কোহিনূর আক্তার সুচন্দা। বরেণ্য অভিনেত্রী ও নির্মাতা। সম্প্রতি ২০১৯ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি। শিল্পী জীবনের এই অর্জন এবং প্রখ্যাত নির্মাতা জহির রায়হানের অন্তর্ধান দিবস ও অন্যান্য প্রসঙ্গে কথা হয় তার সঙ্গে

শুনলাম, বাইপাস সার্জারি করিয়েছেন। এখন কেমন আছেন?

মোটামুটি আছি। শরীর খুব ভালো নেই। এখন একটু একটু করে সুস্থ হয়ে উঠছি। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০১৯-এ আজীবন সম্মাননা পেলেন। এই প্রাপ্তি নিয়ে আপনার অনুভূতি জানতে চাই ...

যে কোনো কাজের স্বীকৃতি আনন্দের। দেরিতে হলেও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা পেয়েছি। এ পুরস্কার নিয়ে আনন্দের পাশাপাশি আছে দুঃখকষ্ট। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের আগে আমার বাইপাস সার্জারি হয়। যে কারণে আমি উপস্থিত থেকে সম্মাননাটি নিতে পারিনি বলে আমার কিছু কথা চিরকুটে লিখে কর্তৃপক্ষকে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তা অনুষ্ঠানে পড়া হয়নি। তাই প্রধানমন্ত্রী জানতেও পারলেন না কেন অনুষ্ঠানে হাজির হতে পারলাম না। আয়োজনের সঙ্গে যারা ছিলেন তারা কেন এমন করলেন? এটা আমার কাছে অনেক বেশি দুঃখের এবং কষ্টের।

বেশ কয়েক বছর হলো অভিনয় থেকে দূরে। অভিনয় মিস করেন না ...

যখন কোনো কাজ থাকে না, তখন সিনেমার কথা বেশি মনে পড়ে। বলতে গেলে একটা সময় এফডিসি ছিল আমার ঘরবাড়ি। বিভিন্ন শুটিং ফ্লোরে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করেছি। এফডিসির গাছগাছালি, ইট-পাথরের সঙ্গে আমার স্মৃতি রয়েছে। ৬০-এর দশকে যখন চলচ্চিত্রে আসি, তখন উর্দু ছবির রমরমা ব্যবসা ছিল। হলেও সেসব ছবি চলত। তখন সবাই মিলে একত্র হয়ে বাংলা ছবির জন্য অনেক কষ্ট করেছি। বাংলা সিনেমাকে প্রতিষ্ঠিত করাই আমাদের ব্রত ছিল। আমার রক্তমাংসের সঙ্গে মিশে আছে সিনেমা। জীবনে সবচেয়ে সুন্দর সময় এ মাধ্যমের সঙ্গে কাটিয়েছি। জীবনে নানা চড়াই-উতরাই গেছে। আমি যাদের সঙ্গে কাজ করেছি তারা অনেকেই পৃথিবীতে নেই। তাদের কথাও খুব মনে পড়ে। স্বামী জহির রায়হান মারা যাওয়ার পর চলচ্চিত্র থেকে দূরে ছিলাম। আবার ফিরে এসেছি। এখনও চলচ্চিত্রের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। যতদিন বেঁচে থাকব চলচ্চিত্রের সঙ্গেই থাকব।

আজ আপনার স্বামী বরেণ্য নির্মাতা জহির রায়হানের মৃত্যুবার্ষিকী। তাকে নিয়ে বলুন।

১৯৭২ সালের এই দিনে জহির [জহির রায়হান] আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। দেখতে দেখতে কতগুলো বছর পার হয়ে গেল। টেরও পেলাম না। সত্যিই আমরা মানুষরা বড় অদ্ভুত। একজন চলচ্চিত্রকার বা গল্পকার হিসেবে তার গুণের কথা সবাই জানেন। তবে তার এমন কিছু গুণ ছিল, যা অনেকের অজানা। সারাক্ষণ মজা করতেন। জ্যোতিষশাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। হাত দেখে অনেক কথা বলে দিতেন। যা অনেকে সময় বাস্তবের সঙ্গে মিলে যেত।

আজকে জহির রায়হান স্মরণে কি কোনো আয়োজন আছে?

পারিবারিকভাবে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। শুনেছি মুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটি অনলাইনে জহির রায়হানের চিন্তা কর্মের বিশ্নেষণমূলক বক্তৃতার আয়োজন করছে। কিন্তু এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। আমরা এখন শুধু জহির রায়হানের জন্ম ও মৃত্যুদিনে তাকে স্মরণ করি। এ দেশের শুধু চলচ্চিত্রে নয়, সৃষ্টিশীল অনেক কাজের সঙ্গে তার নাম রয়েছে। তাকে সেভাবে মূল্যায়ন করা উচিত বলে মনে করি।

জহির রায়হানের 'বরফ গলা নদী' নিয়ে ছবি নির্মাণের কথা বলেছিলেন ...

অনেক আগেই ছবিটির পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু নানা কারণে করা হয়ে ওঠেনি। তবে এবার কাজটি শুরু করব। বেঁচে থাকলে অবশ্যই ছবিটি নির্মাণ করব।

এবার ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। জহির রায়হানের 'জীবন থেকে নেয়া' চলচ্চিত্রের অর্ধশতক পূর্ণ হয়েছে গত বছর ...

'জীবন থেকে নেয়া' সিনেমায় দেখানো হয়েছে শিল্পের ছত্রছায়ায় পরাধীন বাংলার স্বাধীনতার ঘোষণা। এই ছবির মাধ্যমে জহির রায়হান মানুষকে সিনেমার মাধ্যমে জাগ্রত করেছেন। একটি দেশ, একটি সংসার, একটি চাবির গোছা, একটি আন্দোলন। নান্দনিক পোস্টারটি এখনও সবার চোখে ভাসে। 'জীবন থেকে নেয়া' অধিকার আদায়ের গল্প। খুব মনে পড়ে জহির রায়হান অনেক কষ্ট করে, মেধা দিয়ে, শ্রম দিয়ে রাতদিন পরিশ্রম করে সিনেমাটি নির্মাণ করেছিলেন। জীবনের এই সময়ে এসে সিনেমার দৃশ্যধারণের দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে। এই সিনেমার একজন শিল্পী হয়ে আমি নিজেও গর্ববোধ করি। হয়তো আমি একদিন বেঁচে থাকব না। কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে বেঁচে থাকব আমি এই অমর সৃষ্টির মাধ্যমে।

চলচ্চিত্রের এই সময়কে কীভাবে দেখেন?

খুব কঠিন সময় পার করছে চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত সব ধরনের লোক। ছবি নির্মাণ, হলের সংখ্যা কমে গেছে। এমনও লোক আছে, যারা একদম বেকার। তাদের কথা ভাবলে কষ্ট লাগে। এখনকার সময় চলচ্চিত্রকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসেন, এমন মানুষ হাতে গোনা।

অনুজ অভিনয় শিল্পীদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

এখনকার শিল্পীদের মেধা আছে। তারা যদি পুরোনো শিল্পীদের দেখে শিক্ষা নেয় তাহলে এগিয়ে যাবে। টাকাপয়সার কথা বেশি চিন্তা না করে অভিনয়ের দিকে তাদের আরও মনোযোগী হওয়া উচিত।


মন্তব্য করুন