ডনগিরি নির্মাতাদের কাছ থেকে একটা চমকিত সংবাদ শুনলাম। তাদের ছবির নাম ছিল সাদাকালো প্রেম। বর্তমান চলচ্চিত্রের ব্যবসায়ী বোদ্ধাদের (যাদের কল্যাণে চলচ্চিত্র ব্যবসা এখন ডুবতে বসেছে) বুদ্ধিতে তারা নাম পরিবর্তন করেছেন। তারা বলেছেন এইসব সামাজিক রোমান্টিক মার্কা নামের ছবি এখন চলবে না। অ্যাকশান নাম রাখেন তা নইলে হলে চালানো যাবে না। তাই তারা ছবি মুক্তির স্বার্থে হল পেতে ছবির নাম বদলে ডনগিরি রেখেছেন। ছবির ভুল শুধু এটুকুই। ছবি নির্মাণের শেষে এসে একটা সুন্দর পারিবারিক ছবির নাম বদলে ডনগিরি রাখতে গিয়ে যেসব মারামারি বা অ্যাকশন লাগাতে হয়েছে তাতেই গল্পের যা ক্ষতি হওয়ার হয়েছে। একজন দক্ষ সামাজিক ছবির পরিচালক শাহ আলম মন্ডল সামাজিক মিষ্টি একটা প্রেমের গল্পকে অবাস্তব অ্যাকশনের গল্পে রূপান্তর করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই একটু হাবুডুবু খেয়েছেন। এতে তার কোনো দোষ নেই। বর্তমানে সিনেমা হলকেন্দ্রিক এক ধরনের দালালদের হাতে সবাই জিম্মি।

যেহেতু ছবি শেষ হওয়ার আগেই কাহিনি ও সংলাপ লেখক যোশেফ শতাব্দী ইন্তেকাল করেছেন তাই গল্পকে আর তার গুছিয়ে যাওয়া হয়নি।

গল্প নিয়ে তাই আর বিশদ ব্যাখ্যায় না গিয়ে অভিনয় প্রসঙ্গে আসি। নবাগত নায়িকা এমিয়া এমি খুবই সাবলীল অভিনয় করেছেন। তার হাঁটাচলা, সংলাপ প্রক্ষেপণে নবাগতার কোনো জড়তা পরিলক্ষিত হয়নি। এটা সম্পূর্ণই পরিচালকের কৃতিত্ব। বাপ্পী আর আনিসুর রহমান মিলন তাদের নিজ নিজ চরিত্রে গল্প অনুযায়ী যা করার করে গেছেন। তবে মাঝে মাঝে মিলনের রূপসজ্জার কন্টিনিউটি রাখা যায়নি। এই ছবির রূপসজ্জাকর জামাল ও কাজি সেলিম মাঝে মাঝে বাপ্পী, মিলন ও এমিয়াকে খুবই সুন্দর করে তুলেছেন, আবার মাঝে মাঝে বৈসাদৃশ্য করে ফেলেছেন। দুইজনের মধ্যে কোনজন এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন তা বলা যাবে না। হাসান ইমাম ও লায়লা হাসানের স্বামী-স্ত্রীর কমেডি ধাঁচের অভিনয় খুবই প্রাণবন্ত হয়েছে এবং দর্শক প্রাণভরে উপভোগ করেছেন। আলীরাজ, সাদেক বাচ্চু, অরুণা বিশ্বাস, কাজী হায়াত, কমল পাটেকর তারা যে ধরনের অভিনয় করে থাকেন তার কোনো ব্যাতিক্রম করেননি। তবে অমিত হাসান একটু ব্যতিক্রমী হতে অসাধারণ চেষ্টা করেছেন।

উল্লেখযোগ্য কোনো অভিনয় না করলেও শিল্পী তালিকায় আরও ছিলেন খোরশেদ আলম খসরু, জিয়া তালুকদার, রতন, এস আই ফারুক, রেজাউল ও নবাগত ঐশিক শামীম।

গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ও ইমন সাহার সুরে কণ্ঠশিল্পী পুলক অধিকারীর গাওয়া গান- 'এক বরষার বৃষ্টি দিয়ে আমার দু'চোখ ধোব' দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। এ ছাড়া আইটেম গানটাও দেখার মতো। দেখার কথা এই জন্য বলছি যে, ওতে যে তিনটা মেয়ে তিন অংশে নৃত্য করেছেন তারা নাচের নামে অনেক শারীরিক কসরত দেখিয়েছেন। তবে গানে সবচেয়ে মজা পেয়েছেন দর্শক হাসান ইমামের কণ্ঠে গান শোনে। কমেডি ধাঁচের এই গানটা নতুনত্বের দাবিদার। অনেক বিখ্যাত গায়ক-গায়িকা সাবিনা ইয়াসমীন, কুমার বিশ্বজিৎ, কনক চাঁপা, রূপম, লেমিস, ইমরান ও পড়শী এই ছবিতে গান করেছেন কিন্তু মনে রাখার মতো গান ওই তিনটি। ফাইটে ডি এইচ চুন্নু ভালো, তবে অযথা ফাইট লম্বা করা এবং অকারণে শিল্পীর পেছনে বোমা বিস্ম্ফোরণ ঘটানোর বদঅভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে।

কোরিওগ্রাফার হিসেবে ছিলেন তিনজন- মাসুম বাবুল, সাইফ খান কালু ও হাবিব। তারা কে কোন গানটার কোরিওগ্রাফি করেছেন জানা গেলে প্রশংসাটা সেভাবে ভাগ করে দিতাম। কিন্তু জানার কোনো উপায় নেই। শিল্প নির্দেশক ফরিদ খুবই কম সুযোগ পেয়েছেন তার নৈপুণ্য দেখাতে। তবে যতটুকু করেছেন ভালো করেছেন।

তৌহিদ হোসেন চৌধুরী ছাড়া এখন কোনো ছবির এডিটরের নাম দুরবিন দিয়ে খুঁজতে হয়। প্রায় সব ছবির সম্পাদনার কঠিন দায়িত্ব এখন তার। এই ছবিতেও সেই কঠিন দায়িত্ব পালন করেছেন। এস এম আজহারের চিত্রগ্রহণ সুন্দর।

মোশরাফ হোসেন নিবেদিত ও এস এস কথাচিত্র ইন্টারন্যশানাল পরিবেশিত ডনগিরি সুচারুভাবে পরিচালনা করেছেন শাহ আলম মন্ডল। আমারই অনুজপ্রতিম প্রিয় পরিচালক তাই উপদেশ দেওয়ার একটা সুযোগ যখন আছে সেটা বলি-ছবির নাম নিয়ে একটু ভাবতে হবে ভাই। গল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শুধু না টার্গেট অব দর্শক চিন্তা করে ছবির নামকরণ করতে হবে নইলে ছবির নাম যথার্থ হবে না। ডনগিরি দেখতে পরিবার আসবে না, আর ডনগিরির দর্শক সামাজিক প্রেমের ছবি দেখবে না। বলতে গেলে এই প্রেমের ছবির নাম ডনগিরি যথার্থ হয়নি।

লেখক :চলচ্চিত্র পরিচালক, লেখক ও সমালোচক

বিষয় : ডনগিরি বিনোদন

মন্তব্য করুন