স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে অনেক আয়োজন হচ্ছে, হয়তো আরও হবে। কিন্তু আমি মনে করি, দেশ ও সমাজের জন্য এই ৫০ বছর বড় কোনো সংখ্যা নয়, যা নিয়ে এত কিছু করতে হবে। কারণ, এখনও আমাদের আরও সামনে এগিয়ে যাওয়া বাকি। আমরা ভৌগোলিক স্বাধীনতা পেয়েছি; কিন্তু সামাজিক উন্নয়ন কি পুরোপুরি হয়েছে? এ প্রশ্নটা ঘুরেফিরে থেকেই যায়। এটা ঠিক, উন্নয়ন হচ্ছে; কিন্তু তার পরিধি আরও বাড়াতে হবে।

তার আগে যেটা দরকার, তা হলো বিভিন্ন বিষয়ে ভুলভ্রান্তি দূর করে বাস্তবতা মেনে নেওয়া। কিছু মানুষ আছেন, যারা বাস্তবতা মেনে নিতে চান না। দোষারোপ করেন একে অন্যের। রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে তর্কবিতর্কের শেষ নেই। কিন্তু সবাইকে সরে আসতে হবে তর্কবিতর্ক থেকে; ভাবতে হবে দেশের মঙ্গলের জন্য কী করা উচিত।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, স্বাধীনতার এত বছর পরেও ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা থেমে নেই। স্বাধীনতার পর থেকে একটি শ্রেণি চেষ্টা করে যাচ্ছে, ইতিহাসকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে; যার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। আবার ধর্মান্ধতাও এক ধরনের সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। যার যার ধর্ম সে সে পালন করবে- এতে কোনো বাধা থাকা উচিত নয়। কিন্তু ধর্মের দোহাই দিয়ে কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করবে- এটা মেনে নেওয়া যায় না। সত্যিকারের মুক্তি পেতে হলে কিছু বিষয়ে এখনই পরিস্কার হওয়া উচিত। নইলে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতেও আমরা তিমিরেই থেকে যাব।

আমার কথা শুনে অনেকে ভাবতে পারেন, আমি নিরাশাবাদী মানুষ। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। আমি আগেও আশাবাদী ছিলাম, এখনও আছি। তাই গত ৫০ বছরে যা হয়নি, তা হবে না বলেও বিশ্বাস করি না। একটা সময় মনে হতো, ইতিহাস বিকৃতির যে চেষ্টা বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, তাতে নতুন প্রজন্ম ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠবে। কিন্তু পরে দেখলাম, নতুন প্রজন্ম আমাদের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশের ইতিহাস সম্পর্কে দারুণ সজাগ। অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মনের মধ্যে লালন করছে। এর চেয়ে আশার কথা আর কী হতে পারে।

হয়তো সে কারণেই ক্ষণে ক্ষণে স্মৃতি রোমন্থনে ডুবে যাই। চোখে ভাসে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে কীভাবে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধের ময়দানে নেমেছিলাম। আজকের হিসাবে যেটা ৫০ বছর আগের ইতিহাস, আমার কাছে তা প্রতিদিনের মনে হয়। কত মানুষ, কত চরিত্র, কত ঘটনা- সেসব কি ভুলে থাকা যায়? যায় না। তাই তো বারবার মনে পড়ে, ২৫ মার্চের রাতে হঠাৎ শুনতে পাওয়া গুলির শব্দ কীভাবে জীবনের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছিল।

একাত্তরের সেই রাতে যখন জানতে পারি, রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের দিক থেকেই আসছে গুলির শব্দ, তখন নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারিনি। ঘটনা কী, তা জানতে বাচ্চুর (নাসির উদ্দীন ইউসুফ) সঙ্গে দেখা করতে যাই। জানতে পারি, পাকিস্তান আর্মিরা অ্যাটাক করেছে। চারপাশ থেকে আসছে শুধু গুলি আর গুলি। সারারাত ধরে বাতাসে ভেসেছে আর্তচিৎকার। সে ছিল ভয়াবহ এক নির্ঘুম রাত। যে রাত আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিল, করণীয় কী।

এর পরের ঘটনাও চলচ্চিত্রের মতোই মনের পর্দায় যখন-তখন ভেসে ওঠে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ডাকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। যুদ্ধে যাওয়ার পথে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যাওয়া, ট্রেনিংয়ের জন্য আগরতলায় ছুটতে থাকা, মেলাঘরে ট্রেনিং নিয়ে একের পর এক অপারেশন চালানো, সহযোদ্ধাদের শহীদ হওয়া থেকে শুরু করে কত কিছুই তো মনে পড়ে!

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে আমরা যে স্বাধীন এক ভূখণ্ড পেলাম, তা নিয়ে যত স্বপ্ন রচিত হয়েছিল, তার সবই কি পূরণ হয়েছে? এই প্রশ্নও বহুবার মনে দানা বেঁধেছে। তারপরও ভাবি, সবে তো এ দেশের বয়স ৫০ বছর পূর্ণ হলো। কম-বেশি এটুকু বয়স একজন মানুষ বেঁচে থাকে; কিন্তু দেশ তো টিকে থাকবে সংখ্যাহীন বছর ধরে- এ প্রত্যাশা নিয়েই তো এগিয়ে যাওয়া উচিত।

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বরেণ্য অভিনেতা