ভয়
কোনো নির্বাচন ছাড়াই পৈতৃক সূত্রে চেয়ারম্যানের পোলা চেয়ারম্যান। যেমন- মুচির পোলা মুচি, জাউলার পোলা জাউলা। ছাল নাই কুত্তার বাঘা ফাল। জালাল মিয়ার লাশ উঠানে পড়ে আছে মৃত্যুর মতোই একা। স্ত্রীর দীর্ঘশ্বাসে মরা বলেশ্বরের পানি ভাটিতে নামে। ঢাকা থেকে আগত সন্তানরা এখনও ব্রিজের ওপারে। সাঙ্গোপাঙ্গর সঙ্গে চেয়ারম্যানের পোলা বিলু দাঁড়িয়ে আছে বড় রাস্তায়। তারা পৌঁছামাত্র লকডাউন সঙ্গে লাল ঝান্ডা উড়িয়ে দেবে।
কাইলকাও বাজারে মোর লগে কতা কইল, হে মিয়ার তো করোনা ছেল না!
চুপ করেন মেয়া, আমার এলাকার সুরক্ষার দায়িত্ব কি আপনের! ঢাকা থেইক্যা যারা আসবে, তাগো যদি থাহে।
আনাড়ি হাতে ছেলে আর মেয়েজামাইরা জালাল মিয়ারে গণকবরে শোয়ায়। মাত্র একশ ফুট দূরে দাঁড়িয়ে গ্রামবাসী সব দেখে। করোনা না, বিলুর হুমকি-ধমকিতে তারা আতঙ্কিত।

কারমা
মোবাইলে ম্যাডামের নম্বর দেখে রুমার মায়ের চোখ জ্বলজ্বল করে। তাড়াহুড়া করে ধরতে গিয়ে ভাবে, ক্রস বাটনে না আবার চাপ পড়ে। উত্তেজনায় প্রায় কাঁদো কাঁদো- হেলু, ম্যাডাম!
রুমার মা! ভালো আছো?
- বালা। আমনি কেমুন আছোইন?
- আল্লাহ এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে। তোমাদের ওখানকার খবর কী?
রুমার মায়ের কণ্ঠ রোধ হয়ে আসে। কী বলবে। কীভাবে তার দুরবস্থার কথা ব্যাখ্যা করবে। শুধু বলে, কীয়ের কথা কমু।
- সবকিছু। তোমার পরিবার, তোমার এলাকার খবর। রুমার মায়ের ভিসুভিয়াস ফেটে কান্নার লাভা বেরিয়ে আসে। শাড়ির আঁচল দিয়ে নাক মোছে আর ফুপিয়ে ফুপিয়ে বুক কাঁপে।
- ম্যাডাম গো, দুক্কের কতা কী কইবাম। ডাহা থেইক্কা আইয়া ভুলই করছি। ডাহায় বেবাকতে মিল্লাঝুইল্লা বালাই আছিলাম। আমনি তো বেবাক জানুন। রুমার বাপে ময়লা গাড়ি টানত। বড়পোলার ভাঙাড়ির দুকান আছিল, বড়মাইয়া রুমার গার্মেন্টস, টুলু আছিল রেস্টুরেন্টের ওয়েটার, ছোডপোলা কাজ করত কাপড়ের দোহানে আর আপনার ওনো আমার বালাই চলতাছিল। দ্যাশে কী এক করুনা আইল, আমার সংসারডা আউলাঝাউলা হইয়া গেল। লগডাউন না কিতা কয়, হের পরে রুমার বাপে আমারে আর টুলুরে বারিত পাডাই দিল। কইল, বাইত বালা থাকবা। কাইলকা রুমার বাপ ফুন কইরা জানাইল, ডাহা শহরে হেগ অবস্থা আরও খারাপ। দুকান খুললে পুলিশ আইয়া লাডি দিয়া পিটাইয়া কিছু রাখে না। বড়মাইয়া রুমা বেতনের দাবিতে প্রত্তিদিন রাস্তায় নামে। হেগো কতাও মালিকরা হুনে না। চাইর মাস বেতন নাই, কাম নাই, গরে চাইল নাই। কাউন্সিলরের কাছে রুমার বাপ বুডার আইডি কাড জমা দিলে কী হইব, অহন কুনু সাহায্য পাইছে না। গেরামে আইয়া আমরাও না খাইয়া মরতাছি। কাত্তিক মাসে ফসল যা উঠছিল, বেবাক বেইচ্যা কিন্যা ডাহা গেছিলাম। গেরামে আইয়া বেতনের ট্যাহা দিয়া চাইল-ডাইল যা কিনছিলাম, দুইদিন হইল ফুরায়ে গ্যাছে। অহন আপনিই কন, ক্যামনে বাঁচুম।
- বলো কী? সরকার তো ত্রাণ দিচ্ছে।
- ম্যাডাম গো, আল্লাহর কসম দিয়া কই, তেরান কি হারামও চোকে দ্যাহি নাই। টুলুরে লইয়া চেয়ারমেনের ধারে গেছিলাম। দেহি হের লোকেরা বস্তায় বস্তায় চাইল, ডাইল, ত্যাল হের গুদামে উডাইতেছে। আমগরে দেইহা কইল, কী চাই?
আমি কইলাম, তেরান। হের লোকরা কইল, তোমগো বুডার আইডি কার্ড কই?
কইলাম, আমরা তো ডাহার বুডার। ডাহার বুডার হুইনা আমগোরে ফেরত দিল। কইল, বুড দেও ডাহায় আর তেরান নিত আইস এনো? কী মনে কইরা আবার ডাইকা কইল, রেশন কার্ড আছে?
তিন হাজার ট্যাহা দিয়া রেশন কার্ডও করি নাই। কুনুদিন এমন অবস্থা হইব, কেডায় ভাবছে। কইলাম, না কার্ডও নাই।
যাও যাও, হুদাই সময় নষ্ট। আর হোন, পারলে মাইয়াডা রাইক্কা যাও। অভাবের দিনে কামে দিব।
- হারামজাদা। কাম জমেরেও ছাড়ে না।
- আচ্ছা, চিন্তা করো না। তোমার এই মাসের বেতন বিকাশ করে দিচ্ছি।
(পরদিন সবাইকে কৌতূহলী হয়ে বাজারের দিকে যেতে দেখলে রুমার মা বাড়ি থেকে বের হয়ে শোনে, বেইন্যা রাইতে শর্টসার্কিট হইয়া গুদামে আগুন লাগলে চাইল-ডাইল-ত্যালের লগে চেয়ারমেনের মাইয়া আর মেম্বারের পোলা পুইরা ছাই।)

রূপান্তরিত
হঠাৎ কিছু একটার আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেলে চমকে উঠি। কয়েক দিন ধরে মাথাটা প্রচণ্ড ব্যথা করছিল। সামনে ওয়াল টিভিতে তখনও লো ভলিউমে সায়েন্স ফিকশন মুভিটা চলছে। রুমের এসির শব্দ ছাড়িয়ে আওয়াজটা আবারও কানে এলে ভাবি এত রাতে কীসের শব্দ? কোয়েরেন্টাইন দিনগুলোতে থমথম শহরে সময় যেন পথ ভোলা পথিক। বুভুক্ষু কুকুরেরা খাবারের সন্ধানে চলে গেছে দূরে কোথাও। পেছনের বাগানে লক্ষ্মীপ্যাঁচার ডাকে অজানা ভয়ে বুক কাঁপে। একবার ভাবি শান না তো? হয়তো আমাকে সারপ্রাইজ দিচ্ছে! দূর, সে তো নিউইয়র্কে বোনের বাসায় হোম কোয়েরেন্টাইনে। এক মাসের আগে কোনো ফ্লাইট নেই। ফিফি! মেয়েটা আমার খেয়ে না খেয়ে মালয়েশিয়ায় আটকে গেল। বেডরুমের দরজা খুলে লাউঞ্জ ধরে পায়ে পায়ে এগোতে বসার ঘরে লাইট দেখে চমকে উঠি। ভয় পাওয়ার ব্যক্তি আমি নই। তিন হাজার স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটটাতে একা থাকি। নিচে দারোয়ান আর সার্ভেন্ট কোয়ার্টারে লুলু। সাহস নিয়ে এগিয়ে দেখি, মুভিতে দেখা সেই নায়ক সোফায় বসে সিগ্রেট ফুঁকছে। অধিক বিস্ময়ে আমি নির্বাক। স্বপ্ন দেখছি না তো! হাতে টিমটি কাটি! না, স্বপ্ন নয়। আমার বিস্ময় ভেঙে দিয়ে সামনে দাঁড়ানো মানুষটি বলে চলে, হুট করে চলে আসার জন্য ক্ষমা চাইছি। কী করব বলুন, হুকুমের গোলাম, দায়িত্ব তো করতেই হবে। আমার নাম মিস্টার করোনা। সব এলাকায় প্রবেশের পূর্বে আমি সবার ইচ্ছে সম্পর্কে অবগত হয়ে সেই হিসেবে তার ইচ্ছে পূরণ করি। যেমন ধরেন ফাঁসিত ঝোলানোর আগে আসামির কাছে তার শেষ ইচ্ছে জানতে চাওয়া হয়, তেমনি। আপনার শেষ ইচ্ছেটা ঝট করে বলে ফেলুন। আমার হাতে সময় একদম কম। আরও অনেকের বাসায় যেতে হবে।
সামনে দাঁড়ানো আত্মবিশ্বাসী, স্মার্ট, চৌকস, সুদর্শন ১৯ বছর বয়সী সুপুরুষ দেখে আমার ছাত্র রেনের কথা মনে পড়ল। কী যে এক জাদুদৃষ্টি রেনের। প্রথম ক্লাসে আমি শিকারির হাতে বিদ্ধ হওয়া হরিণীর মতো ছটফট করছিলাম। বললাম, মানে কী?
মানে সহজ, আপনি করোনা পজিটিভ।
হাউ ডিড আই?
মনে করার চেষ্টা করুন। সপ্তাহখানেক আগে আপনি যে গ্রোসারি শপে শপিং করতে গিয়ে সেখানে ইতালিফেরত একজনের কাছ থেকে আপনি সংক্রমিত হয়েছেন। কয়েক দিন পরে আপনার লক্ষণগুলো দেখা দেবে তারপর...। সরি, আমি এত নিষ্ঠুর না। আপনাদের অসচেতনতাই আমাকে নিষ্ঠুর হতে বাধ্য করছে। চিন্তা করবেন না। আপনি আক্রান্ত এটা ঠিক, কিন্তু আমার কারণে আপনার মৃত্যু হবে কিনা, সেটা বলতে পারব না। এটা নির্ধারণ করার মালিক আমি নই।
নিজের ওপর ভরসা হারালাম না। মানুষ নিজেকে নিজে যেমন তৈরি করে, সে তাই। সে নিজেই নিজের পরিকল্পনাকারী, নির্মাণকারী ও রক্ষাকারী। দৃঢ়তার সঙ্গে বলি, আমি জেসি কামাল। ফিলোসফিতে অধ্যাপনা আমার পেশা। ২০ বছর বিবাহিত জীবনে একজন কন্যাসন্তানের মা। তারা দু'জনের এ মুহূর্তে মানে ১৪ দিনের মধ্যে দেশের আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। মানে মৃত্যুর সময় কাউকে পাচ্ছি না।
হুম!
যদি মৃত্যু হয়! আমার স্বামী ও সন্তান তাদের আমি ভালোবাসি ঠিকই, কিন্তু এই চরম সংকটের মুহূর্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করলাম, কেউ কোথাও নেই, আত্মীয়স্বজন নেই, এমনকি ঈশ্বরও। নিজের অস্তিত্ব ছাড়া আর কোথাও কেউ নেই, যার ওপর আমি নির্ভর করতে পারি। সত্যি বলতে কি, আমার শেষ ইচ্ছে আহামরি কিছু না। নিজের সঙ্গে প্রতারণা করব না। জীবনের অন্তিম সময় মানুষ সেটা করেও না। আমার ছাত্র রেনকে দেখার পর পরিচিত বন্ধুবান্ধব, ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ?, স্বামী-সন্তান, আশা-আকাঙ্ক্ষা, ক্লাব, হাউজি, কবিতা লেখা সব ঘিরে আমার যে ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তা- সব বেহেশতে গেছে। লকডাউন হওয়ার পর থেকে তার ইনস্টাগ্রাম সার্চ করছি। কিন্তু কিছুতে অ্যাড করতে পারছি না। তাই আমার শেষ দিনগুলোতে আমি ১৯ বছর বয়সী একজন নারীতে রূপান্তর হয়ে রেনের সঙ্গে ইনস্টাগ্রামে চ্যাট করতে চাই।
ব্যস! এটুকুই।
হুম। আপাতত এইটুকই।

ওনেগাই শিমাস
লকডাউন শেষে চিঠিফাইলে সে উন্মোচিত। যেন আড়মোড়া ভেঙে স্মৃতিগুলো দে ছুট। লাগাম ধরে রোমান্থন। তার নাম ইউকিকো সাকুরাই (Yukiko Sakurai)। ভিনদেশি বন্ধু আমার। কত গল্প, কত ঘটনা! মানুষ হিসেবে জাপানিজরা কত ভালো, প্রথম উপলব্ধি। গৃহিণী হিসেবে তারা বিশ্বের অন্যতম। কী করেনি বাঙালি স্বামীর মন পাওয়ার জন্য। সর্বপ্রথমে ধর্ম ত্যাগ, পোশাক চেঞ্জ, নাম চেঞ্জ, রান্নাবান্না আতিথেয়তায়। মাঝেমধ্যে ওর মন স্মৃতিবেদনাতুর অথবা স্বদেশে ফেরার আকুলতা সংক্রান্ত হলে হুটহাট বাসায় চলে আসত। জাপানিজ জীবন সব সময় আমাকে কৌতূহলী করত। ওদের জীবনযাত্রা, ভূমিকম্প, ওদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক কিমোনো, নিপ্পন, জাপানিজ ভাষা আরও কত কী! ওর বাঙালি স্বামী ছিল আমার সেন্সি। জাপানিজ ভাষায় সেন্সি মানে শিক্ষক।
প্রায় বছর তিনেক ইউকি আমার প্রতিবেশী ছিল। অবশ্য প্রতিবেশী বললে ভুল হবে। এক রকম আত্মীয়র মতো। বহু জাতি দেখা, বহু গোষ্ঠীর সঙ্গে মেশা জাপানিজদের মতো অদ্ভুত জাতি খুব কমই দেখেছি। এরা একই সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিজেদের মধ্যে ধারণ করে অভ্যাসে পরিণত করে নিয়েছে।
ইউকির খুব বিনয়ী, দায়িত্বশীল ও হেল্পফুল ও ডাইহার্ড আচরণ দেখে মনে করেছিলাম, আমার জায়গা তার অন্তরের অন্তস্তলে। আমার বৈধব্যের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনে ব্যথিত হতো। ওর চোখ টলমল করত। কাততালীয়ভাবে ওর স্বামীর নামের সঙ্গে আমার স্বামীর নামের মিল। জাপানিজরা সাধারণত নিজের পারিবারিক জীবন অন্যের কাছে উন্মোচিত করতে না চাইলেও সে আমাকে সব খুলে বলত।
আমার কন্যাসন্তানের জন্য সব রকমের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। জাপানিজ খেলনা পুতুলে কন্যার খেলনার বক্স ভরে উঠছিল। ইউকি স্বামীর সঙ্গে তেমন একটা আসত না। তবে পাড়ার কারও বিয়েশাদি-জন্মদিনে দেখা হলে জমিয়ে আড্ডা। বাচ্চাকে প্যারামে বসিয়ে অন্যান্য পুরুষের সঙ্গে গল্পের ফুলঝুরি। ঠিক সেই সময় সে আমার হৃদয়স্পর্শ করছিল হয়তো। ইউকি কাছে ডাকলে তারা প্রেমিক-প্রেমিকার মতো প্রকাশ্যে হাত ধরে হাঁটত না বা বসে গল্প করত না। আমি বাংলায় অনর্গল কথা বললে, ইউকি মুখে সারাক্ষণ একটা মাপা হাসি ঝুলিয়ে রাখত; যেন কতই না হাসিখুশি।
জাপানিজ ধর্মবিশ্বাস ধর্মের মোরল এবং সোশ্যাল বিয়ষগুলো কীভাবে তাদের প্রাত্যহিক জীবনে অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছে, বিষয়গুলো আমাদের আলোচনায় উঠে আসত। ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড কান্ট্রিগুলোর অন্যতম, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আবার প্রচণ্ড কনজারভেটিভ। নিজেদের ভাষা, ঐতিহ্য এরা এমনভাবে সংরক্ষণ করে, যাতে বিদেশিরা তাদের সঙ্গে মিশে যেতে না পারে তার মধ্যে কীভাবে তাদের সম্পর্কের সূত্রপাত পরিণয়-বিয়ে কোনো কিছুই বাদ যেত না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বোমা মেরে আমেরিকা জাপানের যে ক্ষতি করেছে, তা জাপানিদের ইতিহাসে আর কেউ কখনও করেনি। অথচ সেই আমেরিকায় তাদের ভবিষ্যৎ গড়ায় অজ্ঞান ভাবতেই অবাক হতাম।
প্রায় শতভাগ শিক্ষিত একটি উন্নত দেশ হলেও জাপানে নারীদের অবস্থান, চাকরিতে উঁচু পদে নারীর সংখ্যা, নিজেদের স্বামীগৃহে নিগৃহীত অকপটে তুলে ধরত। বেশিরভাগ কথা আরিফই বলত। আরও বলত, কথায় কথায় বিনয়সূচক বিশেষণ আর ঘন ঘন মাথা ঝাঁকুনি দেখে যে কেউ ভাববে- এরা এত কোমল হৃদয়ের মানুষ। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এরা একসময় চায়নিজ-কোরিয়ানদের একহাত দেখিয়েছে; প্রসঙ্গক্রমে সেটা টিপ্পনী কাটত।
ভালোবাসার সন্ধিহান করে বলত, আর হ্যাঁ, জানেন তো, জাপানিজ সোসাইটিকে স্যান্ড সোসাইটি বলা হয়; এরা সারাজীবন পাশাপাশি বসবাস করে; কিন্তু কেউ কারও সঙ্গে একেবারে মিশে যায় না। আর আমরা হচ্ছি সোয়েল সোসাইটি। মারামারি-কাটাকাটি যাই হোক, একসঙ্গে মিলেমিশে থাকি। হা হা হা...
আমরা একসঙ্গে ছিলাম দীর্ঘ দুই বছর। সেয়ারিং-কেয়ারিং। হঠাৎ ইউকির মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে সেই যে গেল, আর ফিরল না। সেবার গ্রীষ্ফ্মে ইউকি সুসানকে নিয়ে একাই জাপানে গেলে আমাদের সোয়েল সোসাইটির সব বাধা অতিক্রম করেছিল।
করোনায় আক্রান্তের পর ইউকির কাছে অ্যাপলজি করে বিশাল চিঠি লিখি। আমাদের মাঝে যোগাযোগ তেমন একটা ছিল না। আরিফের সঙ্গে তখন আমার চরমে। আমাদের মাথায় তখন ঊনপঞ্চাশ বায়ু ভর করেছে, দিনরাত আমরা যা খুশি তা-ই করছিলাম। একদিন তো বলেই বসল, আর ফিরছে না। নতুন জীবনের নেশায় মুহূর্তে স্বার্থপর হয়ে উঠলাম। ইউকির কথা ভুলে গেলাম। বাবা-মাকে বোঝালাম। আপাতত কন্যা মায়ের বাসায় থাকবে, আমরা পাশেই একটা ছোট বাসা নেব। তারপর ইউকিকে ডিভোর্স লেটার। সেদিন সকালে ঘোর অন্ধকারে দরজা খুলে দিলে সামনে ইউকির মুখটায় সূর্যের আলো। অনেক দিন পর দু'জনেরই ঘোর কেটেছিল। জাপানিজরা এত কান্নার অর্থ বোঝে না। যেদিন ওরা প্লেনে চড়ে বসে, বুক পুড়ে যেতে থাকে।