরি করে বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর আগেও এ ধরনের ক্যাটাগরি করা হয়েছিল। এ বছরও করা হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে চলমান ও গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প যথাসময়ে শেষ করা। পাশাপাশি সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা।

প্রকল্প বিভাজন :অর্থ বিভাগের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বা ফার্স্ট ট্রাক প্রকল্প, খাদ্য, কৃষি, জ্বালানি, বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট প্রকল্প এবং যেসব প্রকল্প চলতি অর্থবছরেই শেষ হবে, সেগুলোকে 'এ' ক্যাটাগরির প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের এডিপিতে ২৮০টি প্রকল্প আছে, যেগুলো আগামী বছরের জুনের মধ্যে শেষ করার জন্য অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া অন্যান্য খাতের আরও কিছু প্রকল্প মিলিয়ে প্রায় সাতশ প্রকল্পকে 'এ' ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আর যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষ হতে কমপক্ষে আরও দুই বছর বা তার বেশি সময় লাগবে এবং ইতোমধ্যে মোট বরাদ্দের ৫০ শতাংশ বা তার কমবেশি ব্যয় হয়েছে, সেগুলোকে 'বি' ক্যাটাগরিভুক্ত করা হয়েছে। এ রকম পাঁচ শতাধিক প্রকল্প রয়েছে এবারের এডিপিতে। আর যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরুর পর্যায়ে, সম্ভাব্যতা যাচাই পর্যায়ে এবং প্রশিক্ষণকেন্দ্রিক সেগুলোকে 'সি' ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জানা গেছে, এ ধরনের প্রকল্পের সংখ্যা প্রায় দেড়শ।

নতুন গাড়ি কেনা বন্ধ :মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অন্যান্য সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাষিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নতুন ও প্রতিস্থাপক হিসেবে সব রকম মোটরযান, জলযান ও আকাশযান কেনা বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। তবে রেলপথের জন্য লোকোমোটিভ কেনা যাবে। গাড়ি কেনা ছাড়াও আতিথেয়তা, ভ্রমণ, মনিহারি (অফিসের কাগজ, কলম, টিস্যুর মতো পণ্য) আসবাব, কম্পিউটার, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ বাবদ সরকারি কর্মকর্তারা এ অর্থবছরে বরাদ্দের ৫০ শতাংশ ব্যয় করতে পারবেন।

বিষয় : সরকারি ব্যয়

মন্তব্য করুন