কী আছে ওয়েব সিরিজে?

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০১৯     আপডেট: ১৪ মার্চ ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

বিনোদন প্রতিবেদক

‘অ্যাডমিশন টেস্ট’ নামের একটি ওয়েব সিরিজের দৃশ্যে টয়া ও রিনা খান

সময়ের পথে হেঁটে নতুনত্বের কাঁধে ভর করে মাধ্যম বদলের হাওয়া লেগেছে বিনোদন অঙ্গনে। নির্মাণ ও প্রদর্শনে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি; গল্প, গান, অ্যাকশন, লোকেশনে বৈচিত্র্য- সব মিলিয়ে এ দেশেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ওয়েব সিরিজ। কী আছে ওয়েব সিরিজে, জানাচ্ছেন মীর সামী

ওভার দ্য টপ OTT  প্ল্যাটফর্ম অর্থাৎ যেখানে দর্শকরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিজের ঘরে বসে স্মার্টফোন, স্মার্ট টিভি, কম্পিউটার বা ল্যাপটপের মাধ্যমে বিনোদনমূলক ওয়েব সিরিজ এবং সিনেমা দেখতে পারেন নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা ব্যয় করে। সিনেমা হলের মতো বিনোদন না হলেও, একা একা বসে সিনেমা বা ওয়েব সিরিজ দেখাও বেশ মজার। ওয়েব সিরিজের আরেকটি বড় ব্যাপার হলো, সিনেমার যে দৃশ্য হলে দেখানো সম্ভব নয় বা সেন্সরের বোর্ডেও কাঁচিতে বাদ পড়ে, তার সবই দেখতে পাওয়া যায় ইন্টারনেটের বদৌলতে। এ কারণেই এখন ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর জনপ্রিয়তা বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। আর বাড়বেই না কেন? জীবনের নানামুখী চাপ সামলে মানুষ একটু স্বস্তি পেতে চায়। একটু স্বপ্নময় জগতে বিচরণ করতে চায়; দেখা পেতে চায় আনন্দের। নানা অভাব, অগোছালো ছাপোষা জীবন গুটিয়ে রেখে টিভি সেটের সামনে তারা বসে খানিকক্ষণ গোছালো একটি নাটক, রিয়েলিটি শো, রান্না, রূপচর্চা, গেম শো বা শিশুতোষ অনুষ্ঠান দেখবে বলে। কিন্তু সে আসায় গুড়েবালি। ৪০ মিনিটের একটি নাটক দেখার জন্য দর্শকদের ৮০ থেকে ১০০ মিনিট সময় ব্যয় করতে হয়। বাদবাকি সময়ে বিজ্ঞাপন, নয়তো সংবাদ শিরোনাম। থাকে আরেক যন্ত্রণা 'স্ট্ক্রলে সংবাদ'। কার এত ধৈর্য আছে এত সময় নিয়ে নাটক দেখার! এ কারণেই আধুনিক দর্শকরা বেছে নিয়েছে ইউটিউব বা বিভিন্ন অনলাইন ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম। সে কারণেই এখন দেশের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের জনপ্রিয় অনেক অভিনয়শিল্পী বিভিন্ন ওয়েব সিরিজে হাজির হচ্ছেন অচেনা অবতারে। 

পপি, আঁচল, অপু বিশ্বাস, তারিক আনাম খান, অপূর্ব, তাহসান, আফরান নিশো, মিথিলা, মেহজাবিন, মুমতাহিনা টয়া. জোভান, তৌসিফ মাহবুব, অর্চিতা স্পর্শিয়া, সাফা কবিরসহ অনেকেই যুক্ত হয়েছেন এই মাধ্যমে। বাংলাদেশে ওয়েব সিরিজ নির্মাণ করছেন বায়োস্কোপ, বাংলাফ্লিক্স, আইফ্লিক্স, সিএমভি, বাংলা ঢোল, ধ্রুব টিভি প্রভৃতি চ্যানেল।

ওয়েব সিরিজ ‘দ্বিতীয় কৈশোর’ এ অভিনয় করেছেন অপূর্ব, তাহসান,ও  নিশো 

ওয়েব সিরিজ কী? 

খুব সরলভাবে বলতে গেলে ইউটিউবের মতো আলাদা ভিডিও স্ট্রিমিং সাইটের জন্য নির্মিত বিভিন্ন ধারাবাহিককে ওয়েব সিরিজ বলা হয়। মূলত ৯০-এর দশকে আমেরিকায় যাত্রা শুরু করে ওয়েব সিরিজ। বিশ শতকের শেষ থেকে এর জনপ্রিয়তার শুরু। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এই ওয়েব সিরিজের যাত্রা শুরু হয়েছে অনেক আগে। বাংলাদেশে এর যাত্রা শুরু হয়েছে কয়েক বছর হলো। ওয়েব সিরিজকে সারা বিশ্বে জনপ্রিয় করার পেছনে নেটফ্লিক্সের বেশ অবদান। শুধু বাংলাদেশে নেটফ্লিক্সের সাবস্ট্ক্রাইবার ৫০ লাখেরও ওপরে।

ফলে অনেকেই বলছেন আগামী দিনে 'ওয়েব সিরিজ' হতে যাচ্ছে বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। এ বিষয়ে অভিনেতা আফজাল হোসেন বলেন, 'ওয়েব দুনিয়ায় আমরা প্রবেশ করেছি। এটা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের। কিন্তু ওয়েবের সমুদ্রে কী দেখব আর কী দেখব না, তা কিন্তু আমাদেরই ঠিক করতে হবে। এখানে যেমন ভালো কিছু আছে, তেমনই আছে খারাপ কিছু।' 

আফজাল হোসেনের কথার সূত্র ধরেই বলা যায়, ওয়েব সিরিজে যেমন আছে অনেক ভালো গল্প, তেমনই আছে অশ্নীলতার ছোঁয়া। যে কারণে বিতর্কিতও হচ্ছে এই মাধ্যমটি। ভারতের মতো আমাদের দেশেও এমন অনেক চ্যানেল রয়েছে, যাদের কাজই হচ্ছে ১৮+ উপযোগী ওয়েব সিরিজ তৈরি ও প্রচার করা। এতে চ্যানেলের সাবস্ট্ক্রাইবার বাড়ে দ্রুত। আর যত সাবস্ট্ক্রাইবার তত টাকা! 

কী আছে এই ওয়েব সিরিজে?

কী নেই এখানে? শিশুতোষ অনুষ্ঠান, কার্টুনসহ বিভিন্ন সিরিজ, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধ্রুপদী চলচ্চিত্রের পাশাপাশি নতুন চলচ্চিত্র- সবই। ফলে এই সাইটগুলো এখন দখল করে নিয়েছে ছেলে-বুড়ো সবার মন। হুমড়ি খেয়ে যেভাবে এক সময় টিভি দেখত মানুষ, এখন দেখে ইউটিউব বা ওয়েব সিরিজ। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র্রের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি মাসে ৮০ কোটির বেশি মানুষ বিভিন্ন অনলাইন ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে ঢুঁ দেয়। গড়ে প্রতি মাসে শুধু ইউটিউবেই সময় কাটায় তিন বিলিয়ন ঘণ্টারও বেশি!

‘রূপকথা’ ওয়েব সিরিজের একটি দৃশ্যে নুসরাত ইমরোজ তিশা ও ইয়াশ রোহান

বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা

বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি দেখা হয় যে ওয়েবসাইট, সেটি হলো ইউটিউব। সার্চ ইঞ্জিন গুগল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুককে পেছনে ফেলে বর্তমানে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে ভিডিও স্ট্রিমিং সাইট ইউটিউব! এ ছাড়া বাংলাদেশে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে বিভিন্ন ভিডিও শেয়ারিং সাইটগুলোর জনপ্রিয়তা। ফলে বলা যায়, দর্শক এখন টিভি ছেড়ে অনলাইনের দিকে ঝুঁকছে। কারণ বিরতিহীন একটানা বিষয়টা উপভোগ করা যায়। আমি অন্তত ৫০ জন টিভি দর্শকের সঙ্গে কথা বলেছি। জানতে চেয়েছি- টিভিতে না দেখে ইউটিউব বা অন্যান্য অনলাইন মাধ্যমে কেন তারা নাটক বা চলচ্চিত্র দেখেন? দর্শকরা উত্তরের চেয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন বেশি। তাদের অভিমতে 'বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে নাটক', 'মানহীন নাটক', 'চ্যানেল সংখ্যা অনেক হলেও বিনোদননির্ভর চ্যানেল নেই', আর 'সময়ের অপচয়'। কাহিনী আর বিষয়বৈচিত্র্যের দিক থেকে প্রতিটি গল্প ও নির্মাণশৈলী থাকে চোখে পড়ার মতো। কেন দর্শকরা ওয়েবের দিকে ঝুঁকছেন? এমনটা জানতে চাইলে অভিনেতা ও নির্মাতা আবুল হায়াত বলেন, 'দর্শক এখন বিজ্ঞাপন বিড়ম্বনাসহ নানা কারণে টিভি সেটের সামনে থেকে সরে গিয়ে ইউটিউব বা অনলাইনে অনুষ্ঠান দেখছে। তারা এতে বিরতিহীন অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারছে। একজন শিল্পী হিসেবে আমি বলব, এটি ভালো হচ্ছে। কারণ, আমাদের কাজগুলো তো অন্তত দর্শক দেখছে। কেউ যদি আমাদের কাজই দেখতে না পায়, তাহলে এর মূল্য কী? আমরা কাজ করি তো দর্শকদের জন্যই।' 

চিত্রনায়িকা পপি অনন্য মামুনের 'ইন্দুবালা' ওয়েব সিরিজে অভিনয় করেছেন। তিনি বলেন, বেশ বড় বাজেটের কাজ ছিল 'ইন্দুবালা'। আর চলচ্চিত্রের মতোই বেশ বড় পরিসরে কাজ হয়েছে। আমার তো কাজ করে মনেই হয়নি- চলচ্চিত্রে কাজ করছি না। বেশ ভালো লেগেছে কাজটি করে। এদিকে গত রোববার থেকে সিলেটে গোলাম সোহরাব দোদুলের পরিচালনায় 'নীল দরজা' নামে ওয়েব সিরিজে কাজ করছেন বিদ্যা সিনহা মিম। তিনি বলেন, প্রথমবার ওয়েব সিরিজে কাজ করছি। নতুন প্ল্যাটফর্মের এ কাজটি করে বেশ ভালো লাগছে। শুধু নাটক বা সিরিজই নয়; এখন পুরো চলচ্চিত্রও মুক্তি পাচ্ছে অনলাইন ভিডিও স্ট্রিমিং সাইটগুলোতে। একটা সময় পত্রপত্রিকায় নতুন ছবির বিজ্ঞাপন করা হতো নানা কায়দায়। এখন ইউটিউবে সিনেমার ট্রেইলার ও গানও ছাড়া হচ্ছে। সে কারণেই এখন অনেক পরিচালক বা নাটক নির্মাতা এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে 'বক্স অফিস' হিসেবে বলছেন। নির্মাতা শিহাব শাহীন দুই দশক ধরে টেলিভিশনের জন্য নাটক নির্মাণ করছেন। তিনি বলেন, 'টিভিতে কতজন দর্শক আমার পরিচালিত নাটক ও টেলিছবি দেখছেন, তার সঠিক হিসাব দিতে পারব না। কিন্তু ওয়েবসাইটে কতজন দর্শক তা দেখছেন, সেটা বলতে পারছি। সে কারণে এসব ভিডিও স্ট্রিমিং সাইটকে বক্স অফিসও বলা যায়।' 

‘ইন্দুবালা’ ওয়েব  সিরিজে অভিনয় করেছেন চিত্রনায়িকা পপি


বিভিন্ন ওয়েবসাইটের জন্য নির্মিত সিরিজ কতটা লাভজনক- জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনপ্রিয় এক পরিচালক বলেন, 'একটি টিভি চ্যানেলের জন্য যে টাকা দিয়ে নাটক নির্মাণ করা হতো, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা দিয়ে একটি ওয়েব সিরিজ বানানো যায়। আর এই ক্ষেত্রটি লাভজনক হয়ে ওঠায় এখন বিনোদন জগতের অনেকেই সেদিকে ঝুঁকছেন।' 

যেহেতু দর্শক টিভি সেটের সামনে থেকে সরে গিয়ে ভার্চুয়াল বিনোদনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে; এখন প্রশ্ন- আমাদের দেশীয় টেলিভিশনের দিন কি শেষ হচ্ছে? এ প্রসঙ্গে এনটিভির অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান মোস্তফা কামাল সৈয়দ বলেন, 'যখন নতুন কোনো একটি বিষয় আসে, তখন সেই বিষয়ের প্রতি মানুষের আকর্ষণ থাকে। টেলিভিশনের অনুষ্ঠানগুলো কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। কিন্তু অনলাইন সিরিজ তা নয়। আর টেলিভিশনের দিন শেষ হবে না এই কারণেই যে, টেলিভিশনে প্রচারিত অনুষ্ঠান পরিশীলিত আর পরিমার্জিত, যা পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে উপভোগ করা যায়। তবে এসব ওয়েব সিরিজ টেলিভিশনের জন্য চ্যালেঞ্জিং। আপনি দেখবেন, ওয়েব সিরিজগুলো কিন্তু কেউ পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেখে না। তবে এই নতুন মাধ্যমটি দর্শকদের সামনে নতুন এক দিগন্তের সূচনা করেছে। এখন দর্শকেরই চিন্তা করতে হবে, সে কোনটা দেখবে আর কোনটা দেখবে না।' 

বিষয় : ওয়েব সিরিজ বিনোদন

সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি
তারিখ সেহরি ইফতার
২১ মে '১৯ ৩:৪৪ ৬:৪০
২২ মে '১৯ ৩:৪৩ ৬:৪১
*ঢাকা ও আশেপাশের এলাকার জন্য প্রযোজ্য
সূত্র: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ