ক'দিন পরই নতুন বছরের ক্যালেন্ডার উঠবে দেয়ালে। ২০২০-এর পরিবর্তে ২০২১। অতীত হয়ে যাওয়া পুরো বছরের সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব কষে নতুন বছরকে বরণ করে নেবেন সবাই। নতুন ছকে হাঁটবে ঢাকাই শোবিজও। বিগত বছরের ঢাকার চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি কতটা সাফল্য আর ব্যর্থতার পথে হাঁটল তার একটা হিসাব-নিকাশ নিয়েই এই প্রতিবেদন। লিখেছেন-অনিন্দ্য মামুন

হতাশার মেঘ সরছে না ঢাকাই চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি থেকে। দিন যায় দিন আসে, বছর ঘুরে আসে নতুন বছরও। পুরো বছরেই নানা আশার বাণী শোনা যায়। কেটে যাবে হতাশা, আসবে সুদিন। কিন্তু সুদিন আসে না। বলা যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমেই যেন বিলুপ্তির দিকে যাচ্ছে দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্প। কিছুতেই বিপর্যয় থেকে কাটিয়ে উঠতে পারছে না দেশের সবচেয়ে বড় এই বিনোদন মাধ্যমটি। বিগত আট-নয় বছর ধরেই দেশীয় চলচ্চিত্র দর্শক-খরায় ভুগছে। এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো অবস্থা। মুক্তিপ্রাপ্ত কোনো ছবিই ব্যবসা সফল হওয়া তো দূরের কথা, মূলধনও তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে। সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির সালতামামি টানলে চলতি ২০২০ সালটা চলচ্চিত্রের জন্য মোটেও সুখকর ছিল না।

বাণিজ্যিক ও বিকল্পধারার ছবি মিলিয়ে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতির তথ্যমতে, ১২টি ছবি মুক্তি পেয়েছে প্রেক্ষাগৃহে। এই হলো ঢাকাই চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির পুরো বছরের হিসাব। তাই বলা যায়, বছর যাচ্ছে আর ঢাকার চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি আরও নামছে নিচের দিকে। ছবি মুক্তির পাশাপাশি কমছে হলের সংখ্যাও। ঢাকাই চলচ্চিত্রের নির্ভরযোগ্য কোনো বক্স অফিস নেই। মুক্তির পর তাই কোন সিনেমা কত ব্যবসা করল বা কত লস করল তার নিরেট হিসাব পাওয়া কষ্টসাধ্য ব্যাপার।

'গণ্ডি' ছবির পোস্টার

২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত সাতটি বাংলা সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল হলে। এগুলো হলো- 'জয় নগরের জমিদার', 'গণ্ডি', 'হুদয়জুড়ে', 'চল যাই', 'বীর', 'হলুদবনি' ও 'শাহেনশাহ'। এই সিনেমাগুলোর মধ্যে দুই-একটা ছাড়া বাকিগুলো তেমনভাবে দর্শকপ্রিয়তা পায়নি বলে জানিয়েছে প্রযোজক ও প্রদর্শক সমিতি, হল মালিক ও সিনেমা সংশ্নিষ্ট একাধিক সূত্র। এরপর মার্চে করোনায় অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও সিনেমা থমকে গিয়েছিল। সিনেমার ঝলমলে রঙিন দুনিয়ায় নামল হতাশার পর্দা।

যদিও ঢাকাই সিনেমায় এই হতাশা চলছিল বহু আগে থেকে। তবে ২০১৯ সালের শেষে চলচ্চিত্রের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট প্রায় সবাই বলেছেন, ২০২০ সাল হবে ঢালিউডের বিপ্লবের বছর। বছর শুরুতে সেই চিত্র ছিল একেবারের ভিন্ন। কারণ ২০২০ সালের প্রথম শুক্রবার [৩ জানুয়ারি] কোনো ছবি মুক্তি পায়নি। পরের সপ্তাহে [১০ জানুয়ারি] মুক্তি পায় শাখাওয়াত হোসেনের 'জয়নগরের জমিদার'। এরপর ৭ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পায় ফাখরুল আরেফিন খানের 'গণ্ডি', রফিক সিকদারের 'হৃদয়জুড়ে', মাসুমা রহমান তানির 'চল যাই', কাজী হায়াতের 'বীর', বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত 'হলুদবনি'। এগুলোর মধ্যে আলোচিত হয়েছে সুবর্ণা মুস্তাফা ও সব্যসাচী চক্রবর্তী অভিনীত 'গণ্ডি'।

'রুপসা নদীর বাঁকে' ছবির একটি দৃশ্য

অন্যদিকে কাজী হায়াতের 'বীর' ব্যবসা সফল দাবি করেছে প্রযোজনা সংস্থা। অন্যদিকে শাকিব খান, নুসরাত ফারিয়া ও রোদেলা জান্নাত অভিনীত 'শাহেনশাহ' এ বছরে মুক্তি পেলেও আলোচনা বা ব্যবসা কোনোটিরই ভাগিদার হতে পারেনি। এই ছবির মাধ্যমেই প্রথমবার জুটি হয়েছেন শাকিব এবং নুসরাত ফারিয়া। এরপর মুক্তি পায় যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত 'হলুদবনি'। সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের 'হলুদবনি' উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবির প্রধান তিন চরিত্রে অভিনয় করেন বাংলাদেশের নুসরাত ইমরোজ তিশা, পশ্চিমবঙ্গের পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় ও পাওলি দাম।এরপর করোনার কারণে প্রেক্ষাগৃহে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। দীর্ঘ সাত মাস বন্ধ থাকার পর স্বাস্থ্যবিধি মেনে ১৬ অক্টোবর থেকে আবারও চালু হয় সিনেমা হল আর ২৩ অক্টোবর থেকে চালু করে দেশের মাল্টিপ্লেপগুলো। সিনেমা হল খোলার পর বড় বাজেটের নতুন সিনেমাগুলো মুক্তি দেননি পরিচালক, প্রযোজকরা। এগিয়ে আসেন হিরো আলম। তিনি মুক্তি দেন নিজের অভিনীত ও প্রযোজিত 'সাহসী হিরো আলম'।

তারপর মুক্তি পায় মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের 'ঊনপঞ্চাশ বাতাস'। এরপর মুক্তি পায় 'রংবাজ-দ্য লাফাঙ্গ', 'বায়োগ্রাফি অব নজরুল'। ডিসেম্বরে মুক্তি পায় চয়নিকা চৌধুরীর 'বিশ্বসুন্দরী'। ছবিটি বেশ আলোচিত হয়। মুক্তি পায় তানভীর মোকাম্মেলের 'রূপসা নদীর বাঁকে'। আর শাকিব খানের আলোচিত ছবি 'নবাব এলএলবি' মুক্তি পায় আই থিয়েটারে। অনন্য মামুন পরিচালিত ছবিটি পুরো নয়, আংশিক মুক্তি দেওয়া হয়।