ঢাকায় চমকে দিল 'হোচিমিন'

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ড. বিপ্লব বালা

ভিয়েতনাম সরকারের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের নবীন দল তুরঙ্গমী ডান্স থিয়েটার অভিনব এক নৃত্য-নাট্য উদ্ভাবন করেছে। হোচিমিন ও ভিয়েতনাম গত শতকের ষাটের দশকে বাংলাদেশ ও বিশ্বে অভিন্ন এক প্রণোদনা সঞ্চার করে :তোমার নাম আমার নাম ভিয়েতনাম-ভিয়েতনাম হয়তো সবচেয়ে ঐকমত্যের স্লোগান ছিল। স্বদেশে উচ্চারিত হতো :আপসের পরিণাম বাংলা হবে ভিয়েতনাম।

এহেন সৃজনকর্মের নির্দেশক পূজা সেনগুপ্ত বয়ান করেন তার নন্দনভাবন :হোচিমিনের জীবন ও দর্শনের পর্ব-পর্বান্তর, অভিযাত্রা-প্রক্রিয়া রূপায়ণ করতে চেয়েছেন তিনি, যা জটিল ও রহস্যময়। নানা নাম নিয়ে নানা দেশে নানান ছদ্মবেশে আত্মগোপন ও পর্যটন করেছেন হোচিমিন, তা যেন কেবল পরিস্থিতির জন্যই নয়; নির্দেশকের ভাষ্যমতে তাঁর মধ্যকার শিল্পীসত্তা বুঝি আপনারই বহুরূপ খুঁজে ফিরেছে জীবনভর বাস্তব রঙ্গমঞ্চে, নানা রূপ-রূপান্তরণে।

স্বভাবত এহেন অন্বিষ্ট-রূপায়ণ বাস্তব রীতি-প্রকরণে সম্ভব নয়। তার জন্য নানা রূপারোপিত দৃশ্যকল্প উদ্ভাবন করতে হয়েছে। ধ্রুপদী নৃত্য, যোগসাধন ও মার্শাল আর্টের সঙ্গে সৃজনশীল নৃত্য ও নাট্যের নানা প্রকরণের মিথস্ট্ক্রিয়া ঘটেছে। তাতে একটি কোনো স্বাভাবিক চলনভঙ্গি বা প্রচলিত নৃত্যমুদ্রা দৃশ্যমান নয়। বারতিনেক পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা ও প্রাথমিক স্কেচ থেকে প্রয়োগ সৃজন করে ৪০ মিনিটের এহেন উচ্চাভিলাষী এষণা তাই হয়ে উঠেছে অভিনব এক সৃজনকলা। নির্দেশক পূজা আশৈশব নৃত্যানুশীলনে যেমন অদম্য, তেমনি আকৈশোর নাট্যক্রিয়ানবিশি, চর্চারত। এই দুই মাধ্যমের যৌগপত্যে তার এহেন নন্দনাভিযান। তাঁর ওপর আন্তর্জাতিক দর্শক সম্মুখে পরিবেশনার দায় দিয়েছে ভিয়েতনাম সরকার, তাদের ৭৪তম স্বাধীনতা-উদযাপন পার্বণে। এ দায় পালনে বিস্ময়করভাবে সফল তিনি। সত্যই রূপায়িত হয়েছে আন্তর্জাতিক এক দৃশ্যকাব্য।


মঞ্চে আমরা নাচের নির্বাক সংলাপ ও নাট্যের বিচিত্র ক্রিয়াপ্রকরণাদিতে এক অভিনব সৃজনভাষ ও তার রূপারোপ দেখি। এক বীর নায়কের জীবন ও বিপ্লব সাধন, পর্যটন বিশ্বজোড়া অভিযাত্রায় বাঙ্‌ময় হয়ে ওঠে অভিনব নন্দনমুদ্রায়। কথন-বর্ণন, ভাষ্য-ব্যাখ্যান নানা দেশীয় সঙ্গীত-ধ্বনিযোগে সৃজনমণ্ডন সম্পন্ন করে, সম্পাদনা ও মিশ্রণ :সুমন সরকার ও পূজা সেনগুপ্ত। একালের কথক সঞ্জয় যেন উবাচ নব মহাভারত, আরেক 'শিশুতীর্থ' জয় হোক মানুষের... ঐ চিরজীবিতের। তাতে রাবীন্দ্রিক 'আমার মুক্তি আলোয় আলোয়' সুরযোজনায় লেনিন-হোচিমিন সাক্ষাৎকার-পর্বটি বৈপ্লবিক এক সঞ্চারক্রিয়ার অভিভাব জাগায়। বিশ্বজোড়া বিপ্লবের এহেন অকালে/আকালেও সৃজনমাহাত্ম্যে কোথাও নবীন আবেগে মেলায় বিশ্বাসী-অবিশ্বাসীকেও। প্যারিস ও চীন যাত্রার নানা ঘটনাঘটন ভিন্ন অভিভাব সঞ্চার করে। চীনে তাঁর কারাবাস-পর্ব 'শিকল পরা ছল মোদের'-এর পরিচিত সুরে, নাট্য-নৃত্য বিভঙ্গে অঙ্গাঙ্গী রূপকল্পনা হয়ে ওঠে। বহুকৌণিক গতায়তের চড়াই-উতরাই নানা বৈপরীত্যে-বিস্তারে মহাকাব্যিক হয়ে ওঠে। দীর্ঘ এই অভিযাত্রায় হোচিমিনের আত্মস্থ ধীরলয়ের পদপাত অন্যান্য ভিন্ন গতিভঙ্গির সঙ্গে এক দ্বান্দ্বিক সামঞ্জস্যে সংঘটিত হয়। লেনিনের সদাজাগ্রত ক্ষিপ্র পদক্ষেপ যেমন লক্ষ্যভেদী হয়ে ওঠে। ইতিহাসের এই মহানায়ক হোচিমিনের জীবনগাথা, তাঁদের ভাষায় 'জৈবনিক ডান্স থিয়েটার' এ দেশে নিশ্চয় প্রথম। উদয়শঙ্করের 'কল্পনা' কোথাও কি বীজতলা ছিল না এহেন নবীন রূপায়ণে?

হোচিমিনের প্রয়াণ-শয়ান, অগ্রমঞ্চের মধ্যভাগে একটি স্থিরচিত্রের গরিমায় হিরণ্ময় নৈঃশব্দ্য সৃজন করে। হোচিমিন মানে যিনি আলো নিয়ে আসেন, আলোকিত করেন। নির্দেশক সেই আলোর অভিযাত্রী হয়ে ওঠার বাসনা করেন কুশীলব-দর্শকের ঐক্যময়তায়।- 'কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আসো/ সাধক ওগো, প্রেমিক ওগো ধরায় আসো' ধরতাই হয়ে উঠতে পারত এই আলো দিয়ে আলো জ্বালায়, আপন আলোয় আঁধার দূর করার অভীপ্সায়। ২০১৭ সালে ভিয়েতনামে অনুষ্ঠেয় আন্তর্জাতিক নৃত্যউৎসবে 'তুরঙ্গমী'র যোগদান থেকেই সৃজনের এই বীজবপন। সেখানে হোচিমিন সমাধিস্থল দেখতে গিয়ে এই উদ্ভাবনের আদি চিন্তন। কনসেপ্ট, স্ট্ক্রিপ্ট, কোরিওগ্রাফি-ডিজাইন ও নির্দেশনা :পূজা সেনগুপ্ত।

সঙ্গীত ও ধ্বনি পরিকল্পনা-ভাবনা :সুমন সরকার; কথনভাষ্য ও হোচিমিন সংলাপ :পূজা সেনগুপ্ত; কিবোর্ড: সুধীর চ্যাটার্জি, কুনাল চক্রবর্তী; বাঁশি :সৌম্যজ্যোতি ঘোষ; আলোক পরিকল্পনা :আতিক রহমান; মঞ্চ-পোশাক-সরঞ্জাম :পূজা সেনগুপ্ত। া