অভ্যন্তরীণ উৎসের তুলনায় বেসরকারি খাতে বিদেশ থেকে ঋণ বাড়ছে দ্রুত হারে। চলতি বছরের মার্চ শেষে বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৯৮ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ২ লাখ ৩৩ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকা। গত বছরের মার্চে বিদেশি ঋণ ছিল ১ হাজার ৬২২ কোটি ডলার। এর মানে, এক বছরে বেড়েছে ৮৭৬ কোটি ডলার বা ৫৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ বেড়েছে ১১ দশমিক ২৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, সরকারি-বেসরকারি খাত মিলে গত মার্চ শেষে বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৩২৩ কোটি ডলার। এর মধ্যে সরকারি খাতে ৬ হাজার ৮২৫ কোটি ডলার। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।
সংশ্নিষ্টরা জানান, আমদানিতে ব্যাপক প্রবৃদ্ধি, রেমিট্যান্স কমাসহ বিভিন্ন কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার এখন ব্যাপক চাপে রয়েছে। এক বছরে আন্তঃব্যাংকে প্রতি ডলারে ৮ টাকা ৬৫ পয়সা বেড়ে এখন ৯৩ টাকা ৪৫ পয়সায় উঠেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে গতকাল দাঁড়িয়েছে ৪১ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলারে। আজ এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নে ১৯৬ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হবে। এতে রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নামতে পারে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে বিদেশি ঋণ পরিশোধ বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ আরও বাড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে গত মার্চ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৯১ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময় শেষে যা ছিল ১১ লাখ ৬০ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা। ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৫৬ কোটি টাকা বা ১১ দশমিক ২৯ শতাংশ।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, অর্থনীতির প্রয়োজনে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের বিদেশি ঋণ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ঝুঁকি পর্যালোচনা করতে হবে। বিশেষ করে যারা বিদেশি ঋণ নিয়ে অভ্যন্তরীণ খাতে বিনিয়োগ করেছে, তাদের ঝুঁকির বিষয়ে সচেতন করতে হবে। কারা কী কাজে ঋণ নিচ্ছে, তা তদারকিতে রাখতে হবে। কেননা, কেউ ঋণ নিয়ে খেলাপি হলে কান্ট্রি রেটিংয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, রপ্তানির বিপরীতে ঋণ কম। কেননা, ডলারে ঋণ নিয়ে ডলার আয় থেকে পরিশোধ করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ স্থিতির মধ্যে ১ হাজার ৭০৭ কোটি ডলার বা ৬৮ দশমিক ৩১ শতাংশ স্বল্পমেয়াদি। বাকি ৭৯১ কোটি ডলার বা ৩১ দশমিক ৬৯ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি। সাধারণত তৈরি পোশাক, খাদ্য, ফার্মাসিউটিক্যালস, সিমেন্ট, টোব্যাকোসহ বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে এ অর্থ এসেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি খাতের উদ্যোক্তারা বিভিন্ন কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এক বছরের কম সময়ের জন্য ঋণ নেন। এ জন্য কোনো কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগে না। তবে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে কমিটির অনুমোদন নিতে হয়।
সংশ্নিষ্টরা জানান, অভ্যন্তরীণ বাজারের তুলনায় কম সুদের কারণে বিদেশি ঋণে ঝুঁকছেন উদ্যোক্তারা। বর্তমানে সব ধরনের খরচসহ ২ থেকে ৩ শতাংশ সুদে বিদেশি ঋণ পাওয়া যায়। দেশের বাজারে সুদহার কমার পরও গত মে শেষে গড় সুদহার ছিল ৭ দশমিক ১০ শতাংশ। দেশের বাজারে গড় সুদহার ৭ শতাংশের কাছাকাছি মানে সবাই এরকম সুদে ঋণ পাচ্ছেন, তেমন না। অনেক ক্ষেত্রে ৯ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে। যে কারণে উদ্যোক্তারা বিদেশি ঋণে আগ্রহ বাড়িয়েছেন।