‘বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার মহান অধিপতি, তোমার শেষ উপদেশ আমি ভুলিনি জনাব…’ সংলাপটি খুবই পরিচিত দেশের মানুষের কাছে। এই একটি সংলাপ দিয়েই বাংলা চলচ্চিত্রে একজন অভিনেতাকে খুব সহজেই আলাদা করা যায। তিনি আর কেউ নন। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কালজয়ী এক অভিনেতা আনোয়ার হোসেন।

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ-দৌলা’র রাজত্ব শেষ হলেও, বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর সুনিপুন রূপায়ন এর মধ্য দিয়ে আজও বেঁচে আছেন। সেই রূপায়নের মধ্য দিয়ে অভিনেতা আনোয়ার হোসেন হয়েছেন মুকুটহীন নবাব। আজ এই মুকুটহীন সম্রাটের ৯০তম জন্মদিন।

আনোয়ার হোসেনের জন্ম ১৯৩১ সালের ৬ নভেম্বর জামালপুর জেলার সারুলিয়া গ্রামে। পিতা নজির হোসেন এবং মাতা সাঈদা খাতুনের তৃতীয় সন্তান আনোয়ার হোসেন স্কুলজীবন থেকেই থিয়েটারে অভিনয় করে মানুষের মন জয় করেন। স্কুল জীবনে আসকার ইবনে শাইখের ‘পদক্ষেপ’ নাটকে প্রথম অভিনয়। ১৯৫১ সালে ম্যাট্রিক পাসের পর ভর্তি হন ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে। ১৯৫৭ সালে ঢাকায় আসেন।

সাদাকালো থেকে রঙিনের ছোঁয়া লাগা বাংলা সিনেমার অন্যতম এক সাক্ষী তিনি। অভিনয়ে হাতেখড়ি স্কুল জীবনেই। আর চলচ্চিত্রে অভিষেক ১৯৫৮ সালে ‘তোমার আমার’ ছবি দিয়ে। ১৯৬৪ সালের ১ মে তার অভিনীত ‘দুই দিগন্ত’ ছবি দিয়ে ঢাকার ‘বলাকা’ সিনেমা হলের উদ্বোধন হয়েছিল।

রূপালী জগতের তারকা ছবি বিশ্বাস, কাননদেবী ইত্যাদি-র প্রতি আকর্ষণ থেকে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সিদ্ধান্ত নেন আনোয়ার হোসেন। পরিচালক মহিউদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করেন তিনি। মহিউদ্দিন তখন ‘মাটির পাহাড়’ চলচ্চিত্র নির্মানের কাজ করছেন। চলচ্চিত্রের জন্য সকল চরিত্র নির্দিষ্ট হয়ে যাওয়ায় আনোয়ার হোসেন এ ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পাননি, কিন্তু পরবর্তী ছবি ‘তোমার আমার’-এ খলনায়ক ‘বীরেন’ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। এরপর পড়ালেখা  শেষ করে শুরু করেন অভিনয়। প্রথম দিকে খলনায়ক চরিত্রে অভিনয় করলেও পরবর্তীতে তিনি চরিত্রাভিনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তার অভিনয় দক্ষতা এতটাই  বেশি ছিল যে- পার্শ্ব চরিত্রগুলো অনেক সময় তাকে অনুসরণ করতো। ১৯৬৭ সালে খান আতাউর রহমানের পরিচালনায় নবাব সিরাজউদ্দৌলা চলচ্চিত্রে নাম ভূমিকায় দুর্দান্ত অভিনয়ের কারণে তিনি মুকুটহীন সম্রাট উপাধি লাভ করেন।

৫২ বছরের অভিনয় জীবনে আনোয়ার হোসেন প্রায় পাঁচ শতাধিক ছবিতে অভিনয় । মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে সংগ্রামী ছাত্রনেতা, ভাষা আন্দোলনের উদ্দীপ্ত যুবক, দুঃখি পিতা- এমন বহু বর্ণময় চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের হূদয়ে স্থায়ী আসন গেড়েছিলেন।

১৯৬৭ সালে ‘নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা’য় অভিনয় করে নিগার পুরস্কার পেয়েছিলেন। ১৯৭৮ সালে আমজাদ হোসেন এর ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ চলচ্চিত্রে সহ-অভিনেতার চরিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। বাংলা চলচ্চিত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৫ সালে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। অভিনেতাদের মধ্যে আনোয়ার হোসেন প্রথম একুশে পদক পান।  ২০১০ সালে চলচ্চিত্রে সামগ্রিক অবদানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার আজীবন সম্মাননা লাভ করেন আনোয়ার হোসেন।

আনোয়ার হোসেন কলকাতা, মুম্বাই ও লাহোরের চলচ্চিত্রের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।