গান, কবিতা, চোখের জল আর 'গান স্যালুটে' শেষ বিদায় জানানো হলো ভারতীয় বাংলা সিনেমার কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে। রোববার দুপুরে পশ্চিমবঙ্গের বেলভিউ নার্সিংহোমে ৮৬ বছর বয়সে মৃত্যু হয় তার। সন্ধ্যায় কলকাতার কেওড়াতলা মহাশ্মশানে সম্পন্ন হয় শেষকৃত্য।

ভারতের সংবাদ মাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বেলা আড়াইটার দিকে সৌমিত্রের মৃতদেহ হাসপাতাল থেকে নেওয়া হয় কলকাতার গল্ফগ্রিনের বাড়িতে। সেখানে আত্মীয়-স্বজনরা শেষ শ্রদ্ধা জানান। এরপর কফিন নেওয়া হয় তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল টেকনিশিয়ানস স্টুডিওতে। সাড়ে ৩টার দিকে রবীন্দ্রসদনে নেওয়া হয় মৃতদেহ।

পদযাত্রা করে রবীন্দ্রসদন থেকে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয় দুই বাংলার জনপ্রিয় এই অভিনেতার মৃতদেহ। সেখানেই গার্ড অব অনার দেওয়া হয় তাকে। সৌমিত্রের শেষকৃত্যে ছিল রবি ঠাকুরের গান, কবিতা আর অশ্রুমাখা ফুল, সবশেষে ‘গান স্যালুট'।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অরূপ বিশ্বাস, ইন্দ্রনীল সেন, মালা রায়, বিমান বসু প্রমুখ। বাবার শেষযাত্রায় চোখের জল বাঁধ মানেনি মেয়ে পৌলমীর। অঝোরে কাঁদেন তিনি।

অভিনেতার শেষ যাত্রায় হেঁটেছেন নায়ক দেব, রাজ চক্রবর্তী, কৌশিক সেনসহ বহু মানুষ। রবীন্দ্রসদনে সৌমিত্র ভক্তদের ভিড় ছিল উপচেপড়া। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই চলে শেষ শ্রদ্ধা জানানো।

৪০ দিন কলকাতার বেলভিউ নার্সিং হোমে ছিলেন সৌমিত্র। গত ২৪ অক্টোবর রাত থেকে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে।

চিকিৎসকরা জনান, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন সৌমিত্র। চিকিৎসায় করোনামুক্তও হয়েছিলেন। কিন্তু শরীরে থাকা বার্ধক্যজনিত নানা রোগের সঙ্গে লড়াই করে পেরে উঠছিলেন না। দীর্ঘদিন লাইফ সাপোর্টে থাকতে হয় তাকে। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। রোববার দুপুরে মৃত্যু হয় তার।

১৯৩৫ সালে কলকাতার মির্জাপুর স্ট্রিটে জন্ম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের। ছেলেবেলা কাটে ‘ডি এল রায়ের শহর’ কৃষ্ণনগরে। মা আশালতা চট্টোপাধ্যায় ছিলেন গৃহবধূ। বাবা মোহিত চট্টোপাধ্যায় পেশায় ছিলেন আইনজীবী। হাইস্কুল থেকেই অভিনয় শুরু করা সৌমিত্র কলকাতার সিটি কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক করার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে নেন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি।

চলচ্চিত্রের পাশাপাশি নাট্যশিল্পী হিসেবেও সৌমিত্র ছিলেন বিশিষ্ট। তার কর্মজীবন অবশ্য শুরু হয় আকাশবাণীতে, ঘোষক হিসেবে। পরে বাচিক শিল্পী হিসেবেও তিনি ছাপ রাখেন। তার কণ্ঠে রবীন্দ্রকবিতা বা জীবনানন্দ আচ্ছন্ন করে কবিতারসিক বাঙালিকে। কবিতা আবৃত্তি শুধু নয়, নিজে কবিতা রচনাও করেছেন তিনি। করেছেন পত্রিকা সম্পাদনার কাজ। তবে তিনি মূলত অভিনেতাই। বাঙালির অন্যতম প্রিয় নায়ক। ২০০৪ সালে ভারত সরকার তাকে 'পদ্ম ভূষণ' পুরস্কারে ভূষিত করে। ২০১২ সালে পান 'দাদাসাহেব ফালকে' পুরস্কার। এসব ছাড়াও ভারতে এবং ভারতের বাইরে বিভিন্ন দেশে নানা পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন এ অভিনেতা।