আমি কিন্তু ফেলুদা নই: সব্যসাচী

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

মীর সামী

সব্যসাচী চক্রবর্তী। ছবি: সমকাল

সত্যজিৎ রায়ের 'ফেলুদা'র নাম শুনলে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পর যার ছবি মানসপটে ভেসে ওঠে তার নাম সব্যসাচী চক্রবর্তী। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি পাস করা প্রখ্যাত এই অভিনেতা বন্যপ্রাণীর ছবি তুলতে ভালোবাসেন। সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশে আসেন ফাখরুল আরেফীন খানের পরিচালনায় 'গণ্ডি' ছবিতে অভিনয় করতে। গত রোববার ছিল তার ৬৩তম জন্মদিন। সেদিন রাতে সমকালের সঙ্গে আড্ডায় মেতেছিলেন এই বরেণ্য অভিনেতা। সেই আড্ডার চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো...

দৈনিক সমকাল-এর পক্ষ থেকে আপনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। কেমন আছেন?

ধন্যবাদ। আপনাদেরও শুভেচ্ছা জানাই। সবার ভালোবাসা আর দোয়ায় বেশ ভালো আছি।

আপনার কাছে জীবনের সংজ্ঞা কী?

জীবনের সংজ্ঞা বলে আমার কাছে কিছু নেই। আমি তো খুব বেশি পড়াশোনা জানা লোক নই। আমি কবি ও সাহিত্যিকও নই। আমার কাছে জীবন মানে নিজে বেঁচে থাকার জন্য যা যা করণীয় সেগুলো করতে হবে। সৎভাবে, সঠিকভাবে কর্ম করা। আমি নিজে না খেলে কেউ আমাকে খাইয়ে দিতে পারবে না। আমাকে নিজের খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সে জন্য আমাকে কাজ করতে হবে। কিন্তু এমন কোনো কাজ করব না, যাতে অন্যের ক্ষতি হয়। এমন কাজ করব, যাতে অন্যের উপকার হয়। সেইভাবে বেঁচে থাকা, অন্যের পেছনে না লাগা, অন্যের কুখ্যাতি না করে সুখ্যাতি আর সবসময় হাসিমুখে থাকার নাম জীবন।

নিজের বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি, একপেশে হাসি, একই সঙ্গে দুর্দান্ত সাহস ও অসামান্য অভিনয় দক্ষতায় নব্বইয়ের দশকে সৌমিত্রবলয় থেকে বেরিয়ে ফেলুদাকে নিজের মতো করে সাজিয়ে তুলেছিলেন। কেমন ছিল সত্যিকারের ফেলুদা হয়ে ওঠার সুদীর্ঘ যাত্রা?

প্রথমেই বলি, আমি মোটেও সত্যিকারের ফেলুদা নই। কেবল রূপালি পর্দাতেই ফেলুদা রূপে আমার উপস্থিতি দর্শকের চোখে পড়ে। আমরা মনে করি, সত্যিকারের ফেলুদা হলেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায়। আমি সবসময় ফেলুদার ভূমিকায় অভিনয় করতে চাইতাম। একদিন সত্যজিৎ রায়ের কাছে গিয়ে বলেছিলাম, আমার স্বপ্নের চরিত্রটিতে একবারের জন্য হলেও যেন আমাকে কাজের সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি বলেছিলেন, 'আমি আর ফেলুদা বানাব না, কারণ সন্তোষ দত্ত বেঁচে নেই।' এরপর যখন সত্যজিৎ রায়পুত্র সন্দীপ রায় আমাকে ফোন করে বললেন, টেলিভিশনের জন্য 'বাক্স রহস্য' নির্মাণ করছি। আপনি কি ফেলুদা চরিত্রে অভিনয় করতে ইন্টারেস্টেড? আমি বললাম, 'ইন্টারেস্টেট মানে আমি এক্ষুনি আসছি। এরপর গেলাম। সেখানে আমার মেকআপ টেস্ট হলো। সেখানে ছিলেন সন্দীপ রায়, ললিতা রায় এবং বিজয়া রায়। আমি স্বভাবতই একটু নার্ভাস, মেকআপ হয়ে যাওয়ার পর সবাই বেশ পরখ করে দেখলেন। সবাই বেশ চুপ। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে বিজয়া রায় বললেন, ভালোই তো লাগছে। সেদিন জানলাম আমি 'ফেলুদা'র ভূমিকায় অভিনয় করছি। এর ২০ থেকে ২২ দিন পর 'বাক্স রহস্য'র কাজ শুরু হলো।

যেদিন ছবিটির দৃশ্যধারণ শুরু হলো, সেদিন আমি খুব নার্ভাস ছিলাম। কারণ আমার প্রথম শট ছিল হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। আমি ভাবলাম, কী হবে। শট শেষ হলো। সবাইকে দেখানো হলো। সবাই খুব প্রশংসা করল। আমি ভাবলাম যাক উতরে গেছি। পরীক্ষায় পাস করেছি। শেষ পর্যন্ত সন্দীপ রায় বললেন, ভালোই হয়েছে। কিন্তু একটু সমস্যা হয়েছে। আপনার সংলাপ বলাটা খুব গম্ভীর হয়ে গেছে। বাচ্চারা পর্যন্ত ভয় পাচ্ছে। সন্দীপ রায় চাইছিলেন একটু নরম করে কথা বলি। পরের দিকে সব ঠিক করে নিয়েছিলাম।

ফেলুদার ভূমিকায় আপনাকে আরও দেখার সুযোগ আছে?

সুযোগ আছে। কিন্তু কবে হবে সেটা জানা নেই। কারণ জটায়ুকে পাওয়া যাচ্ছে না। জটায়ু ছাড়া ফেলুদার ছবি হয় না। কারণ তোপসে আর ফেলুদা ভীষণ সিরিয়াস হয়ে আছে, যা দেখে লোকের ভালো লাগবে না। কারণ সবক'টা গল্পেই কে দোষী তা শেষে গিয়ে বোঝা যায় বইতে। কিন্তু সিনেমায় থ্রিলার ফরমেটে করা হয়। আগে থেকেই বলে দেওয়া হয় কে দোষী। ফেলুদা তাকে কীভাবে ধরলো। না হলে মূল্য থাকে না। এমন গল্পে জটায়ু থাকাটা খুব প্রয়োজনীয়। ফলে জটায়ুকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত ছবি হবে না। ততদিনে আমি আর ফেলুদা করতে পারব কি-না জানি না। তবে আশা রাখছি, করতে পারব। চুলটাকে একটু কালো করতে হবে। ভূঁড়িটা কমাতে হবে। কিছু ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করতে হবে। তাহলেই আমি ফিরব।

ফেলুদার গল্পে তোপসে চরিত্রে অনেকেই এসেছেন?

হ্যাঁ। প্রথমে তোপসে ছিল শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, এরপর পরমব্রত, তারপর এলো সাহেব ভট্টাচার্য। এদিকে আমার বয়স বেড়েই চলছে, অন্যদিকে তোপসের বয়স কমেই যাচ্ছে।

ফেলুদা চরিত্রের বৈশিষ্ট্য কেমন?

ফেলুদা সবসময় মেরুদণ্ড সোজা করে বসবে, পায়ের ওপর পা আড়াআড়ি করে তুলবে, কথা বলার আগে সোজা চোখের দিকে তাকাবে। প্রচুর চা পান করবে, সঙ্গে থাকবে চানাচুর। কড়া পাকের সন্দেশ, খয়ের ছাড়া মিষ্টি পান খুব পছন্দ তার। ভালো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে জানেন। আর বাংলা, হিন্দি আর ইংরেজি ভাষায় ভীষণ পারদর্শী।

য়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফি আপনার নেশা...। এই শখটি পেয়েছেন কী করে?

বন্যপ্রাণীর ছবি তুলতে আমার ভালো লাগে। সবাইকে সচেতন করার জন্য বন্যপ্রাণী নিয়ে লেখালেখি করি। বন্যপ্রাণীর ছবি তোলার নেশা পেয়েছি আমার বাবা ও মায়ের কাছে থেকে। তার চিরকালই ছিলেন প্রকৃতি ও পশুপ্রেমী। আমাদের বাড়িতেও অনেক পোষ্য ছিল। আমার মামাবাড়িতেও অনেক পোষ্য ছিল। জঙ্গলে যেসব প্রাণী থাকে, তারা আমাদের থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী। একটি হরিণের বাচ্চা জন্মের পর আধাঘণ্টা লাগে উঠে দাঁড়াতে। দু'দিনে হাঁটতে পারে, চার দিনে দৌড়াতে পারে। প্রকৃতি তাকে সেই শক্তি দিয়েছে। প্রাণীদের রয়েছে অসাধারণ শক্তি, শুধু বুদ্ধি নেই। এই পৃথিবীতে বন্যপ্রাণী আছে বলেই আমরা আছি। আমি বন্যপ্রাণী সম্পর্কে জেনে তাদের প্রেমে পড়ে যাই। সেই প্রেম আমার এখনও রয়েছে। আর সে কারণে আমি সময় পেলেই জঙ্গলে যাই। ছবি তুলি। মাঝেমধ্যে দেখি, আনন্দ পাই।

'গণ্ডি' ছবিতে আপনার অভিনীত 'আলী আজগর' চরিত্রটি নিয়ে বলুন।

বয়স ছাড়া এই চরিত্রের সঙ্গে বোধ হয় আমার কোনো মিল নেই। কারণ এর আগে বেশিরভাগ চলচ্চিত্র বা নাটকে আমি হয় গুণ্ডা না হয় পুলিশ, নয় গোয়েন্দা চরিত্রে অভিনয় করে আসছি এতদিন। আমার যা নাম হয়েছে ওইসব চরিত্রের জন্যই। অভিনয়ের শুরুর দিকে দু-একটি ছবিতে এ ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছি। পরে আর করা হয়নি। হয়তো আমার এমন চেহারার জন্য কেউ আর ওই ধরনের চরিত্রে আমাকে ডাক দেয়নি। গণ্ডির পরিচালক ফাখরুল আরেফীন খান কেন আমাকে এই চরিত্র দিয়েছেন, সেটাও বুঝতে পারছি না। আর আমার যে চেহারা তাতে অভিনেতা হওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না। শুটিংয়ের প্রোডাকশনে যিনি চা এনে দেন, আমার তারচেয়েও অনেক কম গুণ।

আপনি কখনোই নিজেকে শিক্ষিত বলেন না। এটা কি আপনার বিনয়?

আমি ইমপালসিভ মানুষ। সত্যি তো, আমি অত শিক্ষিত মানুষ নই। শিক্ষিত মানুষ কেমন হন, তা আমি জীবনে দেখেছি। আমি তাদের মতো নই। শুধু একটা ডিগ্রি থাকলেই শিক্ষিত হওয়া যায় না। শিক্ষিত মানে অনেক কিছু।

আপনি ভালো অভিনয় জানেন। থিয়েটারে নাট্যচর্চা করেছেন। ওয়াইন্ড লাইফ ফটোগ্রাফি নিয়ে আপনার যথেষ্ট চর্চা। তারপরও নিজেকে এমন বলছেন কেন?

আজকাল প্রায় সবার হাতেই রয়েছে ক্যামেরা। ছবি তুলতে পারি মানে এই নয় যে, আমি শিক্ষিত। আমি সব রকমের কাজ করি মানে আমি খুব ভালো মিস্ত্রি।

অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফা ও পরিচালক ফাখরুল আরেফীন খানের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?

ফাখরুল আরেফিনের কাছে গল্প শুনেই আমি এতে অভিনয় করতে রাজি হয়েছিলাম। তখনও জানতে চাইনি, আমার সহশিল্পী কে। যখন গত মার্চে ছবিটির কাজ করতে বাংলাদেশে এলাম, তখন সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হয়। তার সম্পর্কে ধীরে ধীরে অনেক কিছু জানি। তাকে আমার খুব বিনয়ী একজন অভিনেত্রী বলে মনে হয়েছে। তার সঙ্গে আমার কাজের অভিজ্ঞতাও দারুণ। অনেক ভার্সেটাইল অভিনেত্রী তিনি। অন্যদিকে ফাখরুল আরেফীন খানের গণ্ডির টিমের সবাই বেশ তরুণ। এতে বয়স্ক বলতে আমি আর সুবর্ণা মুস্তাফা। তাদের সঙ্গে কাজ করে অনেক ভালো লেগেছে।