সব্যসাচী অভিনয় ব্যক্তিত্ব হুমায়ুন ফরীদির ব্যবহার করা চশমা ‘অকশন ফর অ্যাকশন’এর মাধ্যমে গত বৃহস্পতিবার নিলামে উঠেছিলো। করোনাভাইরাসের কারনে সৃষ্ট দূর্যোগে যেন এখান থেকে প্রাপ্ত অর্থ সাধারন মানুষের উপকারে আসে, সেজন্য এমন প্রয়াস। ফেসবুক লাইভে আয়োজিত এই নিলামে অংশ নেন আফজাল হোসেন, আফসানা মিমি, তারিক আনাম খান, মিশা সওদাগর, ফরীদি তনয়া শারারাত ইসলাম দেবযানী। এই আয়োজনে অংশ নেয়ার ভাবনা ও হুমায়ুন ফরীদিকে নিয়ে কিছু স্মৃতি কথা তুলে ধরলেন তারা-  

আফজাল হোসেন

হুমায়ুন ফরীদি যখন অভিনেতা হয়ে ওঠেনি, তখন থেকে আমরা বন্ধু। বাংলাদেশের যেমন অনেক গৌরবগাথা রয়েছে। সেসব অনেক গৌরবগাথার সমতুল্য যোগ্যতা এ অভিনেতার ছিল। তার চশমা নিলামে বিক্রি করার আয়োজনে আমি অংশ নিয়েছিলাম। এর আগে সাকিব আল হাসানের ব্যাট, তাহসানের গানের মাস্টার ক্যাসেট নিলামে উঠেছে। এমন আয়োজনে যুক্ত হওয়া আমার জন্য ভালো লাগার বিষয়। তবে আমার চেয়েও ফরীদির মেয়ে দেবযানীর কাছে বিষয়টি আরও আবেগের। সে তার বাবার স্মৃতি নিলামে তুলেছে সাধারন মানুষের উপকারের আসার লক্ষ্যে। আমার আশা, দেশের এই ক্রান্তিকালে এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গীকে যেনো আরও বেশী করে সাধুবাদ জানানো হয়। মানুষের সম্পৃক্ততা যেনো আরও বাড়ে। নিলামে তোলা জিনিষটি কত দামে বিক্রি হলো, তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন আয়োজনে মানবিক মানুষ মহত কাজে এক প্লাটফর্মে কাজের সুযোগ পাচ্ছে। এই ধরনের চেষ্টা আরও অব্যাহত থাকুক এটিই কামনা।   

তারিক আনাম খান

বর্তমানে কোভিড-১৯ এর কারনে অনেকে মানবেতর জীবন যাপন করছে। বিশেষ করে খেঁটে খাওয়া মানুষরা। 'অকশান ফর অ্যাকশন' এর আয়োজনে এখন পর্যন্ত অনেক বিখ্যাত মানুষের পছন্দের অথবা ব্যাবহার্য জিনিষ নিলামে তোলা হয়েছে। সাধারন মানুষকে সহায়তা করার জন্য এমন উদ্যোগ প্রশংসনীয়। গত বৃহস্পতিবার অনলাইনে নিলামে বিক্রি হলো হুমায়ুন ফরীদির চশমা। বাংলাদেশের অনেক মানুষ এখনও ফরীদিকে কতটা পছন্দ করে, তা সেদিন আরও একবার দেখতে পেলাম। তার অসংখ্য অনুরাগী অনলাইনে এ আয়োজনে শামিল হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলে ফরীদি এখন নেই, কিন্তু তার এই ব্যবহার্য জিনিসটি সাধারন মানুষের উপকারে লাগছে। এই সময়ে ফরীদি বেঁচে থাকলে যে কী করত সেটা ভাবছি। এসব আয়োজনে হয়তো নিজেই অংশ নিত। আমার মনে হয় এই মুহূর্তে বাংলাদেশের মানুষের পাশে আছে ফরীদি। আমরা সমসাময়িক অভিনেতা ছিলাম। তার সঙ্গে সর্ম্পক ছিলো হৃদ্যতার। যদিও পরে যখন সে সিনেমায় ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলো, তখন যোগাযোগ কম হতো। একটা ঘটনা মনে পড়ছে, একবার রাতের বেলায় হুট করে ডাকাত দেখার জন্য আমাকে সাথে নিয়ে সে বেরিয়ে গিয়েছিলো। কিছু দূর যাওয়ার পরে মনে হলো ডাকাতের পাল্লায় পড়লে কী হবে। তখন বহু কষ্টে তাকে অর্ধেক পথ থেকে ফিরিয়ে এনেছিলাম।

মিশা সওদাগর

ফরীদি ভাই [হুমায়ুন ফরীদি] আমাদের অভিনয় জগতের জাদুকর। জীবনভর শুধু অভিনয়ই করে গেছেন তিনি। যতদূর দেখেছি ব্যক্তিগত জীবনে খুব পরিপাটি থাকতে পছন্দ করতেন । ব্যাবহার করতেন নামীদামী ব্রান্ডের জিনিসপত্র। চলমান করোনাভাইরাসের প্রার্দূভাব থেকে অসহায় মানুষদের সহযোগিতার জন্য তার বহুল ব্যবহৃত বস ব্রান্ডের চশমাটি নিলাম হয়েছে। দাতব্য সংস্থা ‘অকশন ফর অ্যাকশন’ দেশের জনপ্রিয় তারকাদের ব্যবহৃত জিনিস নিলামে তুলে অর্থ সংগ্রহ এ উদ্যোগ নিয়েছে। এই নিলাম থেকে হাঙ্গেরি প্রবাসী এক বাংলাদেশি কিনেছেন ফরীদি ভাইয়ের চশমাটি। নিলাম অনুষ্ঠানে বাসা থেকে আরও অনেক অতিথির সঙ্গে অন্তার্জালের মাধ্যমে আমিও যুক্ত হয়েছিলাম। ফরীদি ভাইকে নিয়ে নিয়ে নানা স্মৃতিচারণায় মেতে ওঠেন অতিথিরা। চশমাটি কত দামে বিক্রি হলো সেটা বড় কথা নয় ।  কিংবদন্তি শিল্পীর প্রতি মানুষের আবেগ কতখানি কাজ করে তা দেখে রীতিমতো আমি মুগ্ধ হয়েছি। আমাদের সাংস্কৃতির অঙ্গনের বিত্তবান কেউ যদি চশমাটি কিনতো তাহলে আরও  বেশী ভালো হতো। তখন তার স্মৃডু চিহ্ন আমাদের কাছাকাছি থাকতো। আগেও দিখেছি  কোন দেশে মহামারি হলে তারকা শিল্পীদের জিনিসপত্র নিলামে তোলা হয়। বাংলাদেশেও এটা শুরু হয়েছে। প্রিয় ফরীদি ভাইকে এখনও খুব  মনে পড়ে।  মনতাজুর রহমান আকবরের একটি ছবিতে তার সঙ্গে সর্বশেষ  অভিনয় করেছিলাম। তখন বস ব্যান্ডের এই চশমা পড়ে তাকে স্ক্রিপ্ট পড়তে দেখেছি। তবে চশমা ছাড়াই ক্যামরার সমানে দাঁড়াতেন তিনি। শূটিং সেটে জুনিয়র শিল্পীদের সঙ্গে যেভাবে মিশতেন সবাই মনে করতেন  আমাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বের। কখনই তার মধ্যে আমিত্ব দেখিনি। কারো সমালোচনা করতে দেখিনি। তাকে দেখেই নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করতে উৎসাহ পেয়েছি। ক্ষণজন্মা অভিনেতা  আমাদের মাঝে না থাকলেও তার কালজয়ী কাজ দিয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন যুগ যুগান্তরে..।  

শারারাত ইসলাম দেবযানী

এই ধরনের আয়োজনে যুক্ত হতে পারা নিশ্চয় ভালো লাগার। বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো আরও বড় পরিসরে সাধারন মানুষের উপকারে কিছু করতেন। যখন এই আয়োজনে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব এলো,মনে হয়েছে আমার এখানে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন। বাবা থাকলেও তাই করতেন। ওরা বললো, বাবার ব্যক্তিগত ব্যবহারের কিছু নিলামে দিতে। চশমাটি আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান মনে হয়েছে। বিভিন্ন কাজে, শুটিংয়ে, ইন্টারভিউতে চশমাটি বাবা পড়তেন। ভাবলাম যিনি এটি কিনবেন, কদর বুঝেই কিনবেন। সেই জায়গা থেকেই চশমাটি নিলামে তোলা হয়। এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে ধন্যবাদ দিতে চাই। চশমা বিক্রির অর্থ সাধারন মানুষের উপকারে দেয়া হবে। যিনি কিনেছেন তাকে বিশেষ করে ধন্যবাদ দিবো। হাঙ্গেরী প্রবাসী ভদ্রলোক যদিও নিজের পরিচয় নিলামের সময় প্রকাশ করেননি। তবে জানিয়েছেন বাবা অভিনয়ের ভক্ত তিনি। এটিও বলেছেন মেয়েকে উপহার দেয়ার জন্য চশমাটি কিনেছেন। তবে আমার কাছে এ ঘটনা কোনো কাকতাল কি না জানি না। মনে হয়েছিলো প্রকৃতির কোনো খেলা। আমার বাবার চশমা, মানে একজন মেয়ে তার বাবার চশমা দিচ্ছেন আরেকজন বাবা তার মেয়েদের জন্য চশমাটা কিনছেন—এর থেকে সুন্দর আর কিছু হতে পারে না।